রক্তঝরা আগস্ট

চিরবহমান এ শোকের আগুন


  • ০১ আগস্ট ২০২১, ১১:০৫,  আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২১, ১১:৪৭

কোহলি কুদ্দুস মুক্তি: রক্তঝরা আগস্ট মাস শুরু হলো আজ। ইতিহাসের বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় এক মাস। ১৯৭৫ সালের এই মাসে আমরা হারিয়েছি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

এ মাস মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কিত ও বেদনাবিধুর শোকের মাস। এ শোক পিতা হারানোর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অতিপ্রত্যুষে ঘটেছিল ইতিহাসের সেই কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেদিন প্রকৃতি কেঁদেছিল, কারণ মানুষ কাঁদতে পারেনি। ঘাতকের উদ্ধত সঙ্গিন তাদের কাঁদতে দেয়নি। কিন্তু ভয়ার্ত বাংলার প্রতিটি ঘর থেকে এসেছিল চাপা দীর্ঘশ্বাস। কী নিষ্ঠুর, কী ভয়াল, কী ভয়ঙ্কর সেই রাত। যা ৪৬ বছর পরেও ৫৬ হাজার বর্গমাইলের জনপদের ধূলিকণা ভুলতে পারেনি। ভুলতে চায়নি, ভুলতে পারবে না।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্ত্রী বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র- শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশুপুত্র শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল এবং এক সহোদরসহ আত্মীয়-পরিজন নিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু।

একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার ঘটনার সঙ্গে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতের এ বর্বর হত্যাকাণ্ড-ই তুলনীয় হতে পারে। যেখানে নারী-শিশুসহ নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হলো। একাত্তরে গণহত্যা করল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে গণহত্যা চালালো পাক হানাদারদেরই এদেশীয় দোসর কিছু বিপদগামী বিশ্বাসঘাতক সেনা কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় আস্থাহীন দেশীয় কিছু রাজনীতিকের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু নৃশংসভাবে শহীদ হন সেই কালরাতে। প্রবাসে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

আগস্টের নির্মম সেই হত্যাযজ্ঞে আরো নিহত হন বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, ভগ্নীপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, শিশু পৌত্র সুকান্ত বাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকটাত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী। জাতি আজ গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন সবাইকে।

বাংলার সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছিলো অটুট বন্ধন, আত্মার আত্মীয়তা। প্রত্যেকটি বাঙালির হৃদয়ে ছিলো তার প্রতিচ্ছবি, যা এখনো জ্বলজ্বল করছে সবার মনে। তিনি ছিলেন, এমন এক নেতা, যার ব্যক্তিগত সম্পদ বলে কিছুই ছিলো না। জনগণের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলেন। জনগণের ভালোবাসাই ছিল তার একমাত্র সম্পদ। যে সম্পদ কেউ কোনোদিন কেড়েও নিতে পারেনি। আর পারেনি বলেই আগস্ট এলেই তা গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।

বঙ্গবন্ধুকে কোনো বাঙালি হত্যা করতে পারে এমন বিশ্বাস কারো মনে কোনোদিন ছিলো না, যা ছিলো না বঙ্গবন্ধুর মনেও। আর তাই বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও ঘনিষ্ঠজনদের শত অনুরোধ উপেক্ষা করে রাষ্ট্রপতি হয়েও বঙ্গভবনের মতো সুরক্ষিত স্থানে না থেকে সাধারণ মানুষের মতো থেকেছেন ধানমন্ডির অরক্ষিত নিজ বাড়িতে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, "ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও জনগণের কাছ থেকে তার স্বপ্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেনি। ১৭ কোটি বাঙালির অন্তরে গ্রোথিত রয়েছে তার ত্যাগ ও তিতিক্ষার সংগ্রামী জীবনাদর্শ।"

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। তার জীবন ছিলো সংগ্রামমুখর। সংগ্রামের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছিলেন। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছাত্র অবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন সংগ্রামী নেতা। শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ ৬ দফার প্রণেতাও ছিলেন। ৭০’র নির্বাচনে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে এদেশের গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করেন। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ষাটের দশক থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বজ্রদৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ঘোষণায় উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাতি স্বাধীনতার মূলমন্ত্র পাঠ করে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছিনিয়ে আনে দেশের স্বাধীনতা। জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি এই স্বাধীন বাংলাদেশ।

সত্যিই আজ কাঁদার দিন। কাঁদো, বাঙালী কাঁদো। আজ যে সেই ভয়াল-বীভৎস আগস্ট। সেদিন বাতাস কেঁদেছিলো। শ্রাবণের বৃষ্টি নয়, আকাশের চোখে ছিলো জল। গাছের পাতারা শোকে সেদিন ঝরেছে অবিরল। এসেছিল সেই ভয়াবহ দিন! চারদিকে ঘাতকের উদ্ধত সঙ্গিন। মুছে দিতে চেয়েছিলো রক্তের চিহ্নসহ জনকের লাশ। ভয়ার্ত বাংলায় ছিলো ঘরে ঘরে চাপা দীর্ঘশ্বাস…সেই শোক জেগে আছে রক্তরাঙা ওই পতাকায়, সেই শোক অনির্বাণ এখনও বাংলায়। নদীর স্রোতের মতো চিরবহমান কাল থেকে কালান্তরে জ্বলবে এ শোকের আগুন। এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে পিতা মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এগিয়ে যাবে-এই প্রত্যাশা রাখি।

জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু।

কোহলি কুদ্দুস মুক্তি
সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ।


poisha bazar

ads
ads