করোনাকালে অনলাইন শিক্ষার ভালো মন্দ


  • ১৯ জুলাই ২০২১, ১৭:০৭

ফারিহা হোসেন: করোনা মহামারীর কারণে সরকার গত ২০১৯ এর মার্চ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পর একই বছরের মে মাস থেকেই অনলাইনে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর কাজ শুরু করে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সরকারি হিসেবে দেশে প্রাথমিক স্কুল আছ ৬৪ হাজার আর অন্যদিকে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে মাধ্যমিক স্কুল আছে আরো সতের হাজারের মতো।

আর কলেজ আছে প্রায় আড়াই হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি। যদিও এর মধ্যে অল্প একটি অংশই করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে আর টিভি দেখার সুযোগ আছে সব মিলিয়ে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীর। অর্থাৎ এখনো বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রমের আওতার বাইরেই রয়েছে। এটি ঠিক যে অনেকেই ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এখানে সামর্থ্যের ও সুযোগের বিষয় জড়িত।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনো করোনা মহামারী প্রতিরোধে বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত, কিছু কিছু দেশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিচ্ছে বা দিলেও প্রতিক‚ল পরিস্থিতির কারণে পরক্ষণেই আবার বন্ধ করছে। সংকটের কথা চিন্তা করে অধিকাংশ দেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রেখেছে। কেউ কেউ আবার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে খুলতে চাইলেও পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় খুলতে পারছে না।

করোনার প্রাদুর্ভাব এর মাত্রার তথ্য পর্যালোচনা করে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যতটা সহজ হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ বা খোলা রাখার ব্যাপারে, ঠিক ততটাই কঠিন হচ্ছে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের সময়েও লকডাউন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত দেশগুলোতে এটি এখন একটি সাধারণ চর্চার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ইউনিসেফ এর মতে বিশ্বের প্রায় ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী করোনার কারণে ক্ষতির শিকার। করোনার প্রাদুর্ভাব ও লকডাউন এর কারণে বিশ্বের প্রায় ১৬০ কোটি শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না। ফলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, অপুষ্টি, পরিবারের আয় কমে যাওয়া, স্থ‚লতা, শৃঙ্খলা বোধ ও খেলাধুলার অভাব, শিক্ষা হতে ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, সন্ত্রাসের জড়িয়ে পড়াসহ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

এতদসত্ত্বেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ঢালাওভাবে খুলে দেয়া না হলেও পাইলট প্রজেক্ট এর আওতায় খুলে দেয়ার ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে মাস্ক পরা, স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা এবং সামাজিতক দূরত্ব অনুসরণ করের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা যায় কিনা এটাও ভাবা যেতে পারে। কারণ করোনা প্রলম্বিত হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এভাবে দীর্ঘ দিন বন্ধ রাখলে একটি প্রজন্ম শিক্ষা বঞ্চিত হওয়ারন আশংকা থাকে। যা কোনো দেশ বা জাতির জন্য কখনো মঙ্গলজনক হতে পারে না।

আরেকটি মনে রাখা দরকার, দেশে অনলাইন ক্লাস করার জন্য স্মার্টফোন, কম্পিউটার অথবা ল্যাপটপ দরকার কিন্তু তা দেশের অধিকাংশ শিক্ষার নেই। আবার গ্রাম, চর, হাওর অথবা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভার্চ্যুয়াল শিক্ষা সম্পর্কে কোনো ধারণা বা প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা নেই।

রাজধানী ছাড়া দেশের অন্যান্য জেলায় থ্রিজি/ ফোরজি নেটওয়ার্ক বা ব্রডব্যান্ড সুবিধা সহজে দেখা মেলে না। আবার অনেক শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক বলছেন, বর্তমান মহামারি পরিস্থিতিতে যেখানে সংসার চালানো মুশকিল হচ্ছে, সেখানে ইন্টারনেটের খরচ বহন করা তাঁদের জন্য খুব কষ্টসাধ্য। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে অনলাইনে ক্লাস করার সময় ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকের লেকচার ঠিকমতো দেখতে ও শুনতে পায় না, ফলে তারা অনলাইনে ক্লাস করতে আগ্রহ হারাচ্ছে।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে অনলাইন ক্লাস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হয়েছে। করোনার সময়ে সবার মধ্যেই অস্থিরতা, হতাশাসহ নানাবিধ মানসিক সমস্যা অনুভ‚ত হচ্ছে; তারই মাঝে অনলাইন ক্লাস বিষফোঁড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

অনলাইন ক্লাসের কারণে আজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সকলের হাতেই রয়েছে এন্ড্রয়েড মোবাইল, বাসায় রয়েছে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ এবং পর্যাপ্ত নেট সুবিধা। অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থী কৌত‚হলবশত বিভিন্ন সাইটে ঢুকতে পারে সহজেই।

উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের যেসকল শিক্ষার্থীরা পূর্বে থেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে তারা সবসময় পরিবারের বিশেষ নজরদারিতে থাকতো বা দিনের বিশেষ একটি সময় তা ব্যবহারের অনুমতি পেত কিন্তু বর্তমান সময়ে অনলাইনে ক্লাসের নাম করে শিক্ষার্থীরা বেশি সময় নেটে অবস্থান করলেও অভিভাবকরা কোন রকম আপত্তি করতে পারছেন না তাদের শিক্ষাজীবনের কথা চিন্তা করে।

অন্যদিকে, অনলাইন ক্লাসের অযুহাতে ছোট ছোট শিশুরা সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হচ্ছে, যা তাদের বয়সের সঙ্গে খাপ খায় না। সময়ের আগে কোনো কিছুই ভালো না জেনেও আমরাই আজ তাদের ফেসবুক, ইউটিউব চালানোর সুযোগ করে দিচ্ছি, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হবে।

আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টানা প্রায় দেড় বছর বন্ধের কারণে শিক্ষার্থীরা এই দীর্ঘ সময় ঘরে বন্দি থাকায় মানসিক শারীরিকভাবে বহুবিদ সমস্যার সমুখীন হচ্ছে এ প্রসঙ্গে জীবনবাদী ও প্রকৃতি ঘনিষ্ঠ গীতি কবি কবি মিজান মালিক এর সাম্প্রতিক কবিতা ‘স্বপ্ন সাজাও’ শীর্ষক কবিতায় সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শিক্ষার্থীদের দুঃসহ এই সময় সম্পর্কে।

তিনি লিখেছেন,‘থমকে আছে সময় তোমার/ থেমে গেছে কোলাহল। তাই ভেবো না জীবন তোমার/ হয়ে গেছে খুব অচল। আস্থা রাখো নিজের প্রতি/ পাবেই তার ভালো ফল। এই কোভিডের আগে তোমার/স্বপ্ন ছিলো অগণন, মন্দ সময় করছে জানি/ বিপন্ন তোমার অবুঝ মন। যতই আসুক বোবা সময়/ রাখো ধরে মনোবল।.....নিজের জগত রাখো ধরে/ সময় থেমে থাকে না। নতুন করে সাজাও স্বপ্ন/ জীবন হবে আলো ঝলমল।’

অনলাইনে ক্লাস করার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ডিভাইসের স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকায় ছাত্রছাত্রীদের চোখে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আবার কারো কারো মাথাব্যথা অনুভ‚তি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে ক্লাস করায় অনেক শিক্ষার্থীর ঘাড়ে ও পিঠের মেরুদণ্ড ব্যথা হচ্ছে। যা দীর্ঘ সময় চলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও শিক্ষার্থীরা টেকনোলজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষাটা সম্পূর্ণভাবে পায়নি।

সেশনজটের জাঁতাকল থেকে মুক্তির নিমিত্তে পড়াশোনা পুষিয়ে নিতে নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে অনলাইন ক্লাসের প্রধান অন্তরায় ইন্টারনেটের মন্থর গতি। অনলাইন ক্লাস কারো জন্য আশীর্বাদ, কারো জন্য অভিশাপ। অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন সমস্যার কারণে ক্লাসে উপস্থিত হতে পারছে না।

ফলে বড় একটা অংশ ক্লাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে ক্লাসের যথেষ্ট চাহিদা অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। পড়া বুঝতে না পারলে দুই-একজন করার সুযোগ পেলেও সিংহভাগ তা পাচ্ছে না। অনলাইন ক্লাসে তাত্তি¡ক জ্ঞান মিললেও ব্যবহারিক জ্ঞান থেকে সকলে বঞ্চিত হচ্ছে। অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া বেশ কঠিন। মূল সমস্যা হলো অসদুপায় বা নকল বন্ধ করা। যেহেতু শিক্ষক ছাত্রকে দেখতে পাচ্ছেন না, তাই সহজেই গুগল সার্চ, বই দেখে লেখা, অথবা বন্ধুবান্ধব একসাথে মিলে নকল করা সম্ভব।

এ সময়ে শিক্ষার্র্থীদের মনে সাহস জোগানো যে, তারা বন্দি নয়। জীবনকে নতুন করে গড়ার এটাই সুযোগ। মানবিক, নৈতিক মনোবল চাঙ্গা করে সময়টাকে কাজে লাগাতে পারলেই তোমরা নতুন করে গড়ে নিতে পারবে পাল্টে যাওয়া পৃথিবীকে। বরং এ সময়ে পিতা-মাতা স্বজনদের সময় দেয়া, সামাজিক ও মানবিক গুণ অর্জন করার এটাই মোক্ষ সময়।

আর যে কোনো দুর্যোগ দুর্বিপাকে কিভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় তার অনুশীলন করা। যেকোনো জরুরি সময়ে যেকোনো সমস্যা সবার সহযোগিতা নিয়ে কিভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব এবং মানসিক শক্তি আরো সুদৃঢ় করার উপায়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও মানসিকভাবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখতে হবে। তবেই সম্ভব এই অন্ধার সময়কে জয় করা।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং নারী-শিশু ও পরিবেশ বিষয়ে অধ্যয়নরত।


poisha bazar

ads
ads