সাবেক ছাত্রলীগ নেতা তন্ময়কে নিয়ে নেত্র নিউজের সম্পাদক খলিলের মুখে শিবিরের মন্ত্রপাঠ


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৮ জুলাই ২০২১, ২৩:৫০,  আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২১, ০৯:২০

তপন কান্তি রায় : বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য বরাবরই হত্যার রাজনীতির চর্চা করেছে বাংলাদেশ ছাত্র শিবির। ছাত্রলীগের ত্যাগী ও উদ্যমী নেতাকর্মীদের হত্যার রাজনীতি বলবত ছিল রাজশাহী, রংপুরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোন ত্যাগী ছাত্রলীগ নেতাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলে আরেকটি কৌশলের অংশ হিসেবে অনলাইন অফলাইনে গর্জে উঠত শিবিরের প্রোপাগান্ডা সেল।

মূলত ভ্রান্ত ও অর্ধসত্য মিশ্রিত তথ্য উপস্থাপন করে ছাত্রলীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের চরিত্রহননের মাধ্যমে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা ছিল তাদের কাজ। এবার শিবিরের সেই প্রোপাগান্ডা সেলের মতই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন নেত্র নিউজের প্রধান সম্পাদক তাসনিম খলিল।

বাংলাদেশ সৃষ্টির শুরু থেকে লড়াই করে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী ঘাঁটি গড়তে ব্যর্থ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমান্তে থাকা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিবির ছিল অপ্রতিরোধ্য। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সমসাময়িক সকলেই জানে বুয়েটে ছাত্র শিবিরের দৌরত্ব্যের কথা। শিবির অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে বাছাই করে নেয় তাদের হত্যার টার্গেটগুলো। এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় তরুণ নেতৃত্বকে বেছে নেয় তারা। কেননা সম্ভাবনাময় এই তরুণ নেতৃত্বের শূন্যতা কোনভাবেই পূরণ করার মত নয়। রাজশাহীতে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাত-পায়ের রগকেটে হলের রুমে ফেলে রাখা হয় ছাত্রলীগ কর্মী বাদশাকে।

বুয়েট ছাত্রলীগের ত্যাগী নেতৃত্ব বরাবরই ছিল শিবিরের টার্গেট। বুয়েট ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আরিফ রায়হান দীপকে হত্যা করা হয় এই উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরোধিতার জন্য। বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলে ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল তার মাথায় ও পিঠে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যু হয় দীপের।

তার হত্যাকারী মেজবাহউদ্দীন নিজেই স্বীকার করেন হত্যার কথা। উগ্র কার্যক্রমে সহায়তার ক্ষেত্রে বাধা দেয়ায় হত্যা করা হয় দীপকে। ঠিক তার মাসখানেক পড়েই হামলা করা হয় বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তন্ময় আহমেদের ওপর।

২০১৩ সালে ১০ আগস্ট তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায় শিবির কর্মীরা। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও তাকে আরও একবার হত্যার চেষ্টা করা হয়। সেখানে আটক হয় রায়হান নামে এক শিবির কর্মী।

যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে শিবিরের দুইটি ভাগকে দারুণ সক্রিয়ভাবে দেখা গেছে। এর একটি হল- শিবির অনলাইন এক্টিভিস্ট এবং কিলিং সেল। আর এই দুই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিবির কর্মী ছিলেন দারুণ সক্রিয়। এ সময় ব্লগার এক্টিভিস্ট ও শিবিরের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালানো ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য অবধারিত ছিল দুটি বিষয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের নামে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হবে এবং এরপরও তারা পিছিয়ে না গেলে তাদের মধ্য থেকে কাউকে হত্যা করা হবে, যেন অন্যরা জীবনের ভয়ে হলেও মুখ বন্ধ রাখে।

কিন্তু বুয়েটকে জঙ্গি-শিবির মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১২-১৩ সাল থেকে কাজ শুরু করেন তন্ময় আহমেদ। তার দৃঢ়কল্পের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ২০১২-১৩ সালে রাজপথে পুলিশের ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

২০১৩ সালের নভেম্বর মাসের দিকে বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের ২২৩, ৩০২, ৩২৪, ৩৩০ ও ৪১০ নম্বর রুম এবং আহসানউল্লাহ হলসহ বিভিন্ন হল থেকে বিপুলপরিমাণ ইসলামী বই ও শিবিরের সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিবরণ সংবলিত বেশ কিছু গোপন নথি উদ্ধার করে পুলিশ। ২০১০ সালে বুয়েটে শিবির অর্থ ব্যয় করেছে আট লাখ ৭০ হাজার ৩১৪ টাকা এবং ২০১১ সালে খরচ করে ১৩ লাখ ২৩ হাজার ২০০ টাকা।

এসব তথ্য ফাঁস হওয়ার পর বুয়েট ছাত্রলীগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বুয়েট শিবির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৬ জন শিবির নেতা-কর্মীকে তৎকালীন সময় গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। আর সে কারণেই বুয়েট থেকে ছাত্রলীগকে বহিষ্কারের জন্য এ সময় থেকেই উঠে পড়ে লাগে শিবির। শুধু তাই নয় বুয়েটে নিজেদের অবস্থা নড়বড়ে হওয়ার জন্য তন্ময় আহমেদকে প্রধানত দায়ী মনে করায় তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গাইবান্ধায় হামলা চালায় এই শিবির।

গাইবান্ধায় গুরুতর আহত হয়ে যখন তিনি রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে যান, সেখানেও তাকে হামলার উদ্দেশ্যে যায় এক শিবির কর্মী। কিন্তু পুলিশের কড়া প্রহরার কারণে আটক হয় রায়হান নামের সেই শিবির কর্মী। বিগত বছর জুড়ে বুয়েট ছাত্রলীগ ও বুয়েটের ত্যাগী সাবেক ছাত্রলীগ নেতৃত্ব নিয়ে অনবরত মিথ্যাচার চালিয়ে আসছে জামায়াত শিবির। তাদের বাঁশেরকেল্লা ফেসবুক পেজ ও টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে বুয়েটিয়ান এবং এ ধরণের অনেকগুলো স্থানে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে বানোয়াট ও অদ্ভুত সব কথা প্রচার করা হয়।

মজাদার বিষয় হলা- জামায়াত শিবিরের দেখিয়ে দেয়া সেই বুলি আজ হঠাৎ করেই শোনা যাচ্ছে নেত্র নিউজ নামক একটি পোর্টালের প্রধান সম্পাদকের মুখে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা করেন বলে দাবি করা এই ব্যক্তি সরাসরি তন্ময় আহমেদকে 'শিবিরকর্মী' বলে উপস্থাপন করেন তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে। যদিও তার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেননি।

এতদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, সরকার ও সেনাবাহিনী নিয়ে গুজব ছড়ানোর পর হুট করেই তন্ময় আহমেদকে টার্গেট করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করছেন তাসনিম খলিল ও ডেভিড বার্গম্যান। নতুন প্রজন্মের আওয়ামী ঘরানার অ্যাক্টিভিস্ট ও বিএনপি-জামায়াত বিরোধী ডিজিটাল কিশোর-তরুণদের মধ্যে তন্ময় আহমেদের নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করা তাদের মূল লক্ষ্য।

তন্ময় আহমেদকে বিতর্কিত করে, অনলাইনে জামায়াত-বিএনপি-আইএসআই এজেন্টদের বিরুদ্ধে তন্ময়ের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে সমর্থন জানানো থেকে ডিজিটাল প্রজন্মকে দূরে রাখতে চায় তারা। প্রত্যক্ষভাবে তন্ময়কে টার্গেট করলেও, তাদের অন্যতম পরোক্ষ লক্ষ্য হল নতুন প্রজন্মের অ্যাক্টিভিস্টদের কণ্ঠস্বর চেপে ধরা। আর তার জন্য জামায়াত ইসলাম ও শিবিরের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন তাসনিম খলিলরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমসারির জাতীয় দুইটি গণমাধ্যমে কাজ করা আমার। ২০১৩ সালে হওয়া গণজাগরণ মঞ্চ এবং তার পরবর্তী সময়ে বুয়েটে ছাত্রলীগ নেতা আরিফ রায়হান দ্বীপ হত্যাকে কেন্দ্র করে বুয়েট নিয়ে নিয়মিতই সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়েছে আমার। পরবর্তীতে তন্ময় আহমেদের ওপর গাইবান্ধায় হওয়া হামলা এবং তার পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়েছে আমাকে।

এই সংবাদ সংগ্রহকালে আমার দেখা তন্ময় আহমেদ পুরাদস্তুর একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)-এর হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

তার কার্যক্রম ও দৃঢ়তার কারণে শিবির, জঙ্গি ও মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো বারবার আঘাত পেয়েছে। আর এমন এক ব্যক্তিকে 'শিবির' প্রমাণ করতে তাসনিম খলিলকে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আর এটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে নিশ্চিতভাবেই প্রশ্ন উঠবে তার ও নেত্র নিউজের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।



poisha bazar

ads
ads