করোনায় শিক্ষার সংকট নিরসন চাই


  • ১৫ জুলাই ২০২১, ১০:৪৫

রাশেদ ইসলাম : করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্ব এক ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের মতো করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের কেবিনে আছে এবং শিক্ষার্থীদের অবস্থা হাসপাতালে আইসিইউর রোগীর মতো, প্রায় দেড় বছর ধরে টানা ছুটিতে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই তিনটি শিক্ষাবর্ষের সূচি সীমাহীন ক্ষতিগ্রস্ত।

শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন তছনছ। বড় ধরনের ক্ষতির দিকে শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু এই ক্ষতি পোষাতে দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। শিক্ষার্থীদের কতটুকু ক্ষতি হলো, ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে একটি শিক্ষাবর্ষের পুরোটাই হারিয়ে গেছে। আরো একটি শিক্ষাবর্ষের অর্ধেকের বেশি চলে গেছে। তবুও মূল্যায়ন করে দেখাতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

কত শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে চলে গেল, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গত বছর ১৭ মার্চ থেকে ছুটি চলছে। আগামী কত দিনে খোলা হবে সে নিশ্চয়তা নেই।

অবশ্য এ সংকট শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী। জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফের গত মার্চে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ লকডাউনের কারণে বিশ্বব্যাপী ১৬ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুর জন্য স্কুল প্রায় এক বছর ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকা উঠে এসেছে গত বছরের মার্চ থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মতো এ দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে মাত্র ১৩টি দেশ। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল বাংলাদেশ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকার কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ভুলে যাচ্ছে। পরীক্ষা নিয়ে দক্ষতা যাচাই না করে উপরের ক্লাসে উঠে যাচ্ছে। গ্রামে ও বস্তি এলাকায় কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে ও কিশোরীদের বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থীর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনলাইনে গেমসগুলোতে আসক্ত হয়ে, আত্মহত্যার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে তা মেনে নিয়েই মানুষকে জীবনযাপন করতে হবে। তাই অনির্দিষ্ট সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ না রেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে কীভাবে সচল করা যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একসঙ্গে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে না দিয়ে প্রথমে এলাকাভিত্তিক এবং শ্রেণিভিত্তিক ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে।

সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নত দেশগুলো তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্ত দেশের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা বড়ই চ্যালেঞ্জিং। আর এই চ্যালেঞ্জকে বাস্তবতায় নিয়ে যেতে হলে অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে সমাধান করতে হবে।

বর্তমান ডিজিটালাইজেশন এ যুগে মানুষের সহজপ্রাপ্যতা যোগাযোগের মাধ্যম ইন্টারনেট। ফলে অনলাইন হচ্ছে সুপার হাইওয়ে। কিন্তু আমাদের দেশে করোনাকালীন অনলাইন প্লাটফর্ম জুমে পরীক্ষা দেয়ার সময় কেউ গাছে চড়ে, কেউ খড়ের পালা আবার কেউ উঁচু ঢিবিতে উঠে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন।

শিক্ষার্থীদের এমন ঘটনা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা দেখেছি। এই যোগাযোগ সরঞ্জামাদির আপডেট করে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সমতালে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত আমাদের দেশে প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

করোনাকালে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মধ্যে রাখতে, গত বছরের ২৯ মার্চ থেকে মাধ্যমিক এবং ৭ এপ্রিল থেকে প্রাথমিকের রেকর্ড করা ক্লাস সংসদ টেলিভিশন প্রচার করছে। এছাড়াও রেডিও, অনলাইন ও মোবাইলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অংশগ্রহণ করছে কিন্তু বেসরকারি সংস্থাগুলোর মোর্চা গণস্বাক্ষরতা অভিযানের ‘এডুকেশন ওয়াচ ২০২০-২০২১ সমীক্ষার অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে, গত জানুয়ারিতে বলা হয় দূরশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল সাড়ে ৩১ শতাংশ।

এছাড়াও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে ক্লাসই হয় না সেই চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষামন্ত্রণালয় এ বছরের জন্য সংক্ষিপ্ত পাঠ্য সূচিতে ৬০ দিন ক্লাস করিয়ে এসএসসি এবং ৮০ দিন ক্লাস করিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার পরিকল্পনা করেছিল, সেটি বাস্তবায়ন হবে কি না ঘোলাটে অবস্থা এবং লকডাউনে অসহায়, কর্মহীন ও হতদরিদ্র পরিবারে দরিদ্রতার কারণে হুহু করে শিশুশ্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে পরিবারের পক্ষে ডিজিটাল ডিভাইস ক্রয় করে ক্লাসে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়।

তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে শিক্ষকেরা শিখন কার্যক্রম চালাবেন বলে আলোচনায় ছিল কিন্তু সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। শুধু মাত্র অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে তা সঠিক মতো হচ্ছে না। তারা নিজে না করে অন্যের দ্বারায় সমাধান করে নিচ্ছে।

সন্তানদের শিক্ষক রেখে প্রাইভেট পড়ানোর আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। অধিকাংশ পরিবারেই কোনো এনড্রয়েড মোবাইল ফোন নেই। তাই অনলাইন ক্লাস করার সুযোগ নেই তাদের। ফলে নিয়মিত পড়াশুনা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না এবং অনেকেই ঝরে যাবে শিক্ষা থেকে। করোনার আগে ২০১৯ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭.৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৩৭.৬২ শতাংশ।

২০২১ সালে ঝরে পড়ার হার যে সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে তা বলার অপেক্ষা থাকে না। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। যেসব পরিবার অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল তাদের সন্তানদের নানাভাবে বিকল্প ব্যবস্থা রেখে পড়াশোনা করানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যেসব পরিবারে পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে, তাদের পরিবারের শিক্ষার্থীদের অনেকেই হয়তো শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়বে।

শিক্ষার সংকট কাটাতে হলে, সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের টিকাদান নিশ্চিত করে দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্সের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের দ্রুত পরীক্ষা শেষ করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে ছুটির দিনে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা, বাল্যবিবাহ রোধে প্রশাসনের নজরদারি করা, গরিব পরিবারগুলোকে আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে ড্রপআউট ও শিশু অপুষ্টি দূর করতে হবে।

অটোপাসের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে পাবলিক পরীক্ষা নেয়া, বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট সংকট নিরসন করে, বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ফি মওকুফ করতে হবে। এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে শিক্ষাধ্বংসের ভুলনীতি সিদ্ধান্ত বাতিল করে শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তা না হলে মহান মুক্তিযুদ্ধে রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতার মূল্যহীন হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ।


poisha bazar

ads
ads