গ্রিন ফ্যাক্টরি: সবুজ শিল্পায়নে নতুন মাত্রা


  • ১৪ জুলাই ২০২১, ১০:২৫

রেজাউল করিম খোকন : রানা প্লাজা ধস এবং তাজরিন গার্মেন্টসের অগ্নি দুর্ঘটনার পর আমাদের গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথাবার্তা প্রচারিত হয়েছিল। এখন দুর্ঘটনাও কমেছে। গার্মেন্টস খাত নিয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। অর্জনটিকে ধরে রাখতে হলে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে আরো।

বাংলাদেশের তৈরি গার্মেন্টস পণ্য আজ বিশ্বের দরবারে প্রশংসা অর্জন করছে। প্রায় শতাধিক দেশে বাংলাদেশে প্রস্তুত পোশাক সুনামের সাথে রফতানি হচ্ছে। কারখানাগুলোতে শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে। বাড়বে রফতানিও।

এর মধ্যে দিয়ে আমাদের গার্মেন্টস খাতে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের যে রূপকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে, তার লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে কর্মপরিবেশ নিরাপত্তায় অভ‚তপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এতদিন যাবত এমনভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছে যে, আমাদের বেশিরভাগ গার্মেন্টস কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ।

অথচ আজ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা বা গ্রিন ফ্যাক্টরি আমাদের বাংলাদেশে অবস্থিত। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে এক নীরব সবুজ বিপ্লব ঘটেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর ব্যাপক প্রচার হয়নি এখনো। ফলে, এটার ব্র্যান্ডিং হয়নি তেমনভাবে। বাংলাদেশ বর্তমানে পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে।

ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউ এস জিবিসি) সনদপ্রাপ্ত ৬৭টি গ্রিন ফ্যাক্টরি রয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে ৭টি বিশ্বের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় বলা যায়। এছাড়া আরো প্রায় ২৮০টি কারখানা ইউ এস জিবিসিতে নিবন্ধিত হয়েছে এবং আরো অনেক কারখানা পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরিতে রূপান্তর হওয়ায় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

রানা প্লাজা এবং তাজরিন গার্মেন্টসের দুঃখজনক ঘটনাগুলোর পর আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে উদ্যোক্তাদের মধ্যে নানা বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে। এরপর থেকে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প নানা সংস্কার, পরিবর্তন এবং রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার বিকাশ শুভ সূচনা করেছে। আর্থিক ক্ষেত্রে গ্রিন ব্যাংকিং ধারণার বিকাশ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছিল।

বর্তমানে যা দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। টেকসই অর্থনীতির জন্য গ্রিন ব্যাংকিং ধারণার অনুসারী হয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছে। যার চমৎকার ফলাফল ক্রমেই অর্থনীতিতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একইভাবে গার্মেন্টস শিল্পে গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার পরিপূর্ণ বিকাশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নেবে- আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

গ্রিন ফ্যাক্টরি কার্যক্রমকে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের ব্যাপারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এ ক্ষেত্রে চমৎকার গতির সঞ্চার হবে আশা করা যায়। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণাটি আমাদের দেশে নতুন। তবে সাম্প্রতিক এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণা আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে ব্যাপকভাবে চালু হওয়ায় গোটা অর্থনীতিতে এর চমৎকার অনুকূল প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমাদের গার্মেন্টস খাত থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের যে রূপকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়নে গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার দ্রুত বিকাশ সবাইকে আস্থাশীল করে তুলেছে।

সাভারে রানা প্লাজা ধস কিংবা তাজরিন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল, এর ফলে ভাটা পড়েছিল এ খাতে। বিদেশি ক্রেতারাও আস্থার সংকটে পড়েছিল। বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প।

পরিবেশবান্ধব টেকসই কারখানা বা ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠায় রীতিমতো তুমুল প্রতিযোগিতা শুরু হয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে। এর মাধ্যমে সারাদেশে একে একে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি। এগুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণাটি আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দিনে দিনে আরো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি।

আগামীতে আরো অনেক গার্মেন্টস কারখানাকে সবুজায়নের আওতায় আনার প্রক্রিয়া জোরেশোরে চলছে। শ্রমিকবান্ধব গার্মেন্টস কারখানা প্রতিষ্ঠায় মালিকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা সুফল বয়ে এনেছে, অর্থনীতিতে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে বলা চলে। গার্মেন্টস শিল্পে গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণা নিঃসন্দেহে নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে।

গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণা দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সন্দেহ নেই। সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্ট না হলে নতুন কোনো কারখানাকে বিজিএমইএ থেকে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন তাহলো, গ্রিন ফ্যাক্টরি করতে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ দরকার।

একটি ফ্যাক্টরি করতে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এর পাশাপাশি জমিও লাগে ৩ থেকে ১০ বিঘা। দেশের এ পর্যন্ত যে সব কারখানা গ্রিন ফ্যাক্টরির খেতাব জিতে নিয়েছে তাদের বেশিরভাগ উদ্যোক্তার বিনিয়োগই ছিল ৫০০ কোটি থেকে ১১০০ কোটি টাকার মধ্যে। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, পরিবেশের সুরক্ষা।

পরিবেশবান্ধব, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সাশ্রয়ী, স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশে উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হলেও গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে আমাদের গার্মেন্টস খাতকে।

অনেক বাধা, বিপত্তি প্রতিক‚লতা, ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে আমাদের গার্মেন্টস খাতকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এখন পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সবাইকে আলাদা মনোযোগ দিতে হচ্ছে। গার্মেন্টস সামগ্রী ক্রেতা দেশ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, গোষ্ঠী এখন গার্মেন্টস উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশবান্ধব, শ্রমিকবান্ধব নানা শর্ত আরোপ করছেন।

যে সব শর্ত পূরণের মাধ্যমেই কেবল তাদের সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব। আর এ জন্য এখন গার্মেন্টস শিল্পে কমপ্লায়েন্সকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। অতীতে এ বিষয়টিকে এক প্রকার অগ্রাহ্য করা হয়েছে। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার পেছনেও বিদেশি ক্রেতাগোষ্ঠীর চাপ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।

আন্তর্জাতিক ফিন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে প্রতিবছর সুতা ও কাপড় ডাইং ও ওয়াশিংয়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি লিটার পানি খরচ হয়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, এতো বিপুল পরিমাণ পানি দিয়ে ৬ লাখ অলিম্পিক সুইমিং পুল পূর্ণ রাখা সম্ভব।

সমপরিমাণ পানি এক বছরে ৮ হাজার লোকের চাহিদা পূরণ করতে পারে। প্রতিটি জিন্স প্যান্ট যার ওজন প্রায় ১ কিলোগ্রাম, এমন একটি প্যান্ট ওয়াশিংয়ে আড়াইশ লিটার পানি ব্যবহৃত হয়। এই পানি কোনো কেমিক্যাল নয়, স্রেফ সাধারণ পানি, যা ভ‚গর্ভস্থ উৎস থেকে উত্তোলন করে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভয়াবহমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার এভাবেই বাড়ছে দিনে দিনে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করছে। সাধারণত ভ‚গর্ভস্থ উৎস থেকে যখন এতো বিশাল পরিমাণের পানি তোলা হয়, তখন সেখানে এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এভাবে যত শূন্যতার সৃষ্টি হবে তত ভ‚মি নিচের দিকে দেবে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।

এ কারণেই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ বেশিরভাগ এলাকার পানির স্তর সুবিধাজনক এবং নিরাপদ অবস্থানে নেই। ফলে যে কোনো ধরনের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশের ওপর গার্মেন্টস শিল্পের আরেকটি ক্ষতিকর প্রভাব হলো, কারখানার ব্যবহৃত পানি নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাওরে প্রাবাহিত হয়ে যায়।

পোশাক কারখানার এই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ও রঙ মিশ্রিত পানি নদ-নদী, খাল-বিলের পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। যার ফলে নদ-নদী খাল-বিলের মাছ মারা যাচ্ছে, চাষাবাদে বিঘ্ন ঘটছে। এতে কৃষি উৎপাদনে প্রতিক‚ল প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৮০০ কারখানা ডাইং ও ফিনিশিং কাজে ৪ হাজার গার্মেন্টস কারখানাকে সহায়তা করে।

আইএফসির তথ্যমতে, এসব ডাইং ও ফিনিশিং কারখানার প্রায় সবই ভ‚গর্ভস্থ উৎসের পানি ব্যবহার করে। এসব কারখানা যদি আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে পানির ব্যবহার চারভাগের এক ভাগও সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়, তবে তাতে করে কেমিক্যালের ব্যবহারের মাত্রা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ফিনিশিং ও ডাইংয়ের জন্য ফেব্রিকে (কাপড়) তাপ দিতে গ্যাস ব্যবহৃত হয়।

এ ক্ষেত্রে যতবেশি পানি থাকে, তা ফুটাতে তাপ প্রয়োগের জন্য বেশি পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। তাই পানির ব্যবহার কমাতে পারলে মহামূল্যবান জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাসের ও সাশ্রয় হবে। এমনিতে এক কেজি ওজনের একটি জিনস প্যান্ট ডাইং ও ফিনিশিংয়ে ২৫০ লিটার পানি লাগে।

অথচ গ্রিন ফ্যাক্টরি ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে এক কেজি ওজনের জিনস প্যান্টের জন্য ব্যবহৃত হবে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ লিটার পানি। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি কেজি জিনস এ চারগুণ বেশি পানি ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রিন ফ্যাক্টরি ব্যবস্থায় এক কেজি জিনস এ পানির ব্যবহার মাত্র সাড়ে তের লিটারে নামিয়ে আনা সম্ভব।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আইএফসির পার্টনারশিপ অব ক্লিনার টেক্সটাইল (পিএসিটি) কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর বিশ্বের ২০০টি গার্মেন্টস কারখানায় ২১৬ লাখ ঘনমিটার পানি সাশ্রয় করা হচ্ছে। পিএসিটি কর্মসূচির আওতায় থাকা দেশের ২০০ গার্মেন্টস কারখানা পানি সাশ্রয় করে প্রতি বছর ১৬০ লাখ ডলার সাশ্রয় করতে পারছি আমরা।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানার মালিকরা এখন এসব বিষয়ে খুব সচেতন হচ্ছেন। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আগ্রহী হয়ে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। এরই মধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান পানি ও গ্যাস সাশ্রয়ে ইতিবাচক ব্যবস্থা নিয়েছেন।

লেখক: সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক।



poisha bazar

ads
ads