করোনা রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে


  • ইমরান ইমন
  • ১১ জুলাই ২০২১, ১০:০৮

দেশে করোনা অতিমারীর ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলছে। দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। করোনার চলমান ঢেউ মোকাবিলায় সরকার ১ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

কঠোর বিধিনিষেধের প্রথম দিনেই মৃতের সংখ্যাটা পূর্ববর্তী সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। ১ জুলাই করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন ১৪৩ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ- ৬ জুলাই এর হিসেব অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৫২৫ জন, যা এক দিনের হিসাবে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

এই সময়ে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যাটা ১৬৩ জনে গিয়ে ঠেকেছে। ২৭ জুন ২০২১ থেকে করোনায় মৃতের সংখ্যাটা শতকের ঘর ছাড়িয়ে যাচ্ছে। হুট করে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহতা রূপ নেয়ার নেপথ্যে কী। দেশে যে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট হু হু করে ছড়িয়ে পড়েছে তার স্পষ্টত প্রমাণ এটি?।

কারণ, করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট? বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট অন্য সব ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও মারাত্মক। অতি দ্রুতই এ ভাইরাস ভয়াবহরূপে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম। গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে ভয়াবহ এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভাইরাস শনাক্ত হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, মে মাসের ৪৫ শতাংশ নমুনায় এ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। দিন যতই গড়াচ্ছে ততই এর হারটা বেড়েই চলছে। জুন মাসের ৭৮ শতাংশ নমুনাতেই ভয়াবহ এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কোন পথে হাঁটতে চলেছে দেশের করোনা পরিস্থিতি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত শনাক্তকৃত করোনার ভ্যারিয়েন্টগুলোর মধ্যে ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে’ সবচেয়ে শক্তিশালী ও দ্রুত সংক্রমণশীল হিসেবে আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

শুধু বাংলাদেশ বা ভারত নয়, ইউরোপ, আমেরিকাতেও ভয়ঙ্কর এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রভাবে দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনেক দেশেই ইতিমধ্যে চলছে করোনার তৃতীয় ঢেউ। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৮০টি দেশে এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে এবং খুব দ্রুত সময়ে বিস্তার লাভ করছে।

তবে পূর্ববর্তী ভ্যারিয়েন্টগুলোর সাথে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের উপসর্গে বেশিরভাগ মিল থাকলেও কিছুটা পরিবর্তিত উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা গেছে এই ভ্যারিয়েন্টে। বিশেজ্ঞরা বলছেন, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের অন্যতম প্রধান উপসর্গ মাথা ব্যথা। এর পাশাপাশি গলা ব্যথা, সর্দি এবং জ্বরও থাকতে পারে। তবে এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হলে স্বাদ বা গন্ধের অনুভূতি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। পাশাপাশি কাশি হওয়ার সম্ভাবনাও বেশ কম।

যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞদের হিসেব অনুযায়ী, পূর্ববর্তী ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট অন্তত ৬০% বেশি সংক্রামক। এছাড়া পূর্ববর্তী ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তদের তুলনায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তির সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ। দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সব ভয়াবহতার দৃশ্য এখন আমাদের সামনে প্রতীয়মান।

লাফিয়ে লাফিয়ে সংক্রমণ বাড়ছে, আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা প্রতিদিন পূর্ববর্তী রেকর্ডকে ভাঙিয়ে যাচ্ছে, হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর জন্য তিল পরিমাণ জায়গা নেই, চিকিৎসা খাতে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। চারিদিকে চিকিৎসা সেবার জন্য এখন চলছে হাহাকার।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুন পর্যন্ত ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৬টি জেলাতেই করোনা চিকিৎসার জন্য আইসিইউ নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, গত এক সপ্তাহে মৃত্যুর ৭৭% হয়েছে আইসিইউ সুবিধা কম থাকা ৭টি বিভাগে। অথচ গত বছরের (২০২০) ২ জুন একনেকের সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটা জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন।

১৩ মাসেও জেলা পর্যায়ে আইসিইউ স্থাপিত না হওয়ার নেপথ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাফিলতি ও পরিকল্পনাহীনতাই দায়ী। স্বাস্থ্য খাতের সুচিকিৎসা করানোটা এখন সময়ের দাবি। দেখা যাচ্ছে, জেলা পর্যায়ে করোনা আক্রান্ত রোগীরা নিজ জেলায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা না পেয়ে জীবন বাঁচাতে ছুটে যাচ্ছেন রাজধানী ঢাকা অভিমুখে।

ফলে সেখানে বাড়ছে রোগীর চাপ, এক জেলা থেকে আরেক জেলায় হু হু করে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রমণ বহুগুণে। দেশে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি দিন দিন যে পরিমাণে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, এখনই সরকার ও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে ‘ফিল্ড হাসপাতাল’ তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কারণ দেশে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যার বিপরীতে বহুগুণ করোনা রোগী।

এ পরিসংখ্যানটা দিন দিন বেড়েই চলছে। সামনের দিনগুলোতে আরো ভয়াবহ রূপে বেড়ে চলবে। কেননা, ভারতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের নতুন সংস্করণ ‘ডেল্টা প্লাস’ ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তা ভারতে ভয়াবহ আঘাত আনতে পারে।

প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে অবশ্যই তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। যেমনটা বর্তমানে পড়ছে। ভারতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্তের পরই কিন্তু তা বর্তমানে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে আগত করোনার বিভিন্ন ঢেউ মোকাবিলায় সরকারকে কখনো লকডাউন, বিধিনিষেধ, সীমিত পরিসর, শাটডাউন কখনো বা কঠোর বিধিনিষেধের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

সম্প্রতি ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট মোকাবিলায় সরকার ১৪ দিনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তবে এবারের কঠোর বিধিনিষেধ কঠোরভাবেই পালিত হতে দেখা যাচ্ছে। মানুষকে ঘরমুখো করতে যৌথবাহিনী মাঠে নামানো হয়েছে, জেল জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু ঘরের বাইরে যে দেশের সিংহভাগ মানুষের রুটিরুজি, দুমুঠো ভাত আর প্রাণে বেঁচে থাকার স্থল সেখানে লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ মানে হলো ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।

লকডাউনে এসব নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী মেহনতি মানুষদের আর্তচিৎকার আমরা সমাজপতি, সমাজসেবী, সাহেব, বিত্তবানরা কি শুনতে পাই? সরকার কর্তৃক নিম্নশ্রেণির এসব মানুষদের জন্য দেয়া প্রণোদনা আমাদের বিত্তবানরা কিভাবে লুটপাট করে খেয়েছে সেটার দৃশ্য সবারই জানা।

এদেশে যে পরিমাণ বিত্তবান রয়েছেন তারা যদি এসব নিম্নশ্রেণির মানুষদের জন্য এগিয়ে আসেন তাহলে জাতীয় এ দুঃসময়ে এ মানুষগুলো একটু ছায়া পাবেন, প্রাণে বাঁচবেন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে করোনা সংক্রমণ রোধে টিকাদান নিশ্চিত ছাড়া লকডাউন, শাটডাউন, কঠোর বিধিনিষেধ এসবে এখন আর কাজ হবে না।

করোনা সংক্রমণ রোধে শুরু থেকে সরকার লকডাউন দিলেও মানুষের মাঝে লকডাউন মান্য করতে ছিল তীব্র অনীহা। স¤প্রতি আরোপিত লকডাউনও মানুষ সেভাবে আমলে নিচ্ছে না। অকারণে রাস্তায় বেরুলে প্রশাসন জেল জরিমানা শাস্তি দিয়ে ঘরে অবস্থান করতে বলছেন।

কিন্তু মানুষ কি আদৌ ঘরে থাকছে! শহরের রাস্তাঘাট, দোকানপাট বন্ধ থাকলেও গ্রামের অলিগলিতে বিশেষ করে চায়ের দোকানগুলোতে মানুষের জনস্রোত লক্ষ্য করা যায়। এখন গণমুখী টিকাদান কর্মসূচির বাস্তবায়ন ছাড়া করোনাকে কাবু করার আর কোনো পথ নেই।

দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা, দায়িত্বহীনতা, অনিয়ম, দুর্নীতির চিত্র জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। কিন্তু ভারতের সেরাম ইনিস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করে দেশে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেয়া শুরু করলে জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশব্যাপী সেই টিকা দিয়ে গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়।

ভারত করোনার টিকা রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচিতে নেমে আসে আঁধার, সৃষ্টি হয় সংকট এবং অনিশ্চয়তা। এমনকি যারা প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন তাদের অনেকেই দ্বিতীয় ডোজ সম্পূর্ণের আগেই টিকার মজুদ শেষ হয়ে যায়।

যার ফলশ্রুতিতে ২৬ এপ্রিল থেকে প্রথম ডোজের টিকা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এমন অবস্থায়, বাংলাদেশ সরকার নতুন করে চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ থেকে টিকা আনার ব্যাপারে কার্যক্রম শুরু করে। চলমান করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউনে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

গণমানুষ এখন দিশেহারা। আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সব পরিস্থিতি বিবেচনায় চলমান লকডাউন তুলে দেয়া হবে আশা করা যায়। কিন্তু লকডাউনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি অর্জিত হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। লকডাউন, শাটডাউন, সীমিত পরিসর, কঠোর বিধিনিষেধ এসবের তেমন কার্যকারিতা এখানে দেখা যায় না।

কেউ কারো কথা শুনতে চায় না। সুতরাং, স্বাস্থ্যবিধি মানাই হলো প্রাণঘাতী করোনাকে কাবু করার সর্বশেষ অস্ত্র। করোনাকে প্রতিহত করতে এখন টিকার কোনো বিকল্প নেই। দেশের সকল নাগরিকের টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। তাই গণটিকা কার্যক্রম বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।


poisha bazar

ads
ads