আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ কী


  • ০৫ জুলাই ২০২১, ১৬:২৫

আল আমিন ইসলাম নাসিম : অতি সম্প্রতি আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি ও তার সাবেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এ সময় তিনি আফগানদের তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিজেদেরই নেয়ার আহ্ববান জানান।

আর এনিয়ে আফগানিস্তানসহ পুরো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ও বিশ্বমোড়লদের মনে নয়া প্রশ্নের উত্থান হয়েছে। আর তা হলো আফগান অধিবাসীরা বা নীতিনির্ধারকরা নিজেরাই কি পারবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে নাকি পুনরায় সংঘাতে জড়াবে? অথবা নিজেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে সক্ষম হলেই বা ‘মার্কিন-আফগান’ দুদশকের সংঘাতের পর সমগ্র আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে?

পরন্ত আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ জানতে হলে এর আদি কিচ্ছা জানা অতীব জরুরি। আর এর কিচ্ছা শুরু হয় ২০০১ সাল থেকে। মূলত ২০০১ এর ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলা চালানো হয়। এ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে, শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রে যে সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হয়ে থাকে ইতিহাসে তা ‘নাইন-ইলেভেন’ নামে সর্বাধিক পরিচিত। মূলত আল-কায়েদা নামক আন্তর্জাতিক একটি জঙ্গি সংগঠন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেনে হামলা চালায়। পক্ষান্তরে আফগানিস্তানের তৎকালীন তালেবান সরকার এই আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদাকে মদদ দিয়েছিল।

পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। তদুপরি তৎকালীন বুশ প্রশাসন থেকে বলা হয় আফগান তালেবানের উদ্দেশ্য, ‘আমাদের সোনার কার্পেটের প্রস্তাবটি মেনে নাও আর নয়তো বোমার কার্পেটের নিচে তোমাদের কবর রচিত হবে’।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অভিযানে সমর্থন দেয় তার পশ্চিমা মিত্ররা। অভিযানে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের পতন ঘটে। তবে আফগানিস্তানে তালেবান ও আল-কায়েদা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়নি। মার্কিন সেনারাও আফগানিস্তান ছাড়তে পারেননি।

তথাপি গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ৩০০ জনের বেশি সেনা নিহত হয়েছে ও ২০ হাজারের বেশি সেনাসদস্য আহত হয়েছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতিসাধন হয় তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে।

পরন্তু যে যুদ্ধ ২০০১ সালে সংঘটিত হয়েছিল, তারই অবসান ঘটতে যাচ্ছে প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর অর্থাৎ দু’দশক পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে। পরন্তু গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, আগামী ১১ সেপ্টেম্বর এর পূর্বেই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেনা প্রত্যাহার করে নিবেন।

ইতোমধ্যে তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে শান্তি চুক্তি হয়েছে, তারই পরিপ্রেক্ষিতে এই সেনা প্রত্যাহার। তবে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো সেনা প্রত্যাহার আফগানদের জন্য একটি চমৎকার ভবিষ্যৎ গঠনের সুযোগ এনে দিবে নাকি আফগানদের ভবিষ্যৎ আরো কোণঠাসা করবে সেই প্রশ্নটিও যেন রয়েই যায়।

কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর এর পূর্বেই দু’দশকের এই সংঘাতকে অতি সহজভাবে অনেক পশ্চিমাপন্থিরা নিলেও মূলত এই সেনা প্রত্যাহার একটি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পরিচয়ও বহন করছে। তবে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রকে চতুর্মাত্রিক সংকটে ফেলে দিয়েছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

পরন্তু আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের ফলপ্রসূ ১৯৯৬-২০০১ সালে ক্ষমতায় থাকা সেই তালেবানেরা আবার ভবিষ্যৎ এ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ঘটাতে পারে বিভিন্ন জঙ্গি কার্যক্রম। তালেবানদের ভাষা থেকে মূলত এটি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। তালেবান যোদ্ধাদের ভাষায়: ‘আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি এবং শত্রুকে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত তরঙ্গের পর তরঙ্গ আকারে এগিয়ে যায়’।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে এসব তালেবানেরা হামলা চালালে তা আবার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে যাবে। কেননা তালেবানদের অস্ত্র মজুদ দিয়ে থাকে রাশিয়া। আবার, চীনের ব্যবসায় বা চীনের কার্যক্রমে তালেবানেরা কখনও বাধা প্রদান করে না। আবার ইরান শিয়াপন্থি হলেও পারিপার্শ্বিকভাবে আঁতাত আছে ইরান-তালেবানের।

সর্বোপরি সার্বিক বিশ্লেষণ করলে বোধগম্য হওয়া যায় যে, তালেবানের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে ইরান, রাশিয়া এবং চীন। এছাড়া পাকিস্তানের কথাও শোনা যায়। অভিযোগ আছে যে, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্ববধানে তালেবানদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। পরন্তু এই দেশগুলো যদি সংঘবদ্ধভাবে তালেবানের উত্থানে সাহায্য করে তাহলে বলার অপেক্ষা রাখে না যে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ একটি নয়া পন্থায় পরিবর্তিত হবে।

প্রসঙ্গত, বিচ্ছিন্নভাবে তালেবানরা আফগানে তৎপরতা চালাচ্ছে। সেখানে ন্যাটোর বাহিনী ও ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী মোতায়েন করা হলেও বছর শেষে সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। যদিও রাজনৈতিক কাঠামোর সেখানে জন্ম হয়েছে তবে আফগান জাতিকে একত্রিত করতে পারিনি। স্পষ্টতই হামিদ কারজাই সরকার আফগানিস্তানের সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

আবার অন্যদিকে, আফগানিস্তান দেশটি থেকে মার্কিনিদের নেতৃত্বে ন্যাটো সৈন্যরা চলে গেলে কাবুল হামিদ কারজাই বিমানবন্দরের দায়িত্ব নিবে তুরস্ক। কিন্তু তালেবানেরা চাচ্ছে মুক্ত আফগানিস্তান। যেখানে তারা একাই রাজত্ব কায়েম করবে। তারা খুব একটা চাচ্ছে না যে তুরস্ক তাদের মধ্যে আবার হস্তক্ষেপ করুক। পরন্তু এতে করে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ এ তুরস্কের সঙ্গে তালেবানের একটা যুদ্ধও হতে পারে। তবে এটা আবার ভবিষ্যৎ এ তুরস্ক-তালেবান সমঝোতা করে নয়া মোড়ও সৃষ্টি করতে পারে।

আফগানিস্তান বিভিন্ন খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এগুলো লুট করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দোষী। সুতরাং এই বিষয়বলি থেকেও তালেবানেরা পুনরায় সহিংসতার পথ বেছে নিতে পারে ভবিষ্যতে। আবার বিভিন্ন তালেবানের সদস্য নিহত হওয়ায় বা প্রতিশোধের যে বিষয়টি রয়েছে, সেটিও উল্লেখ করা যেতে পারে। তার জেরেও আফগান তালেবানরা সহিংসতার পথ বেছে নিতে পারে।

এবার প্রশ্ন হতে পারে, ভবিষ্যতে নতুন ক্ষমতার কি পালাবদল হবে না আফগানিস্তানে? আশঙ্কা করা যায়, আফগানিস্তানের রাজনীতিতে তালেবানের উত্থান হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ফলপ্রসূ দীর্ঘদিন ধরে তালেবানেরা ক্ষমতাচ্যুত ছিল। সর্বোপরি তালেবানরা কি ভবিষ্যতে সেখানে সংযম বজায় রাখবে নাকি অন্য ভয়ঙ্কর কিছু ঘটাবে?

পরন্তু যাই ঘটুক নিশ্চিত ভালো কিছু হবে বলে মনে হয় না। আবার যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি সেখানে না থাকলে আফগানিস্তানে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে সন্ত্রাসবাদ, হত্যাকাণ্ড কিংবা জঙ্গিবাদ। পরন্তু আফগানিস্তান ছেড়ে যদি এখন চলেও যায় পরবর্তীতে আফগান ঘিরে শক্ত ঘাঁটি স্থাপিত হবে তালেবান বা আইএসদের।

পরন্তু তালেবানের দাবি, তারা এখন আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে আফগানিস্তানের একটি সংবাদ সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায়, তালেবান অন্তত ৫২ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়া আফগানিস্তানের চারিদিকে রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। সুতরাং তারাও আফগানে ক্ষমতা প্রদর্শন করবে, যা আফগানিস্তানের ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

কার্যত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চলে যাওয়ার ঘোষণা দিতে না দিতেই আফগানিস্তানের পূর্ব অঞ্চলে নাঙ্গারহার প্রদেশের একটি মসজিদে অজ্ঞাত বন্দুকধারীর গুলিতে একই পরিবারের আট সদস্য নিহত হয়েছেন (১৯ এপ্রিল, ডেইলি স্টার)। এছাড়া গণমাধ্যম তথ্যমতে, তালেবানের হামলায় গত শেষ সপ্তাহে ২৯ জন নিহত হয়েছেন।

পরন্তু এ সকল হত্যা ও সংঘাত দেখে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আফগানিস্তানের ভবিষ্যতের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। এছাড়া সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ছয় মাসের মধ্যেই তালেবান কাবুল দখল করে নিবে।

আর এজন্যই ১১ সেপ্টেম্বর পরেও কিছু সংখ্যক (৬৫০ জন) মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে থাকবে। অতঃপর এই মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে থাকবে বিষয়টি নিয়ে তালেবানরাও বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তদ্রুপ আবারও নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এ সকল পরিপ্রেক্ষিত বিষয়গুলোও আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ বিষয়ে শান্তি বা উজ্জ্বল সম্বন্ধনীয় কিছু আনবে বলে মনে হয় না।

সর্বোপরি আফগানিস্তান ছাড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন পন্থায় আফগান ইস্যুতে সংযুক্ত থাকতে চায়। এসব পন্থার মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি, মানবিক সহায়তা ও কূটনীতি প্রভৃতি। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা আফগানে শান্তি প্রতিষ্ঠা না করলে এগুলো কীভাবে কি সম্ভব হবে তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

পরন্তু যদিও সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের পরিবেশ স্থিতিশীল হবে না বরং তা ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। পক্ষান্তরে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। পক্ষান্তরে, যেমনটা হয়েছিল, গত শতকের আশির দশকে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পর, অনেকটা তেমনও হতে পারে।

কিংবা আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে একটা রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে আফগানিস্তানে সিরিয়ার মতো রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। তবে আবার মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার হওয়ার পরে তালেবান কিংবা গনি সরকার যারাই ক্ষমতাই আসুক এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় তবে মধ্যে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক কিংবা বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করে আফগানিস্তান ভবিষ্যতের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান অর্জন করতে পারে।

এছাড়া আফগানিস্তানের পরিস্থিতি যদি এক পাক্ষিকভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় আসে তবে এর সৌন্দর্যময় পর্যটন কেন্দ্র, কৃষি পণ্য ও ফল রফতানি ইত্যাদি আফগানিস্তান এর ভবিষ্যৎকে সুউচ্চে নিয়ে যেতে পারে। যদিও তালেবান সংঘাতে এসকল বিষয়গুলো অনেকখানি চাপা পড়েছিল। এছাড়া আফগানিস্তানের যুবারা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে (ক্রিক্রেট, ফুটবল ইত্যাদি) উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পদার্পণ করেছে।

যদি কাবুলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে তবে এই ক্ষেত্রেও আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ সদা উজ্জ্বল হবে। পরন্তু এখন শুধু সেনা প্রত্যাহারের জন্য অপেক্ষার প্রহর গোনার পালা। সর্বোপরি এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আফগানিস্তানের অদূর ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা সময়ের পরিক্রমায়ই বলে দিবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।


poisha bazar

ads
ads