টিকটকের হুমকিতে উঠতি বয়সীরা


  • ২২ জুন ২০২১, ১০:৩৮

আশরাফ আহমেদ : ‘এই মনে করেন ভাল্লাগে, খুশিতে ঠ্যালায়, ঘুরতে’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন অথচ এই বাক্যটি শুনেননি এমন লোক বোধহয় খোঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক নির্বাচনে ভোট দিতে আসা এক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করেন কেন ভোট দিতে আসলেন?

উত্তরে সে বলেছিল- এই মনে করেন ভাল্লাগে, খুশিতে ঠ্যালায়, ঘুরতে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের রিপোর্টের এই অংশকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে পুনরায় নির্মাণ করে চীনা মিউজিক্যাল ডাবিং অ্যাপ টিকটকে আপলোড করেন এদেশেরই দুই তরুণী।

অশিয়া সিদ্দিকা রোদসী ও আসনা সিদ্দিকা নামে দুই বোনের শখের বশে বানানো ভিডিওটি আপলোড করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায়। টিকটিকে ভাইরাল হওয়া এটাই বাংলাদেশের প্রথম কোনো ভিডিও। এ রকম হাজারো উদাহরণ আছে এদেশে আসা চাইনিজ অ্যাপটিকে ঘিরে। সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় এখন টিকটক নামটা বেশ জনপ্রিয়।

এটি এমন একটি অ্যাপ যার দ্বারা খুব কম দিনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যায়। এমনকি স্বল্পবিস্তর পরিচিতি হয়ে গেলে টাকা রোজগারের সহজ মাধ্যমও এটি। কিন্তু এই মজার অ্যাপই ভয়ঙ্কর ঘটনা ডেকে আনে টিকটক ইউজারদের কাছে। বর্তমানে ছোট ভিডিও তৈরির এই অ্যাপটি তরুণ-তরুণীদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

টিকটক। আক্ষরিক অর্থে যেটিকে ‘গলা কম্পন’ কিংবা ছোট ভিডিও তৈরির প্ল্যাটফর্ম বলা হয়। অল্প বয়সী তরুণ-তরুণীর পছন্দের একটি বিনোদনমূলক অ্যাপ। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা প্রযুক্তিবিদ ঝাং ইয়েমিং সংগীত ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক নেটওয়ার্কের এই অ্যাপটি চালু করেন।

বর্তমানে যেটি এশিয়ার নেতৃস্থানীয় ছোট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় সংগীত ভিডিও সম্প্রদায় হিসেবে নিজের জায়গাটি পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এ বছরের জুনের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন ভারতের মানুষ গড়ে ৩৮ মিনিট টিকটকে সময় কাটান। সময়ের কিছুটা তারতম্য হলেও বাংলাদেশের অবস্থা মোটামুটি একই ধরনের। আমাদের প্রতিদিনের বড় একটা অংশ নিয়ে নিচ্ছে এই টিকটক।

বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে আসলেও বর্তমানে এটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত কোনো ভিডিও বা অডিও এর কিছু অংশ ব্যঙ্গভাবে বক্তব্য বা গানের তালে অভিনয়ের মাধ্যমে কারো সামনে উপস্থাপন করাই হচ্ছে টিকটক। ডাবিং করে তৈরি করা টিকটকের ভিডিওগুলো ১৫ সেকেন্ডের ভিতরেই সীমাবদ্ধ। অল্প সময় হলেও দর্শকদের এটি ব্যাপকভাবে বিনোদিত করতে সক্ষম হয়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনপ্রিয় কোনো ব্যক্তি বা ভাইরাল হওয়া ভিডিও, অডিও এর কিছু অংশ কেটে টিকটক ভিডিও তৈরি করা হয়। পুরো বিষয় আপলোড না করে শুধুমাত্র ব্যঙ্গাত্মক ও আকর্ষণীয় জায়গাগুলো শুনানোর বা দেখানোর ফলে দেশের জনপ্রিয় ব্যক্তিদের সম্পর্কে মানুষের ভিতর ভুল ধারণার জš§ হচ্ছে। যার ফলে মারাত্মকভাবে তাদের সম্মানহানি ঘটছে।

যেটির প্রভাবে সামাজিকভাবেও তাদেরকে অনেক বিরূপ মন্তব্যের শিকার হতে দেখা যায়। প্রতিটা বিষয়েরই ভালো ও খারাপ দিক আছে। সমস্যা হচ্ছে ভালো দিকগুলো আমরা নিচ্ছি না। মাথাটা কেটে না ফেলে মাথা ব্যথা কীভাবে ঠিক করা যায় সে প্রক্রিয়ায় যাওয়া উচিত। নিয়ম মেনে চলে টিকটকে মজা করে হাসিখুশি থাকলে তো কোনো সমস্যা নেই।

বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে চললেও বর্তমানে অ্যাপটি খুবই বাজেভাবে ব্যবহার হচ্ছে। যেভাবে ভিডিওগুলো দেয়া হচ্ছে দেখে লজ্জা লাগে। উঠতি বয়সীরা আপত্তিকর ভিডিও দিচ্ছে। অপু, হৃদয়সহ অসংখ্য বিপথগামী তৈরি হচ্ছে এই টিকটকের দুনিয়ায়। তাদের বেপরোয়া আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এদেশের সচেতন সমাজ। হুমকির মধ্যে পড়েছে বাঙালি সংস্কৃতি।

প্রতিদিনই জন্ম হচ্ছে অনাকাক্সিক্ষত সব ঘটনার। গ্রেফতার করা হচ্ছে টিকটিক তারকাদের। তারপরও কিছুতেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, টিকটকের এই আগ্রাসন। এমন অবস্থায় অনেকেই অ্যাপটি বন্ধ করার জন্য বলেছেন। সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার আশায় দেশের উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা অ্যাপটির মাধ্যমে বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন। সামাজিক আচরণ কিংবা শৃঙ্খলা ভুলে অশালীনতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ছেন।

সঙ্গে জনসমাগমের জায়গা, আবাসিক এলাকা, কিংবা রাস্তার মধ্যে এগুলোর শুটিং করার ফলে মানুষকে ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে। এছাড়াও বিষয়টি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এর শুটিং করে থাকেন। সুরক্ষা যন্ত্রপাতি কিংবা অভিজ্ঞতা না থাকার দরুন প্রায়ই যেটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিচ্ছে।

গত বছর টিকটিকের শুটিং করতে ব্রিজ থেকে লাফ দিতে গিয়ে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার এক যুবক মারা যান। এছাড়াও অভিনয়ের নামে অনেক অশালীনতা এর ভিতরে ডুকে যাচ্ছে। যেগুলো দেখে অনেকেই এগুলোতে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছেন। ফলে তাদের সামাজিক আদব কায়দা কিংবা ইতিবাচক মানসিকতাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রেও যার অনাকাক্সিক্ষত প্রভাব পড়ছে। যেকারণে অভিভাবকরা এসব তরুণ প্রজšে§র বিষয়ে খুবই উদ্বিগ্ন হচ্ছেন।

যদিও ১৩ বছরের বেশি বয়সীদেরই এই অ্যাপ ব্যবহার করার কথা, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এর থেকে কমবয়সীরাও টিকটক ব্যবহার করছে। যে ভিডিও অন্যান্য দেশে স্বাভাবিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশে তা অস্বাভাবিক। অথচ এসব বিষয়ে কেন জানি আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্ম বুঝেও না বুঝার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছেন। যার ফলে হুমকির মুখে আছেন আমদের আগামীর দেশ গড়ার কারিগরেরা। তাই দেশের তরুণ প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য অ্যাপটি বন্ধ করে দেয়া উচিত।

বিভিন্ন সময়ে টিকটক লাইকির মতো অ্যাপগুলো বন্ধ করে দেয়ার কথা বললেও কার্যত সেটি হচ্ছে না। যদিও বা সেটি করা সম্ভব না হয় তবে এটিকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিতরে আনতে হবে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা একরকম নয়। কারো মানহানি হয় এমন কিছু করা যাবে না কিংবা আপত্তিকর কোনো ভিডিও আপ করা যাবে না।

যেটা অমান্য করলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে এ রকম কঠোরভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সুস্থ চিন্তা করতে দরকার সুস্থ বিনোদন, কিন্তু আমরা ছুটে চলছি এক অসুস্থ বিনোদন নিয়ে। সস্তা হাসি-ঠাট্টা আর খিস্তিতে ভরা এমন বিনোদন আমাদের সুস্থ মানসিকতাকে রীতিমতো পন্ড করে ফেলছে।

অশালীনতার আবহে অঙ্গভঙ্গি বিকৃত করে এগিয়ে যাচ্ছি এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা কতটা ভয়ংকর হতে পারে সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আগেই সময়ের প্রয়োজনে সরকারের উচিত এখনই এর লাগাম টেনে ধরা।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও প্রাবন্ধিক।


poisha bazar

ads
ads