সুন্দরবনের সৌন্দর্য রক্ষায় ব্যবস্থা নিন


  • রূপম চক্রবর্ত্তী
  • ১৯ জুন ২০২১, ১১:১২

সুন্দরবনে যেতে যেতে ভাবছিলাম প্রকৃতি প্রদত্ত এই সম্পদের সুষম ব্যবহার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরো সমৃদ্ধ করবে। নানা কারণে বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সুন্দরবনের এই অস্তিত্ব সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন লেখক লেখালেখি করেছেন। বন রক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবিতে সভা-সমাবেশ, সেমিনার করেছে, এখনও করছে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বনের বেশিরভাগ অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এর বড় একটি অংশ পানিতে তলিয়ে যাবে। ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে এ অঞ্চলের যতেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে, যদি বড় ধরনের পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তবে মানচিত্রে সুন্দরবনের কোনো চিহ্ন থাকবে না। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা গেছে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সুন্দরবনের ধারাবাহিক ইকোসিস্টেম বজায় রাখার জন্য ভারত ও বাংলাদেশ মিলে যৌথ প্ল্যাটফর্ম গঠনের সুপারিশ করেছেন। সুন্দরবন রক্ষায় এই সুপারিশ বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে।

এদেশের মানুষ বিভিন্ন সময় প্রতিকূল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করছেন। কখনো বন্যা, কখনো ঘূর্ণিঝড়ের সাথে যুদ্ধ করছেন এদেশের মানুষ। উপক‚লীয় এলাকার মানুষ সব সময় চিন্তায় থাকে। সুন্দরবন বিভিন্ন সময় এদেশের মানুষকে রক্ষা করছে। যদি সুন্দরবন না থাকত, তাহলে ওই সব অঞ্চল অনেক আগেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যেত।

মায়ের আঁচলের মতো আগলে রেখে সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করেছে। পরিতাপের বিষয় এই বনটিকে রক্ষায় আমরা তেমন কিছুই করছি না। বাংলাদেশের জলবায়ু দিনদিন পরিবর্তন হচ্ছে। লবণাক্ততার পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলেছে। সুপেয় পানির মারাত্মক সংকট দেখা দিচ্ছে। গবেষকরা বলতে চাচ্ছেন বিশাল এলাকায় জমির স্বাভাবিক উর্বরতা বিপন্ন হবে।

সারাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাবে, কৃষিখাতে বিপর্যয়, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাবে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্রাফট কয়েক বছর আগে বিশ্বের ১৭০টি দেশের ওপর জরিপ চালিয়ে যে ১৬টি দেশকে সর্বাপেক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। উপকূল, চর, দীপাঞ্চলের ভূমি তলিয়ে বা হারিয়ে যাচ্ছে। বাস্তভিটা হারিয়ে উপক‚লের মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। কাজের সন্ধানে লাখ লাখ মানুষ শহরমুখী হচ্ছে।

শুধু প্রকৃতির এই পরিবর্তনের প্রভাবে নয়, বিভিন্ন মানুষ তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুন্দরবনকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা চিংড়ি হ্যাচারিগুলো সুন্দরবনের পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। সুন্দরবনের ক্ষতি হলে মৎস্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়বেন।

অর্থনৈতিক এ ক্ষতির পাশাপাশি কল্পনাতীত প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে। আমাদের মনে আছে বিগত ২০০৭ সালে যে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত এনেছিল, তাতে সুন্দরবনের অনেক ক্ষতি হয়েছিল। সুন্দরবন যদি না থাকত তবে সিডর যে আঘাত হেনেছিল, তা এসে পড়ত লোকালয়ে। সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক প্রাচীর থাকার কারণে ঘূর্ণিঝড় যেমন পুরোপুরি আঘাত হানতে পারছে না, তেমনি বিশাল উপকূলীয় এলাকা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে।

সারা পৃথিবীর মানুষ এখন জলবায়ু নিয়ে চিন্তিত। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এসব অঞ্চলের অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সাগর অশান্ত হয়ে উঠছে। কিছু দিন পর পর সাগরে লঘুচাপ, নিম্নচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াসের প্রভাবে সাগর উত্তাল হচ্ছে। উপকূলীয় বনাঞ্চলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বনের ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে বাকি ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার ভারতে। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর গুরুত্ব বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা যেভাবে উপলব্ধি করেছেন আমাদের সবাইকে সেভাবে উপলব্ধি করতে হবে। সুন্দরবনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে তার দায়িত্ব আমাদের সবাইকে নিতে হবে।

সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন ধরনের নৌযান চলাচল করে। এই সব নৌযানের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সুন্দরবনকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে দেয়া যাবে না। প্রকৃতি দিয়েছে প্রকৃতিই একে রক্ষা করবে এই চিন্তা নিয়ে চললে হবে না। প্রকৃতির এই সম্পদকে সুরক্ষার জন্য সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

দেশি-বিদেশি পরিবেশ বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে সুন্দরবন রক্ষা এবং উপক‚লভাগ রক্ষা প্রকল্প নামে আলাদা প্রকল্প গঠন করে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী মহাপরিকল্পনার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের মতো সুন্দরবন রক্ষায় প্রকল্প হাতে নেয়া জরুরি। মনে রাখা দরকার, সুন্দরবন প্রকৃতির অপার দান। এটা মানুষ সৃষ্টি করেনি। মানুষের পক্ষে তা করাও সম্ভব নয়।

এটি যদি ধ্বংস হয়ে যায়, আরেকটি সুন্দরবন এ পৃথিবীতে তৈরি হবে না। কাজেই প্রকৃতির অমূল্য এই সম্পদ রক্ষায় সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিগত সময়ে বৃক্ষরাজির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। তার ওপর এর ভেতরে গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে এর ভেতরের অনেক জায়গা ফাঁকা হয়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে, সুন্দরবনকে যথেচ্ছভাবে যেমন খুশি তেমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সুন্দরবনের আশপাশের মানুষকে সচেতন থাকতে হবে। প্রয়োজনে এই মানুষগুলোকে পর্যাপ্ত ট্রেনিং-এর মাধ্যমে সুন্দরবনের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

সুন্দরী গেওয়া, গরান, কেওড়া এবং গোলপাতা গাছ সমৃদ্ধ এই সুন্দরবনে মানুষের অবাধ বিচরণের কারণে প্রাণী ও বনজসম্পদ ক্রমান্বয়ে বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে। পশুর, বালেশ্বের, শিবসা, খোলপটুয়ার মতো অনেক ছোট-বড়ো নদ-নদী সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। এই নদ-নদী হতে প্রচুর মাছ ধরা হয় ও বিভিন্ন যাত্রীবাহী নৌকা চলাচল করে থাকে।

এই নৌকাগুলোর মাধ্যমে নদী যেন দূষিত না হয় তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্ব জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুন্দরবনের জন্য খরচ করতে হবে। পাশাপাশি গণসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রম শুরু করতে হবে। ভ‚মিক্ষয় ঠেকাতে উপক‚লীয় এলাকায় আরও বেশি গাছ লাগাতে হবে।

এই বন রক্ষার জন্য সরকার বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি এই বনে মানুষের অবাধ প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারেন। যেসব মানুষ সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সুন্দরবনের পাশে বসবাসরত মানুষ সরিয়ে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা প্রয়োজন। বনের গাছ কাটা ও পশুপাখি শিকার বন্ধ করতে হবে। এছাড়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে যেসব অপরাধ হয়, তা প্রতিহত করতে সরকারের প্রশাসনকে আরও তৎপর হতে হবে।

শতকরা ৪৫ ভাগ কাঠ ও জ্বালানির যোগান দেয় এই বন। মধু, মাছ শিকার, গোলপাতাসহ অন্যান্য বনজসম্পদ আহরণ করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। শুধু জীবিকা নির্বাহ নয়, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহতের একটি বিরাট প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে এ বন কাজ করছে। ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় থেকে ঐ অঞ্চলকে ব্যাপক ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছে এই বন।

সুন্দরবন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ০.৯ থেকে ২.১১ মিটার বা ৩ থেকে ৬.৯ ফুট উঁচুতে। প্রতিবছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ৩ থেকে ৮ মিলিমিটার বাড়ছে। ইউনেস্কো বলেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এভাবে যদি বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে আগামী এক-দুই দশকে সুন্দরবনের বিশাল অংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। এসব সতর্কবার্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা সচেতন এবং কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করছেন এটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।

সুন্দরবন রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। সুন্দরবন যদি না থাকে, তবে কি অবস্থা হবে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। কাজেই, সুন্দরবন রক্ষায় যা যা করণীয় তাই করতে হবে। সুন্দরবনের ক্ষতি হয় এমন সব প্রকল্প সরিয়ে নিতে হবে। সুন্দরবন বাঁচুক তার আপন মহিমায়। কেননা সুন্দরবনের সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।


poisha bazar

ads
ads