সমাজ গঠনে চাই সামাজিক আন্দোলন


  • মু. সায়েম আহমাদ
  • ০৯ জুন ২০২১, ১০:৫৪

মানুষ সামাজিক জীব। এই সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে মানুষ বা মানববন্ধনকে কেন্দ্র করে। সমাজের প্রতিটি কাজ মানুষের দ্বারা সংঘটিত। চাই সেটা ভালো কাজ কিংবা ভিন্ন ধরনের কোনো কাজ। আর এই সমাজে একাকী কোনো মানুষের বসবাস নয়, বরং বহুরূপী মানুষদের নিয়ে বসবাস।

ধনী-গরিব থেকে শুরু করে শিক্ষিত-অশিক্ষিত বহু পেশায় নিয়োজিত মানুষগুলো মিল বন্ধনে বসবাস করে। সমাজ মানেই ভালোবাসা, সমাজ মানে মিল বন্ধন। এই জন্যই অ্যারিস্টটল যথার্থ বলেছিলেন, যে সমাজে বাস করে না সে হয়তো পশু নয়তো দেবতা। কাজেই এই মানব জাতিকে নিয়েই এই সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠা।

কিন্তু কালের বিবর্তনে এই সমাজ ব্যবস্থায় কতটুকু মিল বন্ধনের মধ্যে দিয়ে চলমান সেটি নিয়েও প্রশ্ন। কারণ আমাদের দেশে অতীতের সমাজ ব্যবস্থার কথা যদি বলি তাহলে বলতে হয় সবাই যেন এক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। তখন যদি কেউ বিপদে পড়ত তাহলে সবাই তার পাশে দাঁড়াত। তার দুঃখ কষ্টের কথা শুনত।

সাধ্য অনুসারে সহযোগিতা করার মনোভাব নিয়ে পাশে থাকত। সমাজে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে সবাই মিলে পরামর্শ করে সমাধান করত। ছোট থেকে বড় সবাই এখানে কথা বলার সুযোগ পেত। সমাজে কোনো ধরনের প্রতিহিংসা ছিল না। ছিল না কোনো রাগ-ক্ষোভ।

তখনকার সময়ে মানুষের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ ছিল, ভালোবাসা ছিল। একে অপরের প্রতি ভক্তি ছিল। একজন অপরজনের কাছে সুন্দর পরামর্শের জন্য মিল বন্ধনের মাধ্যমে আলোচনা করত। যার ফলশ্রুতিতে সমাজ ব্যবস্থায় এক অনন্য শান্তিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সবাই সুন্দরভাবে জীবনযাপন করত।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আজ এই সমাজ ব্যবস্থায় অসুখ ভর করেছে। দিন দিন সমাজ ব্যবস্থা অধপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই। কারণ আগের মতো কেউ কারোর প্রতি মায়া করে না। সবার মধ্যে আন্তরিকতার বড় অভাব। আজ সমাজে প্রতিহিংসার চর্চা হয়, অহংকার করার চর্চা হয়। একজনের ভালো অন্যজনে ভালো চোখে দেখে না। সহ্য করতে পারে না আমি পারিনি সে কীভাবে পারল।

সমাজে যদি কেউ ভালো অবস্থানে যায়, কিংবা কোনো ধরনের সাফল্য অর্জন করে ঠিক তখনি সবাই তার পেছনে লেগে থাকে তার দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করার জন্য। কিভাবে তাকে হেনস্থা করা যায় সেসব পন্থা অবলম্বন করতে থাকে সমাজের কিছু নিচু মনমানসিকতার অধিকারী মানুষ। একজন আরেকজনের প্রতি রাগ ক্ষোভ নিয়ে জীবনযাপন করে।

তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র মানবকুলের যে ভালোবাসা থাকে। সে ভালোবাসার ছিটেফোঁটাও নেই। সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে একজনের পেছনে অন্যজন লেগে থাকে। হোক সেটা জায়গা জমি নিয়ে কিংবা অন্য কোনো ইস্যু নিয়ে। তবে বর্তমানে অধিকাংশ সামাজিক সহিংসতার জন্য দায়ী জায়গা জমি বিরোধ সম্পর্কিত।

যার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মধ্যে যে মনুষ্যত্ব বোধ বা আন্তরিকতা কাজ করে সেটি ধ্বংস হয়ে যায়। আর তখনই শুরু হয় সামাজিক সহিংসতা। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এক সামাজিক ব্যাধি হচ্ছে সমালোচনা। একজন অপরজনের সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। অথচ আমি কতটুকু সত্য, কতটুকু খাঁটি সেটা নিয়ে কেউ ভাবে না। দিনশেষে কিন্তু আমাদের সবার মাঝে কোনো না কোনো দোষ-ত্রুটি রয়েছে। সেদিকে আমরা বিবেচনা করি না। যদি করতাম তাহলে কখনো অন্যের সমালোচনায় লিপ্ত হতাম না।

সমাজে কর্ম পরিচয় নিয়ে একজন অপরজনের হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। যে উচ্চ পর্যায়ে কর্ম পরিচয় বহন করে চলে তাকে সবাই বাহবা দিয়ে বরণ করে নেয়। কিন্তু যে সাধারণ বা যেকোনো পেশায় নিয়োজিত থাকে। তাকে কোনো ধরনের মূল্যায়ন করা হয় না। বরং তাদেরকে অহংকারী মনোভাব নিয়ে দেখে।

এক্ষেত্রে যদি বলি তাহলে বলতে হবে, অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কথা। যেমন বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় যেকোনো অনুষ্ঠানে থেকে শুরু করে সামাজিক যেকোনো কর্মকাণ্ডে শিক্ষক ও সাধারণ পেশায় নিয়োজিত মানুষগুলোকে চরম অবহেলার চোখে দেখা হয়। অথচ শিক্ষকরা হচ্ছেন এদেশ গড়ার কারিগর, একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মূল হাতিয়ার।

একজন মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক যে প্রাথমিক শিক্ষা পায় তা কিন্তু এই শিক্ষকদের থেকে অর্জন করে। এই সমাজ ব্যবস্থা প্রত্যেক মানুষের দ্বারা গড়ে ওঠা। একটি সমাজ গড়ে তোলা কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। এই সমাজে সবার কথা বলা থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে অধিকার রয়েছে। একটা চিরন্তন সত্য কথা হলো, যত বেশি জ্ঞান অর্জন করা যায় তত বেশি মানুষের প্রাধান্য বা অগ্রাধিকার পাওয়া যায়।

কিন্তু বর্তমানে এই কথাটির কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটি নিয়েও প্রশ্ন। আর বিশেষ করে কর্ম পরিচয় যদি ভালো মানের না হয় কেউ প্রাধান্য দিবে না। শিক্ষিত সমাজ গড়তে হলে অবশ্য শিক্ষিত সমাজ সংস্কারক বা যোগ্য ব্যক্তির দরকার। কিন্তু এই সমাজে এখন অযোগ্য লোকদের কদর করে বেশি।

যার ফলশ্রুতিতে সমাজ ব্যবস্থায় একজন অপরজনের সঙ্গে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। সমাজে মিল বন্ধনের অভাবের শূন্যতা দেখা দেয়। অথচ এই সমাজ ব্যবস্থায় একে অপরের কাজে সহযোগিতা করবে। একজনের সঙ্গে অন্যজনের ভ্রাতৃত্বপরায়ণ আচরণ থাকবে, ভালোবাসা থাকবে। একটি সমাজে যখন কেউ বিপদে পড়ে তখন সবাই তার পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ এই সমাজ ব্যবস্থায় ঠিক তার বিপরীত চিত্রটি ফুটে ওঠে।

সুতরাং, আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায় শান্তিশৃঙ্খলা সৃষ্টির লক্ষ্যে সবার মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। সমাজে শিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের বা শিশুদের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায় থেকে নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তাদের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত করতে পরিবারকে সোচ্চার হতে হবে।

কেন না, সামাজিক সহিংসতা প্রতিরোধের মৌলিক ভিত্তি কিন্তু এটি। সমাজ ব্যবস্থায় কেউ কোনো ধরনের প্রতিহিংসা বা রাগ ক্ষোভ নিয়ে জীবনযাপন করতে পারবে না। একজন অপরজনের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধন নিয়ে সমাজ ব্যবস্থায় আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। অহংকার বা প্রতিহিংসা দূরীভ‚ত করতে হবে।

সমালোচনা বা নেতিবাচক মনোভাবের মতো ঘৃণিত কাজটির পথে ধাবিত না হয়ে সবার প্রাণে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত করতে হবে। যার ফলশ্রুতিতে সমাজ ব্যবস্থায় এক অনন্য শান্তিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা করি।

লেখক: কলামিস্ট ও সংস্কৃতিকর্মী।


poisha bazar

ads
ads