আফগানিস্তানে কি শান্তি ফিরবে?


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৮ মে ২০২১, ১২:১৫

মো. শহীদুল ইসলাম : গত বছর ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে কাতারের দোহাতে যে চুক্তি হয়েছিল তাতে এ বছরের ১ মের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সকল সৈন্য প্রত্যাহার করার কথা ছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউসে বাইডেন প্রশাসন আসার পর এ চুক্তি খতিয়ে দেখার ঘোষণা দেয়া হয়, পরবর্তীতে ১৪ এপ্রিল জো বাইডেন ঘোষণা করেন এ বছরের ১১ সেপ্টেম্বর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের সব সৈন্যকে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করা হবে।

ওই ঘোষণার পর ন্যাটোও জানায় তারাও এ সময়ের মধ্যেই জোটটির সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নিবে। এই ঘোষণাকে তালেবান স্বাগত তো জানায়ই নি বরং তারা বিবৃতি দিয়েছে গত বছর যে চুক্তি হয়েছিল সে অনুযায়ী সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে এবং সৈন্য প্রত্যাহারের মেয়াদ বাড়ানো হলে তা আবারও সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে এ সময়ের মধ্য আফগান সরকার এবং তালেবান একটা গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছাক। যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে চুক্তি হলেও ভবিষ্যৎ আফগানিস্তানের শাসন প্রকৃতি কেমন হবে এবং আফগান সরকার ও তালেবানের মধ্য সম্পর্ক কি হবে, এটা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলে আসছিল কাতারের দোহায়।

কিন্তু এখন অবধি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি এই দু’পক্ষের কেউই । গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি হওয়ার পর তালেবান যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর সৈন্যদের ওপর হামলা বন্ধ রাখলেও আফগান সৈন্য ও তালেবানদের মধ্য সহিংসতা চলমান ছিল। এ সময়েও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে।

আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের তথা ন্যাটোর সাথে তালেবানের একটি বিশ্বাস যোগ্য সমঝোতা প্রয়োজন তেমন একই সাথে ভবিষ্যৎ শাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আফগান সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা প্রয়োজন।

এ মাসের ১৪ তারিখে ইস্তান্বুলে জাতিসংঘ এবং তুরস্কের উদ্যোগে আফগান সরকার এবং তালেবানের মধ্যে একটি শান্তি আলোচনার কথা ছিল। তালেবানের অংশগ্রহণের অনিশ্চয়তায় এটা পিছিয়ে ২৪ এপ্রিল করা হয়। এর পরও তালেবানের অংশগ্রহণের অনিশ্চয়তার মুখে ২১ এপ্রিল তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান আপাতত শান্তি আলোচনা হচ্ছে না। রমজানের পর অন্য কোনো একসময় হবে।

তালেবান বরাবরই বলে আসছিল তারা যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহার ব্যতীত কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করবে না। অর্থাৎ গত ১ মের মার্কিন সৈন্যদের কাবুল ত্যাগের মধ্য দিয়ে তালেবান ও কাবুল সরকারের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা হয়েই গেল। আশা জাগানিয়া, বহুল প্রত্যাশিত আফগান শান্তি প্রক্রিয়া কি তাহলে অনিশ্চতার মধ্য পড়ে গেল?

তালেবান বার বার বলছে চুক্তি অনুযায়ী ১ মের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহার না হলে তা আবার যুদ্ধে রূপ নিবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে কোনো রকম আক্রমণ হলে তার সমুচিত জবাব দেয়া হবে। একদিকে আফগান বাহিনীর সাথে তালেবানের চলমান সহিংসতা ব্যাপক রূপ নিয়েছে।

হতে পারে তালেবান তাদের শক্তি জানান দিচ্ছে যেন শান্তি আলোচনায় নিজেদের পাল্লাটা ভারী করা যায়। ঠিক এই মুহূর্তে আবার বিদেশি সৈন্যদের সাথে পুনরায় সহিংসতা পরিস্থিতি অন্যরূপ নিবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দীর্ঘদিন রাজনীতির সাথে যুক্ত আছেন। বাইডেন বরাবরই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বিপক্ষে। এ ছাড়া গত ২০ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্জন বলতে তেমন কিছুই নাই। শুধু মাত্র কাবুলের তালেবান সরকারকে হঠানো ছাড়া। কিন্তু তালেবানকে কাবুল থেকে সরানো গেলেও এখন অবধিও দেশের অর্ধেকটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

কাবুলে যে সরকার আসরাফ ঘানির সরকার আছে তা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া কতদিন টিকতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে খরচ করতে হয়েছে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ, ব্যাপক প্রাণহানি তো আছেই। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র আর এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আগ্রহী নয়।

কিন্তু আফগান সরকার এবং তালেবানের মধ্য (মধ্যে)একটা সমঝোতা এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেল। তালেবান দীর্ঘদিন ধরেই কাবুলের সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল আখ্যা দিয়ে তাদের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসতেও রাজি হয়নি। অবশেষে আলোচনা শুরু হলেও তা কোনো ধরনের সমাধান দিতে পারেনি।

অন্যদিকে, বিশ্লেষকেরা সন্দেহ করছে ন্যাটোর সৈন্য প্রত্যাহার হলে তালেবানরা আরো শক্তিশালী হবে। যদি কোনো ধরনের সমঝোতার আগেই বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করা হয় তাহলে কাবুলে ক্ষমতা টিকে রাখা আশরাফ ঘানি সরকারের জন্য অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

এখানে উল্লেখ্য, সোভিয়েত সৈন্যদের বিপক্ষে লড়তেই যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের সৃষ্টি করেছিল। এরপর তালেবান যখন ক্ষমতা নেয়, তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে চলে যায়। আল কায়েদার নিরাপদ আবাসে পরিণত হয় আফগানিস্তান। কেনিয়া, তাঞ্জিনিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা আল কায়েদার টার্গেটে পরিণত হয়।

কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার হামলার পর আর অপেক্ষা করেনি যুক্তরাষ্ট্র। পতন হয় কাবুলে তালোবান প্রশাসনের। এরপর গত ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে ন্যাটোর উপস্থিতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তালেবানের গত বছর যে চুক্তি হয়েছিল সেখানে আল কায়েদার সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলা হয়েছে।

এর বিনিয়মে সব বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু তালেবানরা ক্ষমতায় যেতে পারলে কিভাবে শাসন চালাবে সেটা এখন আলোচিত হতে বাকি। তালেবানের শাসন ব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগীয় কায়দার, যেখানে সংখ্যালঘুদের, ও নারীদের অধিকার উপেক্ষিত ছিল।

এক পর্যায়ে গিয়ে দরিদ্রতা, বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করে, করলে তালেবান সরকার তখন আলকায়েদার সহায়তায় দেশ পরিচালনা করে। ২০ বছর আগের তালেবান এবং আজকের তালেবানের মধ্য কিছুটা পার্থক্য তো অবশ্যই আছে। ২০১৩ সালে কাতারের দোহায় কার্যালয় স্থাপনের পর তারা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ অনেকটা বাড়িয়েছে।

বিচ্ছিন্ন একটা গোষ্ঠী থেকে তারা এখন অনেকটায় মূলধারায় এসেছে। অনেক দেশের সাথে তারা যোগাযোগ রাখছে। আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসন প্রকৃতিতে পাকিস্তান একটা প্রভাব বিস্তারকারী পক্ষ। অভিযোগ করা হয় যে, বরাবরই তালেবানের সাথে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একটা যোগাযোগ আছে।

একই সাথে ন্যাটো তালেবানের সাথে যুদ্ধে পাক-ভ‚খণ্ড ব্যবহার করেছে। তুরস্কে বাতিল হওয়া শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের সমর্থন ছিল। গত বছর যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি হয়, তখন দোহায় কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ অনেক দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছিল।

কয়েকমাস আগে তালেবানের একটি প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করেছেন। সব মিলিয়ে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে চলামান শান্তি পক্রিয়ার প্রভাব রাখার সুযোগ রয়েছে। আশা জাগানিয়া শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে না পারলে আফগানিস্তানে শান্তি আসবে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



poisha bazar

ads
ads