নৌ দুর্ঘটনা আর নয়, চাই সচেতনতা


  • ০৭ মে ২০২১, ১২:১৩

বিশাল সাহা: নদীমাতৃক দেশটায় জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নদী। ওতপ্রোতভাবে নদী আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অবিচ্ছেদ্যভাবে। নদীকেন্দ্রিক দেশ হওয়ায় নৌপথ একটা জনপ্রিয় জনপথ বলে গণ্য হয়েছে আমাদের। বাণিজ্যিক কারণে অনেক আগে থেকেই নৌপথের জনপ্রিয়তা রয়েছে।

যোগাযোগে নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে বেশ আগে থেকেই। এর কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে, দ্রুত গন্তব্যস্থানে পৌঁছানোর সুবিধা, প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগসহ বেশ কিছু কারণ। নৌপথ ব্যবহারের অন্যতম কারণের মধ্যে একটি হলো অনেক অঞ্চলের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হওয়ায়।

একমাত্র বললে ভুল হবে, এক কথায় সহজ পথ হওয়ায়। কিন্তু নৌপথ যেন এখন মৃত্যুকূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকদিনের ব্যবধানেই নতুন নৌ দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়। বাতাসে ভাসে প্রিয়জন হারানোর বিষাদমাখা হাহাকার। ফুটফুটে তাজা প্রাণগুলো হেরে যায় জীবনের কাছে।

নৌ দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে আছে অতিরিক্ত যাত্রী কিংবা মালামাল বহন করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেটের ঘাটতি, অসচেতন ও অনভিজ্ঞ চালক, লাইসেন্সবিহীন নৌযান তথা লাইসেন্সবিহীন লঞ্চ, স্টিমার, জাহাজ চলাচল, ক্ষতিগ্রস্ত নৌযান ব্যবহার, নদীতে চর পড়ায় মাটির সঙ্গে ধাক্কাসহ বেশ কিছু কারণ উল্লেখযোগ্য।

বর্ষার মৌসুমে নদীতে স্রোত বেশি থাকায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। অনেক সময় ভুল রুটে চলাচলের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। বর্ষা মৌসুমে অন্য সময়ের চেয়ে নৌ দুর্ঘটনার পরিমাণটা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাছাড়া নৌ দুর্ঘটনার জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দায়ী করা হয় কিন্তু পরিসংখ্যান বলে মোট নৌ দুর্ঘটনার ২৩.৬০ শতাংশ হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তথা ঝড়, বৃষ্টি, জোয়ার-ভাটা কিংবা বৈরী হাওয়ার জন্য।

মৃত্যুর বরপুত্র এসে বরণ করে নিচ্ছে অকস্মাৎ নৌ দুর্ঘটনায় টগবগে তাজা প্রাণ। নৌ দুর্ঘটনায় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা হারিয়ে ফেলে তাদের মূল্যবান প্রাণ। কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করে আজীবনের জন্য। সবচেয়ে দুঃখজনক কথা নৌদুর্ঘটনার ফলে অনেক সময় অমনককে খুঁজেই পাওয়া যায় না।

প্রিয়জনেরা শেষ দেখার সুযোগটুকু পান না। সাত বছর আগে ঈদের পরে কয়েকশ’ যাত্রী নিয়ে ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ জাহাজের ৭০ জন মানুষের খোঁজ এখনো মেলেনি। শেষ দেখাটাও দেখতে পাননি নিখোঁজের মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে কিংবা প্রিয়জনের কেউই। হাহাকারের রেশম বুনে বাঁচতে হচ্ছে নিখোঁজের প্রিয়জনদের।

নৌ দুর্ঘটনা বর্তমানে সামাজিক অভিশাপে রূপ নিয়েছে। ঈদের আগে পরে এমন নৌ দুর্ঘটনা একরকম অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছরের পরিসংখ্যান তাই বলে। সম্প্রতি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাংলাবাজার ফেরিঘাটে বালুবাহী বাল্কহেডের সঙ্গে একটি স্পিডবোর্ডের সংঘর্ষ ঘটে।

এ দুর্ঘটনায় ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যে স্পিডবোর্ডের যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ১০-১২ জন সেখানে ৩০ জনের উপরে যাত্রী! ছিল না পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, যার জন্য প্রাণহানি ঘটেছে আরো বেশি। এমন দুর্ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। কিন্তু লকডাউনে যেখানে সবকিছু বন্ধ, এমন কি স্পিডবোর্ড চলাচলও বন্ধ, সেখানে কিভাবে এত যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোর্ড চলে! এমন প্রশ্ন থেকেই যায়।

প্রয়োজনের অতিরিক্ত যাত্রী কিংবা মালামাল বহনের জন্য মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়, জীবন বলি দিতে হয় নিমিষেই। হোক সেটা বাড়তি টাকা উপার্জনের লক্ষ্যে কিংবা যাত্রীর চাপে। কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীর অসাবধানতার জন্যও দুর্ঘটনা ঘটে। এর আগে গত এপ্রিল মাসে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় ৩৫ জন যাত্রীর প্রাণ যায়।

কার্গোর ধাক্কাতে লঞ্চটি ডুবে যায়। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জানা যায় কার্গোটি লঞ্চের সামনে এসে হর্ণও দেয়নি। লঞ্চটি ডুবে যাওয়াতে কার্গো চালকের দায় এড়ানোর কোনো উপায় নেই। এ দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে, তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর ত্রুটি সম্পর্কে। সেতুর নকশায় ত্রুটি থাকার প্রভাব পড়েছে এই মর্মান্তিক মৃত্যু মিছিলে।

গত দেড় মাসের এই পরিসংখ্যান দেখে, করুণ মৃত্যুর কথা ভাবলে চোখ ঝাপসা হয়ে আসার কথা যে কারো। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৯ বছরে ৫৭০টি দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৬৫৪ জন মারা গেছেন। এসব ঘটনায় ৫১৬ জন আহত ও ৪৮৯ জন নিখোঁজ হন। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযানের সংখ্যা ২৩৬টি।

২০১৯ সালে ২৬টি নৌ দুর্ঘটনায় তিনজন মারা গেছেন। ৩৩ জন আহত ও ২০ জন নিখোঁজ হন। এর আগে ২০১৫ সালে ২২টি দুর্ঘটনায় ১২০ জন মারা যান। আরেকটি ৫০ বছরের পরিসংখ্যানের চিত্র তুলে ধরলে নৌ দুর্ঘটনার ভয়াবহতা চোখের সামনে ভেসে উঠবে।

‘জাতীয় নৌ-নিরাপত্তা সপ্তাহ-২০১৭’ উপলক্ষে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি ৫০ বছরে নৌ-দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান প্রকাশের প্রতিবেদনে জানা যায়, ৫০ বছরে দেশে নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২০ হাজার ৫০৮ জন। সম্পদের ক্ষতি হয় ৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

দীর্ঘ এ সময়ে দুর্ঘটনাকবলিত নৌযানের সংখ্যা ২ হাজার ৬৭২। এর মধ্যে ৯০১টি নৌযান কোনোদিনই উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে গত ১২ বছরের মধ্যে ২০০৭ সালে নৌ-দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, যার সংখ্যা ২ হাজার ১৭৭ জন। এমন বড় বড় দুর্ঘটনা ছাড়া ছোটখাটো দুর্ঘটনা নৌপথে লেগেই থাকে।

নৌপরিবহন অধিদফতর থেকে জানা যায়, দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান ও ধরন অনুযায়ী শুধু সংঘর্ষে ৪২ দশমিক ৭০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত যাত্রী বা মাল বোঝাইয়ের কারণে ২৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২৩ দশমিক ৬০ শতাংশ, অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং অন্যসব কারণে ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে।

সংঘর্ষের বেশিরভাগ ঘটনার সঙ্গে মানুষ জড়িত। নৌপথে দুর্ঘটনা হওয়ার ও দুর্ঘটনা না কমার কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হলো প্রশাসনের গাফিলতি। দুর্ঘটনাগুলো হয় তারপর প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করে কিছুদিন পর আবার সব থেমে যায়।

এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশের একমাত্র নৌ আদালতে মামলা ঝুলছে প্রায় ১৬০০টি। মামলা হলেও বিচার না হওয়ার কারণের মধ্যে আছে রাষ্ট্র পক্ষের উদাসীনতা কিংবা সাক্ষী হাজির করতে না পারা। মামলা হলেও বিচার না হওয়ার কারণের মধ্যে আছে রাষ্ট্র পক্ষের উদাসীনতা কিংবা সাক্ষী হাজির করতে না পারা। তবে এই দায় এড়াতে পারবে না দেশের সর্বোচ্চ আদালত। লঞ্চ ও নৌ দুর্ঘটনার ১৮টি মামলা এখনো নৌ আদালতে চলমান কিন্তু এর সুরাহা মিলবে কি না তা নিয়ে সন্দিহান থাকতেই হয়।

সব মিলিয়ে জনগণ চায় নৌপথের নিরাপদ যাত্রা। এক্ষেত্রে দরকার সচেতনতা। সচেতনতাসমূহের মধ্যে রয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস পেলে কোনোভাবে নৌচলাচল চালু রাখা যাবে না। অতিরিক্ত যাত্রী কিংবা মালামাল না নেয়া। অদক্ষ চালক, লাইসেন্সবিহীন নৌযান বয়কট ও জরিমানা করতে হবে।

পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেটের সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে হবে এবং নৌ আদালতের প্রণয়নকৃত আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করতে হবে। অনেক সময় দুর্ঘটনার মূল নৌযানের মালিক প্রভাবশালী হলে সেই মামলা থেমে যায় কিন্তু নৌপথে সুরক্ষা পেতে চাইলে এসকল মামলার বিচার করা জরুরি। তাছাড়া নৌপথে দুর্ঘটনা এড়াতে যাত্রীসহ সরকারি, বেসরকারিভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এসব বাস্তবায়ন হলেই ধীরে ধীরে বিলীন হবে নৌ দুর্ঘটনা। নৌযাত্রা হবে শান্তিপূর্ণ।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ।



poisha bazar

ads
ads