মূল্য বৃদ্ধিতে নাজেহাল জনজীবন


poisha bazar

  • ইসরাত জাহান চৈতী
  • ০৩ মে ২০২১, ১৪:১৬

গৃহিণী আয়েশা বেগম ও বেসরকারি চাকরিজীবী শফিক সাহেবের তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার। বসবাস করেন রাজধানীর একটি এলাকায়। স্বাভাবিক সময়েই একমাত্র শফিক সাহেবের উপার্জনে সংসার চালাতে খেতে হয় হিমশিম। এর মাঝে এক বছরের বেশি সময় ধরে চলছে করোনার তাণ্ডব।

স্বাভাবিক জীবন যেন থমকে আছে। আগের তুলনায় বেশ কমেছে আয়। কম আয়ে চাহিদার লাগাম টেনে কোনো ভাবে চলছিল জীবন। কিন্তু মাঝ পথে বিপত্তি বাধিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতা। পানি থেকে শুরু করে জীবন ধারণের সকল কিছুই ক্রয় করতে হয় ঢাকা শহরে বসবাসরত শফিক সাহেবকে।

এর মাঝে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল পণ্যের দাম বৃদ্ধি সহায়হীন করে তুলেছে শফিক সাহেবের মতো সমাজে স্বল্প আয়ের লোকদের। এর ফলে তিন বেলা ঠিকমতো খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটাই যেন কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানদের পড়ালেখার যথাযথ পরিবেশ তৈরি করে দেয়া হয়েছে সাধ্যের বাইরে স্বপ্নের মতো।

বর্তমানে অতিমারীর সময়ে করোনার এই চিত্র আমাদের দেশের প্রতিটি নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজে বিরাজমান। করোনার কারণে এমনিতেই কমেছে সাধারণ মানুষের আয়। করোনা তাণ্ডবে চাকরি হারিয়েছে বহু বেসরকারি চাকরিজীবী। অনেকের বেতন হয়েছে অর্ধেক। করোনার প্রভাবে একই সঙ্গে বেড়েছে খরচের খাতও।

এমন পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যে দিচ্ছে বিভিন্ন ছাড়, অনেক ক্ষেত্রে বিনা-মূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় সামগ্রী। আমাদের দেশে বিরাজমান এর উল্টো চিত্র। অর্থাৎ, অতিমারী এই পরিস্থিতিতে হুহু করে জীবন ধারণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য।

বর্তমানে বাজারে চাল, তেল, নুন থেকে শুরু করে সকল পণ্যের দাম বেড়ে কয়েকগুণ। বাজারে বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা লিটারে, বোতলজাত তেলের দাম পড়ছে ১৫০ টাকা। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম রাখা হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৭ থেকে ১০ টাকা।

এছাড়া, পেঁয়াজ-রসুন, মাছ, চিনি, ডালসহ সকল পণ্যের দাম বেড়েছে পূর্বের চেয়ে বেশ, যা প্রতি সপ্তাহে বাড়ছে অল্প অল্প করে। সপ্তাহে এই স্বল্প বৃদ্ধিই সমাজের কম রোজগারের মানুষদের জীবনে বয়ে এনেছে সীমাহীন দুর্ভোগ। শুধু মাত্র কাঁচা সবজি রয়েছে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার নাগালে। ক্ষেত্র বিশেষে তাও চলে যায় ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।

বিশেষ করে রমজান শুরু হওয়ার পর থেকে। ন্যূনতম জীবন ধারণ সামগ্রীর এই দাম বৃদ্ধি সমাজের উচ্চ আায়ের লোকজনের জীবনে কোন প্রভাব না ফেললেও কম আয়ের লোকদের খাদ্য তালিকায় থাকা সকল পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে তৈরি হয়েছে জটিলতা। খেয়ে পরে সাধারণভাবে জীবন ধারণ দিনকে দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে।

এর মাঝে শুরু হয়েছে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস রমজান। আর এ মাসে সকল শ্রেণি পেশার লোকজনের জীবন ধারণে আসে কিছু পরিবর্তন। মানুষের খাদ্যাভ্যাসে এর প্রভাব পড়ে সরাসরি। অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে ছোলা, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, তেল, খেজুর, মুড়ি, লেবুসহ কিছু পণ্য হয়ে ওঠে চাহিদার শীর্ষে। প্রতিবছর দেখা যায়, অসাধু ব্যবসায়ীরা বছরের এই সময়ে এসে প্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম পূর্বের তুলনায় কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। এবছর এমনিতেই সকল পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে দিশেহারা সাধারণ। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও রমজানে এসব পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে নাজেহাল সাধারণ মানুষ।

করোনার প্রকোপ আবারও ভয়াবহ হওয়ায় গত সপ্তাহ থেকে দেশে চলছে লকডাউন। চলমান এক সপ্তাহের লকডাউন বাড়িয়ে আরো এক সপ্তাহ করা হয়েছে। এমনিতেই করোনা ও রমজানের কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, তারপর লকডাউন বিপাকে ফেলেছে সমাজের স্বল্প আয় ও মধ্য আয়ের মানুষের জীবনে। সমাজের খেটে খাওয়া, দিন এনে দিনে খাওয়া মানুষগুলোর জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।

লকডাউনে ব্যক্তিগত যানবাহন ছাড়া প্রায় সকল পরিবহন বন্ধ রয়েছে। এতে পরিবহন খাতে নিয়োজিত শ্রমিকরা কাটাচ্ছে মানবেতর জীবন। লোকজনের বাইরে তেমন আনাগোনা না থাকায় রিক্সা, ভ্যান, অটো চালকদের আয়ও কমেছে পূর্বের তুলনায়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কম খেয়ে বা না খেয়ে দিনযাপন করতে হচ্ছে আমাদের সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষদের।

করোনার ভয়াবহতা কমাতে লকডাউন কার্যকর হলেও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে তা মোটেও সুখকর কিছু নয়। এভাবে চলতে থাকলে করোনাতে নয়, বরং ক্ষুধার জ্বালায় মরতে হবে সমাজের খেটে খাওয়া শ্রেণির। এক্ষেত্রে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে সমাজের উচ্চবিত্ত বা স্বাবলম্বী শ্রেণি। সরকারিভাবে বিশাল এ শ্রেণির কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া বিভিন্ন কারণেই সম্ভব নয়।

তাই ব্যক্তি পর্যায়ে সহায়তার হাত বাড়ালে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব এই অতিমারীর সময়ে। চারপাশে বসবাস করা মানুষের ওপর রাখতে হবে খেয়াল। সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়ালে ন্যূনতম খেয়ে পরে বাঁচতে পারবে সমাজের সকলে। আর অস্বাভাবিক হারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধে প্রয়োজন কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ি কিছু পদক্ষেপের।

যদিও ট্রেডিং কর্পোরেশন বাংলাদেশ (টিসিবি) স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করছে তেল, চিনি, পেঁয়াজ, ছোলা, ডাল ইত্যাদি পণ্য। এবং সকল পণ্যের দাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। তবুও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সেসবে তোয়াক্কা না করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে উচ্চদামে বিক্রি করছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসমূহ।

বাজারের এই অস্থিরতা কমিয়ে আনতে পারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ। তাই সঠিক মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাজারে বিরাজ করবে স্থিতিশীলতা এবং স্বস্তি ফিরে আসবে সাধারণ মানুষের জীবনে এমনটাই কাম্য, একই সঙ্গে সময়ের দাবি।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।






ads
ads