শিক্ষক নিয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন


  • মো. মাসুদ রানা
  • ০৩ মে ২০২১, ১৪:০০

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর শিক্ষকরা হচ্ছেন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কারিগর। দেশের মেধাবী সন্তানরা শিক্ষকতা নামক মহান পেশায় নিয়োজিত থাকেন বলেই উন্নত ও দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি হয় যারা দেশ ও জাতির সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনায় নিয়োজিত থাকেন। মেধাবীরা এই মহান পেশায় আকৃষ্ট না হলে জাতি মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।

উচ্চ শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা ও শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান, মর্যাদা ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অতিসম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশন একটি ভার্চুয়াল সভায় পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত তথাকথিত ‘অভিন্ন নির্দেশিকা’ পাস করানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষক সমাজের সাথে আলোচনা, পর্যালোচনা ব্যতীত এহেন জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ সত্যি বিস্ময়কর। উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মানোন্নয়ন বেশ কিছু বিষয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত যেমন- শিক্ষার্থীদের মান, পাঠ্যক্রম-পাঠ্যসূচি, ক্লাসরুম ও ল্যাব সুবিধা, ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক- শিক্ষার্থীর অনুপাত, শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা, গ্রন্থাগার, ইন্টারনেট ও অন্যান্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা এবং শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ।

উল্লেখিত সুযোগ-সুবিধাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে একই রকম থাকে না। দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণার মান এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান কখনোই এক রকম হবে না। উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

শুধুমাত্র অভিন্ন নির্দেশিকা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং উচ্চ শিক্ষার সাথে জড়িত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝে শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত বৈষম্য দূরীকরণ সম্ভব।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি যে, দেশের সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দকে যোগ্য মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শিক্ষক সমাজের সঙ্গে এ বঞ্চনা নিশ্চিতভাবে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে যা জাতিকে করবে পশ্চাৎপদ।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করা হচ্ছে এবং শিক্ষকদের পদোন্নতি ক্রমান্বয়ে কঠোর থেকে কঠোরতর করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় ২০১৫ সালে ৮ম বেতন স্কেল প্রণয়নের সময় শিক্ষকদেরকে ৩ ধাপ অবনমিত করা হয়।

সম পর্যায়ের অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধায় বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান যেমন- দীর্ঘদিন চাকরি করার সময়ে শিক্ষকবৃন্দ অফিসে বা বাসায় একটি ল্যান্ডফোন সংযোগ পান না, ব্যক্তিগত যানবাহন সুবিধা ও ইন্টারনেট ভাতা, টেলিফোন বিল ভাতার সুবিধা পান না।

পদোন্নতির জন্য উচ্চতর ডিগ্রি অত্যাবশ্যক হলেও একজন শিক্ষক সরকারিভাবে উচ্চতর ডিগি অর্জনে কোন আর্থিক বা অন্যান্য সহযোগিতা পান না। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ আসলে তা কেবল মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে বণ্টন করা হয়। শিক্ষকরা সম্পূর্ণ নিজ চেষ্টায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে থাকেন। এছাড়াও গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টির নিমিত্তে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর তেমন কোন উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে না।

আমরা সবাই জানি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় একটি সুনির্দিষ্ট অধ্যাদেশ ও আইনের ধারায়। ঠিক তেমনিভাবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যলায়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নয়নের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। উদাহরণসমূহ বলা যেতে পারে দেশের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচনসহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে এ কথা অনস্বীকার্য। কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণের উৎকর্ষতার কারণেই দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার পুরোধা এই বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক জরিপে সমাদৃত হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৭% এর মধ্যে থাকা শিক্ষার্থীরাই কেবল আবেদন করার যোগ্যতা রাখে। অথচ প্রস্তাাবিত অভিন্ন নির্দেশিকায় শিক্ষক হিসেবে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা ৩.৫ নির্ধারণ করা হয়েছে যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষা ও গবেষণায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে দেশের নবীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বিভিন্ন সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে যার সর্বশেষ উদাহরণ তথাকথিত অভিন্ন নির্দেশিকা বাস্তবায়ন যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা ও স্বায়ত্তশাসন পরিপন্থি। বর্তমান করোনাকালীন মহামারীতে সমগ্র বিশ্ব এক সংকটময় সময় অতিক্রম করছে।

এই কঠিন সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে, ঠিক সেই মুহূর্তে অভিন্ন নির্দেশিকা প্রণয়নের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে একটি মহল। প্রস্তাবিত নির্দেশিকা বাস্তবায়ন হলে দেশের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে।

দেশের মেধাবী সন্তানরা দেশ ছেড়ে উন্নত বিশ্বে পাড়ি জমাবে। বরং উচ্চ শিক্ষার গুণোগত মানোন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে, শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল পদান করতে হবে, উচ্চ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, অর্ডার অব প্রেসিডেন্স অনুসরণের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণ এবং অফিসিয়াল পাসপোর্ট প্রদান।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সম্মানিত শিক্ষক সম্প্রদায় করোনাকালীন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও দেশের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন যা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। তাই পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার কর্তৃক সময়োপযোগী ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন হবে এবং প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণায় সেন্টার অব এক্সিলেন্সে পরিণত হবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।


poisha bazar

ads
ads