স্থূল যৌনতার শহরে রক্ষিতা সাংঘাতিকতা


  • মুনজের আহমদ চৌধুরী
  • ০৩ মে ২০২১, ১১:০২

মূল্যবোধ বিবেক সব হয়ে গেছে বেঁচে থাকার খাবার পণ্য। গভীর আদরের জায়গাগুলো ঢাকা পড়ে গেছে স্থূল যৌনতায়। লাভ, ডার্লিং থেকে বেবি। প্রেমিকা শুধুমাত্র যৌনতার খেলনা বা টয় হয়ে যাচ্ছে। আবার চেতনে বা অবচেতনে প্রেমিকাকে স্বল্প বয়সের দামে মাপবার অনুসঙ্গ থাকছে। প্রেমিকা খেলনা হওয়ার মধ্য দিয়ে বন্ধনগুলো খেলো হচ্ছে, সম্পর্কগুলো পবিত্রতা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ হারাচ্ছে। আমরা এখন কেবল সস্তার মধ্যে সুন্দরের উজ্জ্বলতা উপভোগ করতে উদগ্রীব।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার এক লেখায় লিখেছিলেন, কবিতার মজুরিতে কবি বাঁচে না। এখনো এখানকার শিল্পস্রষ্টাদের অনেককে শিল্পের মজুরি বাঁচাতে পারে না। বাঁচবার মজুরির জন্য তাকে অন্যত্র জীবিকা খুঁজতে হয়। এখানেই শিল্পবোধ সম্পন্ন অন্য পেশায় জীবিকা খুঁজতে যাওয়া জীবনের মূল ব্যর্থতা। আমার ব্যর্থতাও একই জায়গায়। ব্যর্থতা থেকে যায় সামাজিক অসঙ্গতির বেদনাবহ দৃশ্যপট একের পর এক দেখতে থাকায়।

সহজ চলা আর বলার দিন গেছে বাড়ি, এখন আমরা কেবল মিথ্যার সাথে স্বার্থের কুযুক্তি মিশিয়ে কাটা-কাটি খেলি। নামাজের জন্য এসি-ওয়ালা মসজিদ, বাচ্চার লেখাপড়ার জন্য ফাইভ স্টার হোটেলের সুবিধাসম্পন্ন ক্লাসরুম দরকার এখনকার মধ্যবিত্তের। সন্তানকে রিসোর্টসম স্কুলে পাঠিয়ে শ্রেণিকক্ষে পড়ার চেয়েও স্ট্যাটাস আর সোসাইটির ক্লাস সেন্সের শিক্ষা দিতে চায় এ সময়ের আধুনিক মানুষরা।

সংকটের শুরু এখানেই। অদ্ভুত সব বৈপরীত্য আমরা ধারণ করি অবলীলায়। আবার সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্মিক গভীরতার জায়গার খাদগুলোতে ঢুকে যাচ্ছে স্বার্থপরতা। অথচ যেখানে থাকবার কথা নিটোল মমতার দায় আর প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা। সম্পর্কগুলোর ভেতরের রসায়ন যাই থাক, কেমিস্ট্রির ঝরে পড়বার বাহুল্য ঝরানোর সর্বাত্মক চেষ্টা থাকছে স্যোশাল মিডিয়ায়, ফেসবুকের ছবির গল্পে।

প্রেমকে করপোরেট করে তোলবার চেষ্টা চলছে, নাকি হচ্ছে- সে বিতর্ক লেখার গন্তব্য নয় কোনোভাবেই। বাস্তবের সম্পর্কগুলো আকাশচারী নয়, সম্পর্কগুলো ফুটপাতে হাত ধরে হাঁটবার ছন্দে বসবাস করে। সম্পর্কের চাষ করা আর সম্পর্কে বাস করার মাঝখানে দূরত্ব নিরন্তর।
সাফল্যের বৃত্তে নিজেকে আটকে রাখা, আসলে খুব কঠিন কাজ। একজন লেখককে সবচেয়ে বেশি সচেতন থাকা সমীচীন আমি মনে করি, তার পাঠকের মূল্যবান সময় যাতে অপচয় না হয় তার লেখাটি পড়ে, সেই ব্যাপারে।

দুই. পেশাদার একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি পাঠকের কাছে, আমার নিজের কাছে দায়বদ্ধ। সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে ঢাকা শহরে এবং বাইরে দেশজুড়ে অপেশাদার সুবিধাজীবী, ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী একটি দালাল শ্রেণি গড়ে উঠেছে। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তারা আমলে আমলে শুধুমাত্র সরকারগুলোকে দোষ দিয়ে মালিকপক্ষের শতভাগ স্বার্থরক্ষার অনুগত চাকরের কাজটি করছেন সাংবাদিকতার নামে।

কিছুমাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া হাউসগুলোর উপরের দিকে শুধুমাত্র পুঁজির মোসাহেবরা সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে মালিকের মুহুরির ভ‚মিকায় পরিণত করার চেষ্টা করছেন। এর বিনিময়ে এসব ধান্দাবাজরা দেশের নব্য কোটিপতি, এলিট ক্লাসের, ক্লাবের সদস্য হয়েছেন।

ঢাকা শহরে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি, অদূরে বাগানবাড়ি, প্রাডো হ্যা রিয়ার গাড়ি, বিদেশে সেকেন্ড হোমের মালিক হয়েছেন। তাদের সন্তানরা বিদেশে পড়ে। নিজেরা এমপির, মহিলা এমপির নমিনেশনের ঠিকাদারি করেন। আর টকশোতে, বক্তৃতায় কলামের নামে ক্ষমতার বাণী বন্দনায় আদর্শ, নীতি নৈতিকতার বুলি কপচান, নসিহত দেন। অথচ তাদেরই পত্রিকায় মফস্বলের সংবাদকর্মীরা বেতন পান না। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য। এসব মালিকের দালালরা সাংবাদিকতার নামে সমাজে ছড়ান দালালি দলাদলি এবং গালাগালি।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরবর্তী সরকারগুলো তাদের ক্ষমতাকে নিরাপদ রাখার স্বার্থে সমাজের সব পেশাজীবীদের মধ্যে সুবিধার দামে একটি দালাল শ্রেণি সৃষ্টি করেছে। এই দালালরা সরকারের, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট চেটে পুটে খায়।

আমাদের আজকের সমাজে সব পেশাজীবী নেতৃত্বের একটি অংশ ব্যক্তিস্বার্থের কাছে মাথা বেচে সুবিধা বাগানোতে মত্ত। সবগুলো প্রতিষ্ঠান পচে গলে একাকার। সেখানে গণমাধ্যম তো আর কোনো বিচ্ছিন্ন স্বতন্ত্র দ্বীপ নয়। আমাদের সমাজ বাস্তবতায় শুধুমাত্র সাংবাদিকতা শতভাগ নীতি নৈতিকতা নিয়ে একে বারে ইথিক্সের স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, সে ভাবনা আসলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।

আমাদের রাজনীতিবিদদের প্রতি আমার হতাশা আছে। রাজনীতিজীবী দলান্ধ কীটদের প্রতি সু-তীব্র ঘৃণা আছে। শুধুমাত্র ক্ষমতায় পৌঁছবার বা নামাবার জন্য রাজনীতিকরা মানুষদের প্রতি ক্ষোভের কারণ, তারা রাজনীতিকে নিজেদের স্বার্থে, জনগণের সাথে জোচ্চুরি, প্রবঞ্চনার হাতিয়ারে পরিণত করেছেন।

রাজনীতি আমাদের সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন তথা পুরো প্রক্রিয়াকেই নিয়ন্ত্রণ করে। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনীতিবিদরা অপেক্ষাকৃত ভালো হবেন না, আমাদের সমাজে অর্থবহ ইতিবাচক পরিবর্তনের কোনো আশা জাগবে না। কেননা, সাংবাদিকতাও রাজনীতির বাইরের কোনো বিষয় নয়।

যখন রাজনীতি তার টিকে থাকবার স্বার্থে সমাজের সব পেশাজীবীদের ধ্বংস করে দিতে চায়, তখন শুধু সাংবাদিকতার পেশা একেবারে ন্যায়ের, সরকার বিরোধিতার স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, সে আশা করা নিতান্তই অর্থহীন। মুনিয়ার ঘটনা নিয়ে বিকল্প গণমাধ্যমের আবাসন কোম্পানি রূপায়ন গ্রুপের দেশ রুপান্তর, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের সময়ের আলোতে সাংবাদিকতার নামে চটি লেখার সমালোচনা চলছে।

দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের সাইটে লেখাটি এখনো রয়েছে। আমার সাবেক কর্মস্থল চ্যানেল আই তাদের খবরে ভিকটিমের ছবি প্রকাশ করে বসুন্ধরার এমডির ছবি আড়াল করেছে, তারপর ক্ষমা চেয়েছে। তারপরও ব্যতিক্রম আছে। দৈনিক মানবকণ্ঠ মুনিয়ার ঘটনার পর গত চার দিন দুটো লিডসহ প্রথম পাতায় কাভারেজ দিয়েছে।

দৈনিক মানবকণ্ঠ এ ঘটনায় দেশের শীর্ষ জাতীয় দৈনিকগুলোর মধ্যে একটি ইতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তবু এই একটি দুটি ব্যতিক্রম যাপিত বাস্তবতাকে অতিক্রম করতে পারে না। আমরা সংবাদকর্মীরা শুধুমাত্র ফেসবুকে আত্মসমালোচনা করে দায়িত্ব শেষ করতে পারি না। মুনিয়ার ঘটনা আমাদের সাংবাদিকতার নৈতিকতা, অসঙ্গতিগুলোকে সামনে এনে পাঠকের বিচারের কাঠগড়ায় আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

মা-বাবাহীন এতিম মৃত বোনটিকে যে চক্র রক্ষিতা আর বেশ্যা বানাতে চায়, আসলে সেই ক্ষুদ্র চক্রটিই বিকৃত বুদ্ধিবেশ্যা। মুনিয়ার ঘটনা এই দালালদের মুখোশ দেশবাসীর সামনে উন্মোচন করেছে। সাংবাদিকতাও যদি বেঁচে থাকার খাবার পণ্য বানিয়ে ফেলে ওরা, তাহলে সাধারণ মানুষের ভরসার কোনো জায়গা আর অবশিষ্ট থাকবে না।

তারুণ্যও, জীবনের জয়রথ আমরা কলমে কণ্ঠে গণমানুষের কথা বলবার যে গণমাধ্যমের স্বপ্ন বিনির্মাণের মিছিলে কাটিয়েছি, সে আশাবাদ বৃথা যেতে পারে না, কখনোই।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইউকে বাংলা প্রেসক্লাব।

 


poisha bazar

ads
ads