করোনা নিয়ে আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি


  • মু. সায়েম আহমাদ
  • ৩০ এপ্রিল ২০২১, ১৪:৩৬

করোনা ভাইরাস! যার নামটি শুনলেই সবার মনে আসে আতঙ্ক আর ভয়-ভীতি। করোনা নামক ভাইরাস পুরো বিশ্বকে অচল করে দিয়েছে। থমকে দিয়েছে সব কিছু। যার প্রভাব অর্থনৈতিক দিক থেকে শুরু করে সর্বস্তরে পড়েছে। পৃথিবীর আগের মতো নেই কোনো রূপ, নেই কোনো অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে সবার মনে একটি আতঙ্ক বিরাজ করছে। এই বুঝি আমি আক্রান্ত হয়ে গেলাম, এই বুঝি আমি মারা যাব। এই আতঙ্কের শঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলছে। তবুও মানুষের এই পরিস্থিতিতে একটাই চাওয়া, পৃথিবী আসুক আবার আগের রূপে। কিন্তু আসবেই বা কি করে? কারণ মানুষের মনে যেমন আতঙ্ক, ঠিক তেমনি নেই কোনো সচেতনতা। উদাসীনতার মনোভাব সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে সেখানে অনিয়মতান্ত্রিক চলাফেরা। মানুষ সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি কোনো নিয়ম মানছে না। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার লকডাউন ঘোষণা করেছে। যা এখনো চলমান। কিন্তু এই লকডাউন সংক্রমণ ঠেকাতে কতটুকু কার্যকর হবে সেটি নিয়েও প্রশ্ন। লকডাউন দিলেও তা পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন হয় না। আমাদের দেশে এ পদ্ধতি বা কৌশল সফল হওয়া অসম্ভব। সফল না হওয়ার পিছনে কিছু আর্থসামাজিক বাস্তবতা রয়েছে। এদেশের অধিকাংশ মানুষ নিম্নধ্যবিত্ত পরিবারের। এসব পরিবারের মানুষ গুলো দিন আনে দিন খায়। এছাড়াও করোনাকালীন সময়ে অনেকেই চাকরিচ্যুত বা কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এমন মানুষের সংখ্যায় বলতে গেলে প্রায় পাঁচ কোটির মত। এর মধ্যে লকডাউন দিলে এদের প্রায় সবাই জীবিকা উপার্জনের থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাই যেকোনো ভাবে পরিবারের ভরণ পোষণ করার জন্য অন্য পন্থায় লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। সে কারণে লকডাউন করে তাদের ঘরে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে।

করোনা সংক্রমণ মধ্য দিয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে আবার এই সংক্রমণের প্রকোপ বেড়ে চলছে। যা পুরো বিশ্ব জুড়ে সংক্রমিত করে যাচ্ছে। সম্প্রতি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সংক্রমণের প্রকোপ বেড়ে গিয়েছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই খারাপ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে, যা সত্যিই হƒদয়বিদারক দৃশ্য বা ঘটনা। ভারতের এমন সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী তারা নিজেরাই। তাদেরকে বহুবার সচেতন হওয়ার জন্য তাগিদ দিয়েছিল। কিন্তু তারা উদাসীনতা মনোভাব নিয়ে চলাফেরা করছে। কারণ তাদের মধ্যে স্বাভাবিক ভ্রান্ত ধারণার অনুভ‚তি ছিল। তাদের মধ্যে সচেতনতাবোধ ছিল না। আর সেটা সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তাদের সবার মাঝে ছিল। বিশ্বে করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রয়েছে ভারত। ভারতের পর রয়েছে ব্রাজিল। সংক্রমণের দিক দিয়ে সম্প্রতি ব্রাজিলকে টপকে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসে ভারত। করোনার সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করা ভারত তার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অক্সিজেন, ওষুধ, হাসপাতালে শয্যার সংকটসহ নানা সমস্যায় দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অক্সিজেনের অভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমেরিকার মতো রাষ্ট্র হিমশিম খেয়ে পড়ছে করোনা মোকাবিলা করতে। সেই তুলনায় আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেক পিছিয়ে। এ নিয়ে মানুষের মনে রয়েছে ভয় আর আতঙ্ক। আমাদের দেশেও প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা। পর্যাপ্ত অক্সিজেন নেই, নেই কোনো আইসিইউর ব্যবস্থা। আমাদের দেশে এমনো দৃশ্য দেখা গিয়েছে যে, অক্সিজেনের অভাবে হাসপাতালের সামনেই মারা যেতে হয়েছে। মোটকথা বলতে গেলে, ভারতের যে পরিস্থিতি সেটা যদি আমাদের দেশে হয় তাহলে আমাদের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আমাদের পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে? কখনো এসব বিষয়গুলো আমরা ভেবেছি?

আমাদের দেশে এখনো মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস নিয়ে উদাসীনতা। তাদের মাঝে নেই কোনো সচেতনতা। শহরাঞ্চলে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় মানুষের জনসমাগম। প্রয়োজনে হোক অপ্রয়োজনীয় হোক একে অপরের সাথে নির্ধিদায় চলাফেরা করছে অনবরত। মানছে না কোনো স্বাস্থ্যবিধি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষদের মাঝে সচেতনতা নেই বললেই চলে। গ্রাম্য হাট বাজারে গেলে বুঝা যায় তাদের কি পরিস্থিতি। মুখে মাস্কের ব্যবহার নেই, স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োগ নেই। শুধু কি এটাই? বরং বিভিন্ন শপিংমল থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ উদাসীনতা মনোভাব নিয়ে চলাফেরা করছে। যে যেভাবে পারছে সে সেভাবেই নিজের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি আবারও করোনা ভাইরাস নামক যে হিংস্রতা ছড়িয়ে যাচ্ছে পুরো বিশ্বে। সেদিকে তারা কোনো তোয়াক্কাই করছে না। অথচ এসব বিষয়গুলো দেখে আমাদের আরো বেশি সচেতন হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা না করে আমরা আরো বেশি উদাসীনতা হয়ে পড়েছি। অথচ পরিসংখ্যান বলে, গ্রাম অঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলে আক্রান্ত সংখ্যা বেশি। সে দিক বিবেচনা করে শহর অঞ্চলের মানুষ গুলোকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে।

সুতরাং, এসব বিষয়গুলো দেশের প্রত্যেকটা নাগরিককে ভাবতে হবে। সেইসাথে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। প্রয়োজনে বাহিরে গেলে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাফেরা করতে হবে। মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। আর সেটা যেন সর্বস্তরে বাধ্যতামূলক হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সজাগ দৃষ্টি থাকতে হবে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার বারবার ব্যবহার করতে হবে। যাতে করে ভাইরাস ধ্বংস হয়ে যায় নিমিষে। প্রত্যেক নাগরিককে স্বাস্থ্যের প্রতি যতœশীল হতে হবে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল-ফলাদিসহ ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। যার ফলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দেশের সরকার সময় থাকতে করোনা মোকাবিলায় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকার যে লকডাউন দিয়েছে তা যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে যারা দিনমজুরি বা নিম্নধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের সঠিক তালিকা করে ত্রাণ বিতরণ করতে হবে। যদিও লকডাউন বাস্তবায়ন করার জন্য সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। সেই বাজেট সুষ্ঠুভাবে যেন বণ্টন করা হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের মনে কোনো ধরনের ভয় আর আতঙ্ক থাকা যাবে না। বরং আত্মবিশ্বাসী বা মনোবল ঠিক রাখতে হবে। সেই সাথে অধিক সচেতন হতে হবে আমাদের। কারণ সচেতনতাই পারে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে। নয়ত দিন শেষে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির মতো শিকার হতে হবে আমাদেরও। কাজেই সময় থাকতে সচেতন হোন এবং দেশের মঙ্গল কামনা করুন।

লেখক: কলামিস্ট ও সংস্কৃতিকর্মী


poisha bazar

ads
ads