একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষাকন্যারা


poisha bazar

  • শাহীন চৌধুরী ডলি
  • ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩:২২,  আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩:৩১

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র সবাই উপলব্ধি করতে পারছিল। তত্সময়ে নারী-পুরুষ সবাই ভাষার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায় ও দ্বিতীয় পর্যায়ে  পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অসামান্য অবদান আছে।

কিন্তু এক্ষেত্রে নারীদের সংগ্রামের অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি মিলেছে কিনা বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখার জন্য ‘একুশে পদক’ প্রদান শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। একুশে পদক বাংলাদেশের জাতীয় এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার।

অত্যন্ত বিস্ময়াহত ব্যাপার যে, ২০০০ সাল পর্যন্ত কোনো নারীকে ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা রাখার জন্য পদক প্রদানে নির্বাচন করা হয়নি। পরবর্তীতে  দুজন ভাষাকন্যা আনোয়ারা বেগম ও প্রতিভা মুত্সুদ্দি একুশে পদক পেলেও উনাদের উভয়েই শিক্ষার জন্য একুশে পদক পান, তবে সেটা ভাষা আন্দোলনের জন্য নয়। মাতৃভাষার জন্য লড়াইয়ে সংগ্রামী ভূমিকার জন্য একুশে পদকপ্রাপ্ত পাঁচজন নারী ভাষাকন্যারা হলেন—

ড. সুফিয়া আহমেদ (২০০২ সাল): ড. সুফিয়া ইবরাহিম ১৯৩২ সালের ২০ নভেম্বর ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মুহম্মদ ইবরাহিম ছিলেন একজন বিচারপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং মাতা লুত্ফুন্নেসা ইবরাহিম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রথম সারির নেতৃত্বে তিনি ছিলেন অগ্রগামী সৈনিক। বিভিন্ন মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেছেন এবং অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে তিনি ছাত্রীদের নিয়ে রাজপথে নামেন এবং পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন।  আন্দোলন চালিয়ে নেয়ার প্রয়োজনে অর্থ সংগ্রহসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। ওই বছরের শেষের দিকে তুরস্ক সরকারের আমন্ত্রণে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে তুরস্ক ভ্রমণকালে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উর্দুর সাথে বাংলা গান পরিবেশনের দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় অন্যান্য বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে অনুষ্ঠান বর্জন করেন। ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ড. সুফিয়া আহমেদকে ২০০২ সালে একুশে পদকে ভূষিত করেন।

মমতাজ বেগম (২০১২ সাল): রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগ্রামী নারী ছিলেন মমতাজ বেগম। ১৯২৩ সালের ২০ মে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার শিবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম কল্যাণী রায় চৌধুরী। পিতা কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রায় বাহাদুর মহিম চন্দ্র রায় এবং মাতা মাখন মতি দেবী ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা।

১৯৪৭ এর দেশভাগের পর তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন। ভালোবেসে বিয়ে করেন আব্দুল মান্নাফকে। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর মমতাজ বেগম নাম গ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় নিজ স্কুলের ছাত্রীদেরসহ মহিলাদের নিয়ে প্রথম মিছিলে উপস্থিত হন? সরকার ও সমাজের সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি যুবলীগ নেতা শামসুজ্জোহা, সফি হোসেন খান এবং ডা. মুজিবুর রহমানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শহীদদের রক্ত শপথে নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঐক্য আন্দোলনে উজ্জীবিত করেন।

ভাষা আন্দোলনে নারীদের মিছিলে অন্যতম নেতৃত্ব দেন মমতাজ বেগম। পুলিশ তার নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করে ২৯ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেফতার করে হাইকোর্টে নিয়ে যায়। কোর্ট তার জামিন নামঞ্জুর করেন। সরকার কারাবদ্ধ মমতাজ বেগমকে শর্তের অধীনে বন্ড সইয়ের মাধ্যমে মুক্তি দিতে চাইলে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতে করে তাকে দীর্ঘদিন কারাভোগের যন্ত্রণা সইতে হয় এবং সরকারি চাকরিচ্যুত হন তিনি।

কারাগার থেকে বন্ডে সই করে মুক্তিলাভে অস্বীকৃতি জানানোয় মমতাজ বেগমের স্বামী তাকে তালাক দেন।  মাতৃভাষার জন্য যুদ্ধে শামিল হয়ে তিনি নিজের সাজানো সংসার হারান। ভাষা আন্দোলনের সুদীর্ঘ ৬০ বছর পর ২০১২ সালে আন্দোলনের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার মমতাজ বেগমকে একুশে পদকে ভূষিত করেন।

অধ্যাপক শরিফা খাতুন (২০১৭ সাল): শরিফা খাতুন ১৯৩৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোহাম্মদ আসলাম চাকরি করতেন আসামের রেলওয়েতে, মাতা জেবুন্নেসা চৌধুরানী। বাবার চাকরি সূত্রে ছোটবেলা কেটেছে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোয়ার্টারে। তিনি ১৯৪৭ সালে স্কুলের ছাত্রী থাকাকালীন সময়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মিছিলেও অংশ নিয়েছিলেন।

১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনার সময় তিনি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির দাবিতে মিছিল-স্লোগানে অংশ নেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় মিটিং হয়। ইডেন কলেজের জিএস রওশন আরার নেতৃত্বে শরিফা খাতুনসহ অন্য ছাত্রীরা মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন। তারা আন্দোলনের সপক্ষে পোস্টার, ব্যাজ তৈরি করেন। তাদের কাজ ছিল বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে আন্দোলনের পক্ষে সচেতনতা তৈরি করা।

২০ ফেব্রুয়ারি ঘোড়ার গাড়িতে করে মাইকিং করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি হলে তিনিসহ ইডেন কলেজের আরো কয়েক ছাত্রী কালোব্যাজ ধারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জড়ো হন। ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শরিফা খাতুনসহ মেয়েরা মিছিলের সামনের সারিতে থেকে অগ্রসর হলে শুরু হয় ঢিল ছোড়াছুড়ি, পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ছোড়া।

এরপর পুলিশ গুলি ছুড়তে থাকলে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ঢাকা মেডিক্যালে আহতদের তখন ভয়াবহ অবস্থা। কেউ রক্তাক্ত, কেউ তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের সাথে শরিফা খাতুন আহতদের সেবায় যোগ দেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। রাতেই মেয়েরা খালি পায়ে, সাদা শাড়ি পরে ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান। ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার ২০১৭ সালে অধ্যাপক শরিফা খাতুনকে একুশে পদকে ভূষিত করেন।

অধ্যাপক হালিমা খাতুন (২০১৯ সাল) : ভাষাসৈনিক হালিমা খাতুন ১৯৩৩ সালের ২৫ আগস্ট বাগেরহাট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা আবদুর রহমান ও মাতা দৌলতুন্নেসা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করেন। ১৯৬৮ সালে নর্দার্ন কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন।

শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক হিসেবে ১৯৯৭ সালে অবসর নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে তার দায়িত্ব ছিল পিকেটিং করা। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চত্বরের আমতলায় সমাবেশে তিনি ছাত্রীদের জড়ো করার ভূমিকা পালন করেন।

মুসলিম গার্লস স্কুল ও বাংলা বাজার গার্লস স্কুলের ছাত্রীদের আমতলায় নিয়ে এসেছিলেন তিনি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৪৪ ধারা ভেঙে প্রথম বের হয় মেয়েদের দল। জুলেখা, নূরী, সীতারার সঙ্গে একই সারিতে ছিলেন হালিমা খাতুন। ভাষাসৈনিকদের সেই মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। ছাত্ররা সেই মিছিলে হতাহতদের ছবি তুলে লুকিয়ে  রেখেছিলেন। পরে সে ছবিটা বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে নিয়ে গিয়েছিলেন হালিমা খাতুন।

ভাষা সংগ্রামে আহত ছাত্র-জনতার চিকিৎসার জন্য এবং আন্দোলন সুসংগঠিত করতে  তিনি হলের মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে চাঁদা তুলেছেন। লিফলেট বিলি, পোস্টার লেখা, মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করায় ব্যস্ত থাকতেন। মাতৃভাষার প্রতি অসীম ভালোবাসা থেকে ভাষা আন্দোলনে তার প্রশংসনীয় ভূমিকার জন্য তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করেন বাংলাদেশ সরকার। 

মনোয়ারা ইসলাম  (২০১৯ সাল): ভাষাকন্যা মনোয়ারা ইসলাম ১৯৩৬ সালে খুলনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি ছিলেন ইডেন কলেজের ছাত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ও এমএড ডিগ্রি অর্জন করেছেন। মনোয়ারা ইসলাম শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নারী ভাষাসৈনিকেরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে দেয়ার মাধ্যমে ‘১৪৪ ধারা’ আইন ভাঙেন। এতে যুক্ত ছিলেন-সুফিয়া আহমেদ, সুফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, সুফিয়া ইব্রাহিম, সুরাইয়া হাকিম, মনোয়ারাসহ অনেকে। তিনি বাংলাভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

ভাষা আন্দোলন এগিয়ে নিতে চাঁদা তুলে আন্দোলনের খরচ বহনে দায়িত্ব পালন করাসহ বিভিন্নভাবে ভাষা আন্দোলনের একজন অগ্রণী সৈনিক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে মনোয়ারা ইসলামের অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নারী-পুরুষ সকলের সামগ্রিক অংশগ্রহণের ফলেই সফলতা অর্জিত হয়েছে। পুরুষ বা নারী এককভাবে এ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে হয়তো সফলতা আসত না। নারীদের জোরালো ভূমিকা আন্দোলনকে বেগবান করেছে। ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখা নারীদের মধ্যে উল্লিখিত মাত্র পাঁচজন নারী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি একুশে পদকপ্রাপ্ত হয়েছেন।

ভাষা আন্দোলনে জড়িত কেউই আন্তর্জাতিক কোনো স্বীকৃতি পাননি। ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত সকল ভাষাসৈনিকের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হোক। নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরার ব্যবস্থা নেয়া হোক। 

লেখক: প্রাবন্ধিক






ads
ads