ভালোবাসা জানানোর দিন


poisha bazar

  • আফতাব চৌধুরী
  • ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:২১

ভ্যালেন্টাইন্স ডে ‘মানেই গোলাপি আর লাল গোলাপের ছড়াছড়ি। যারা বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের দিকে পা বাড়াতে চাইছেন তাদের জন্য হলুদ গোলাপই ভরসা। ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটায় যখন চারদিকে প্রেম প্রেম ভাব তখন অনেকের মনেই চেপে বসে বিষণ্নতা। এই অবসাদ এতটাই গভীরে চলে যায় যে মানুষ নিজের জীবন দিতেও পিছপা হন না। এটা কোনো গল্পকথা নয়।

আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রেমের দিনে নাকি বহু মানুষ আত্মহত্যার কথা ভেবে থাকেন। চারদিকে প্রেমের বাতাবরণে যে সব মানুষ একাকী জীবন কাটাচ্ছেন তারাই বেছে নিতে চান এই পথ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মনে রাখা উচিত ৩৬৫ দিনের মতো ১৪ ফেব্রুয়ারিও একটা দিন-ই। এই দিনটাতেও আমরা প্রতিদিনের মতো খাই, ঘুমাই, কাজ করি। তাহলে এটা অন্যান্য দিন থেকে আলাদা হলো কীভাবে ? আমরাই এই দিনটাকে একটা বিশেষ দিনে রূপান্তরিত করেছি। যাই হোক, এবার একটু প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে ভ্যালেন্টাইন্স ডের প্রচলন, কিভাবে হলো সে-দিকে আলোকপাত করা যাক।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায় গ্রিস ও রোমে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। সেই সব কাহিনির মধ্যে রোমের প্রেম ও ভালোবাসার মূর্তপ্রতীক হিসেবে আছেন ঋষি ভ্যালেন্টাইন। সম্রাট ক্লাউডিয়াস দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে রোমের বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজমান ছিল। সেই বিশৃঙ্খল অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য সম্রাট গড়তে চাইলেন সৈন্যবাহিনী।

অনেক চেষ্টা করেও প্রজাদের সেনাবাহিনীতে প্রবেশ ঘটাতে পারলেন না। কেন প্রজারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে যায় না তার কারণ অনুসন্ধান করে সম্রাট বুঝতে পারলেন স্ত্রী ও পরিবার ছেড়ে তারা আসতে রাজি নয়। দাম্পত্য জীবনের সুখে আচ্ছন্ন প্রজাদের সেনাবাহিনীতে নিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন বিবাহ প্রথাকে বিনষ্ট করা। এই ভেবে সম্রাট ক্লাউডিয়াস সব ধরনের বিবাহবন্ধন বাতিল বলে ঘোষণা করলেন।

প্রজাদের মাথায় যেন বাজ পড়ল। জীবনের সব ধরনের সুখ এবং বিবাহবন্ধনের মত এক মধুরতম জীবনযাত্রাকে সম্রাট বাতিল করে দেয়াতে রোমের হৃদয়বান পুরোহিত ভ্যালেন্টাইন ক্লাউডিয়াস দ্বিতীয়ের অযৌক্তিক আদেশের বিরোধিতা করলেন। শুধু ভ্যালেন্টাইন নন, শিষ্যা মরিয়াসও। সম্রাটের কাছে ভ্যালেন্টাইন ও মরিয়াসের বিরোধিতার কথা পৌঁছার পরই ক্লাউডিয়াস দ্বিতীয় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন।

সম্রাটের আদেশে তাকে বন্দি করে নিয়ে আসা হয়। নির্মমভাবে প্রহারের পর ভ্যালেন্টাইন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সেই সময়টা ছিল ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি এডি। অবশ্য মৃত্যুর পর তাকে ‘সাধু’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অন্য আরেকটি মতানুসারে, সম্রাট ক্লাউডিয়াস দ্বিতীয় যখন দেখলেন কোনো প্রজাই দাম্পত্য জীবন ত্যাগ করে সেনাবাহিনীতে আসতে চাইছে না, তখন তিনি প্রজাদের জোর করে রোমান কারাগারে বন্দি করলেন।

হাহাকার উঠল প্রজাদের ঘরে ঘরে। চারদিকে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার ক্রন্দন রোল উঠায় এগিয়ে এলেন সাধু ভ্যালেন্টাইন। প্রেম-ভালোবাসার এ অপমৃত্যু দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন খ্রিস্টানদের রোমান কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন। করলেনও তাই। সেই অপরাধে সম্রাট ভ্যালেন্টাইনকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন।

এই মতের সঙ্গে আরেকটি মত যুক্ত করে বলা আছে, ভ্যালেন্টাইন ওই কারাগারে নাকি এক রূপসী কন্যাকে দেখতে পান। মনে মনে তাকে ভালোবেসে ফেলেন। তিনি জানতেন না ওই রূপসী কন্যাটি কারাগার রক্ষকের। ভালোবাসা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে প্রচণ্ড প্রহারে মৃত্যু কাছাকাছি জেনেও ওই কন্যাটিকে একটি পত্র লিখে তার প্রেম ও ভালোবাসার কথা জানান। তার ওই দুর্দান্ত প্রেম-ভালোবাসার সাহস দেখে বিস্মিত হয় রোমের মানুষ।

প্রচারিত হয় দিকে দিকে। দেখা গেছে, মধ্যযুগে ভ্যালেন্টাইনকে সাহসী এবং রোমান্টিক চরিত্র হিসেবে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে মানা হয়। ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বজুড়ে তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে পালন করা হয়। প্রথমে ওই দিনে ভ্যালেন্টাইন নোট হিসেবে পত্র প্রেমিক-প্রেমিকারা পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান করত।

কিন্তু ১৯ শতকে সেই হাতে লেখা নোট পরিবর্তিত হয়ে সংবর্ধনার স্থান দখল করে। ক্রমে ক্রমে ভ্যালেন্টাইন্স ডে ভালোবাসার দিবসে পরিণত হয়। শুধু রোমান্টিক দিবস হিসেবেই ওই দিন আর থাকেনি, বর্তমানে শিক্ষক-মা-বাবা-ভাই-বোন সবাইকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করা হয় ১৪ ফেব্রæয়ারি এই ভ্যালেন্টাইন্স দিবসে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বেশ উদ্দীপনার সঙ্গে এই দিনটি পালন করা হয়।

প্রিয়জনদের ফুল ও উপহার দিয়ে ঋষি ভ্যালেন্টাইন্স ডেকে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানানোর দিনটিই ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে আজ পরিচিত। অন্য একটি কাহিনি হলো, তিন হাজার বছরের পুরনো শিশু যার নাম ছিল ‘কুপিড’ তার শাখা ছিল এবং ভালোবাসার ধনুক ছিল। সেই ধনুক দিয়ে সে আঘাত করত লোককে। তাকে ঘিরেই রোম সাম্রাজ্যের জাতীয় উৎসব রূপ পায় ওই ১৪ ফেব্রুয়ারি।

ওই দিন নাকি পাখিরাও পরস্পর মিলিত হয়। সেই সমস্ত বিশ্বাসের ফলস্বরূপ এবং নিজস্ব ভালোবাসাকে উজ্জ্বল এবং অনন্য করার জন্য ওই দিনটি রোমানরা পালন করে। আবার রোমানরা নাকি দেব-দেবতাদের রানীকে স্মরণ করে ১৪ ফেব্রæয়ারি। অনেকে আবার জলুকে মহিলাদের দেবী, বিবাহের দেবী বলেও স্মরণ করে।

একটি মজার ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়, রোমানরা পরের দিন অর্থাৎ ১৫ ফেব্রæয়ারিকে ‘ফার্টিল’ দিবস হিসেবে পালন করত। ওই দিনে রোমানরা তাদের কৃষিদেবতা লুপারকাস এবং ফোউনাসকে শ্রদ্ধা জানাতে উৎসব করত। মজার ব্যাপার হলো, ১৫ ফেব্রুয়ারির উৎসবে এক বিশেষ ধরনের পোশাক পরতে হতো রোমানদের।

প্রত্যেক যুবক- যুবতী সেই বিশেষ ধরনের পোশাক পরে একত্রে মিলিত হতো। রোমান মেয়েদের নাম লিখে একটি পাত্রে (জার) রাখা হতো। প্রত্যেক যুবক সেই পাত্রে ফেলা কাগজ তুলে নিয়ে কাগজে যে-মেয়ের নাম লেখা থাকত সেই মেয়েকে নিয়ে উৎসবে শামিল হতো। রোম সাম্রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাসে দাম্পত্য জীবনের উপর সম্রাটের আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় যে ভয়াবহতা এবং প্রেম-ভালোবাসার জাগরণ প্রত্যক্ষ করা গেল তা নিশ্চয় মনুষ্য ধর্মকে এক উচ্চাসন দিয়েছে।

ঋষি ভ্যালেন্টাইন বিদ্রোহ না-করলে রোম সাম্রাজ্যের ইতিহাস হয়তো কলঙ্কিত হতো। পরিবার-পরিজন রক্ষা রাজ্য রক্ষারই এক নামান্তর। মানুষের জীবনে যদি প্রেম-ভালোবাসা না-থাকে মানুষ কখনো উন্নত মানুষের স্তরে পৌঁছতে পারে না। সে-দিকে দৃষ্টি দিয়েই ভ্যালেন্টাইন প্রেম-ভালোবাসার জয়গাঁথা গেয়েছেন। ভ্যালেনটাইনের অন্তরে যে এক আধ্যাত্মিক ভালোবাসা ছিল তা প্রত্যক্ষ করা গেল কারাগারে থাকা অবস্থায় মৃত্যু শিয়রে জেনেও জেলারের মেয়েকে ভালোবাসা অর্পণের মাধ্যমে।

এর পরিমাণ যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা জেনেও পত্রের মাধ্যমে ভ্যালেন্টাইন প্রেম নিবেদন করেছেন। এই প্রসঙ্গে আমাদের দেশের চন্ডীদাস-রজকিনীর প্রেমও ছিল আধ্যাত্মিক ভালোবাসার ওপর প্রতিষ্ঠিত। চন্ডীদাসের মৃত্যুও ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুর মতো ঘটেছিল। নিচ বর্ণের মেয়েকে চন্ডীদাস গ্রহণ করায় সমাজ তাকে গ্রামছাড়া করে। কোনো ভ্রুক্ষেপ না-করেই চন্ডীদাস রানীকে নিয়ে গ্রাম থেকে বেরিয়ে যান।

ঘুরতে ঘুরতে এক নবাবের রাজ্যে আসেন। প্রতিদিন প্রত্যুষে নবাবের রাজপ্রাসাদের সামনে দিয়ে সংগীত পরিবেশন করার সময় একদিন বেগম সাহেবার অনুরোধে নবাব তাকে আমন্ত্রণ জানান রাজদরবারে। সংগীত শুনে নবাব খুশি হন এবং তাকে রাজ্যে থাকার অুনরোধ করেন। সেই সঙ্গে প্রতিদিন রাজদরবারে এসে সংগীত শোনাতে বলেন।

চন্ডীদাসের অপূর্ব সংগীতে বেগম সাহেবা আত্মহারা হয়ে তাকে ভালোবেসে ফেলেন। ওই ভালোবাসা যখন চরম অবস্থায় পৌঁছে যায়, তখনই নবাবের নজরে আসে। ক্ষুব্ধ নবাব চন্ডীদাসকে রাজদরবারে প্রচণ্ড প্রহার করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু ওই শারীরিক নির্যাতন চন্ডীদাস সহ্য করতে না- পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বেগম সাহেবাও বাহ্যজ্ঞান হারান।

ভালোবাসার ঋষি ভ্যালেন্টাইনের ওপর শারীরিক আঘাত এবং মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয় চন্ডীদাসের ওপর অমানুষিক নির্যাতন এবং মৃত্যুকে। বাহ্যজ্ঞান হারালেও ভ্যালেন্টাইনের প্রেমিকার হাতে চিঠি পৌঁছার পর প্রেমিকার কি ঘটেছিল তা জানা যায়নি। জানা না-গেলেও ঋষি ভ্যালেন্টাইনকে পরবর্তীতে ‘ভালোবাসার প্রেমিক’ বলেই স্বীকার করা হয়েছিল।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট।






ads
ads