কিশোর অপরাধমুক্ত সমাজ চাই


poisha bazar

  • রূপম চক্রবর্তী
  • ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১২:৩১

কিশোর অপরাধ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আমাদের প্রজন্ম নিয়ে দিন দিন চিন্তায় পড়ে গেছি। তাই এই সমস্যা নিরসনে দরকার সামাজিক সচেতনতা। আমরা সবাই এক একটি পরিবারে বাস করি। পরিবার এবং আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সচেতন হতে হবে।

নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে কিশোরদের গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে। শিশু কিশোরদের জন্য কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা এবং তাদের সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত শোধনাগার সেন্টার থাকতে হবে। কিশোরদের সমাজের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। তাই এর জন্য সমাজ ও দেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রাখা চাই।

আগামী প্রজন্মের কিশোরদের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশ এবং কলুষমুক্ত ও সুস্থ সমাজ গঠনে এখন থেকেই এই বিষয়ে সকলকে বিশেষ করে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তৎপর এবং যথেষ্ট সজাগ থাকতে হবে। তাহলেই গ্যাং কালচারের এই বিপথগামী তরুণদের অপরাধমুক্ত রাখা সম্ভবপর হবে এবং আগামী প্রজন্ম রক্ষা পাবে এক অসুস্থ সমাজ থেকে। আমাদের কিশোর সমাজ আগামী দিনের দেশ পরিচালক। তাদেরকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করার দায়িত্ব আমাদের।

নৈতিক শিক্ষার অভাবে অনেক পরিবারে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়ত পরিলক্ষিত করছি। আমরা সবাই পরিবারে বাস করি। মা বাবা, স্বামী স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে একটি পরিবার। পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আমাদের শিশু। এই পরিবার হচ্ছে একজন শিশুর জন্য আদর্শ শিক্ষা নিকেতন। শিশুদের নিয়েই আমরা সত্য বলার চেষ্টা করব। পারিবারিক শিক্ষা একজন শিশুর ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে।

একটি সমাজে যেমন ভালো মানুষ থাকে তেমন অনেক খারাপ মানুষও থাকে। ভালো আর খারাপ থেকে ভালো যা পাওয়া যায় তাই গ্রহণ করতে হয়। এই ভালো কিছু গ্রহণ করার মানসিকতা একজন শিশু তার পরিবার থেকে পেয়ে থাকে। একজন শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যতই শিখুক না কেন তার বাড়ির শিক্ষা ভালো না হলে চরিত্র সুন্দর হয় না।

এই শিশুগুলো আস্তে আস্তে বড় হয় এবং কিশোর বয়সে উপনীত হয়। পারিবারিক সুশিক্ষা না থাকলে এই সব কিশোর বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। পরিবারগুলোকে তার সন্তানদের সঠিক পথে রাখার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা, শিক্ষা অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি আমাদের রাজনৈতিক দলের নেতাদের একটা দায়িত্ব থাকতে হবে।

কিশোরদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করাকে অনুৎসাহিত করতে হবে। যারা নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন তাদেরকে অনুরোধ জানাব যারা কিশোরদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন তাদেরকে বুঝাবেন।

অনেক কিশোর অপরাধী এমনভাবে মগজ ধোলাই পায় যার জন্য তাদের কাছে অপরাধ করার পর কোনো অনুশোচনা থাকে না। এই ধরনের অপরাধী তার কৃতকর্মের জন্য এমন সব যুক্তি দাঁড় করায় যাতে তার কোনো অপরাধবোধ বা অনুশোচনা থাকে না। কোনো কোনো কিশোর অপরাধী এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে যেখানে দেখা যায় তারা সমাজে আইন মেনে চলা মানুষকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে যাতে এমন মনোভাব প্রকাশ পায় যে তারা প্রচলিত আইনকে সম্মান করে এবং তা মেনে চলার চেষ্টা করে।

এই থিওরির আলোকে একজন কিশোর অপরাধী প্রথমত দায়বদ্ধতা অস্বীকার, তারপর আঘাত অস্বীকার, ভুক্তভোগীকে অস্বীকার, নিন্দুকের নিন্দা এবং উচ্চতর আনুগত্য এই পাঁচটি টেকনিকের নিরিখে নিজেকে সঠিক হিসেবে জাহির করে। আবার কোনো কিশোর অপরাধী চাল চলনে খুব ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তারা কিছুকে তোয়াক্কা করে না। বড় জনদের সম্মান করে না।

এরা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। এই কিশোরেরা সমাজের মধ্যে নিজেদের মতো করে নতুন এক সমাজ গড়ে তুলছে। ওই সমাজের সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ সবকিছু আলাদা। নাইন এমএম, নাইন স্টার, বিগবস, ডিসকো বয়েজ ইত্যাদি নামে গড়ে তুলছে মারাত্মক ‘কিশোর গ্যাং’। ফলে সংঘটিত হচ্ছে নানাবিধ অপরাধ।

মারামারি, ছিনতাই, চুরি, পাড়া বা মহল্লার রাস্তায় মোটরসাইকেলের ভয়ঙ্কর মহড়া, মাদক এবং ইয়াবা সেবন ও বিক্রি, চাঁদাবাজি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা এমনকি খুনখারাবিসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে ভবিষ্য’ সমাজের অপার সম্ভাবনাময়ী তরুণ এবং কিশোর সদস্যরা। এই কিশোরদের উদ্ধার করতে হবে। এদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।

খবরের কাগজ খুললেই বিভিন্ন সময় কিশোর গ্যাং নিয়ে লেখালিখি হচ্ছে। বিপথগামী শিশু ও তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ এখন গ্যাং কালচারের সঙ্গে যুক্ত। শহর থেকে এখন গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়েছে এমন অপরাধের ঢেউ। শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়ঙ্কর এই গ্যাং সংস্কৃতি।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে অভিভাবক মহল থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞানী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। বিশ্বের অন্য দেশের শিশু, কিশোররাও নিজেদের যুক্ত করেছে বেপরোয়া গ্যাং কালচারের সঙ্গে। এই কালচার যদি চরমে ওঠে দেশের কেউ ভালো থাকতে পারবে না।

তাই আসুন সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মাধ্যমে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যারা বক্তব্য রাখেন তাদেরকে অনুরোধ জানাব আপনার শিশু কিশোরদের ন্যায়ের পথে পরিচালিত হওয়ার শিক্ষা দেবেন। তাদেরকে বোঝাবেন দেশকে ভালোবাসতে হবে। দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে। দেশের জন্য ভালো কাজ করতে হবে।

প্রত্যেক মা বাবার উচিত তার ছেলে মেয়েকে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে আদর্শ সন্তান হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। কিশোর গ্যাং এর হটস্পর্টগুলো চিহ্নিত করে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। অপরাধের সাথে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে যাতে অন্যরা শিক্ষা লাভ করে।

প্রত্যেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে বক্তব্য দেয়া দরকার বলে আমি মনে করি। আমরা সবাই মিলে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুন্দর একটি পরিবেশ দেব যেখানে গ্যাং কালচার থাকবে না। যেখানে দেশপ্রেম থাকবে। মানবতাবোধ থাকবে। পারস্পরিক ভালোবাসা আর মমতা থাকবে।

ইন্টারনেট, ফেসবুক আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বাস করছি আমরা। প্রতিনিয়ত আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে পরিচিত আর অপরিচিত জনের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছি। ভালো আর খারাপের মিশ্রণে চলছে সমাজ। বর্তমান যুগে ছোট ছেলে মেয়েরা খুব কম বয়স থেকে ইন্টারনেটে প্রবেশ করছে। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় মনের অজান্তেই শিশু কিশোররা ঢুকে পড়ে বিভিন্ন অন্ধকার সাইটে।

যে সাইটগুলো দেখতে দেখতে তাদের আসক্তি জন্মায়। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে নেটে দেখা বিষয়গুলো প্রয়োগ করতে চেষ্টা করে এবং বিভিন্ন জায়গায় করছে। তাই আমাদের মা বাবাদের সচেতন হতে হবে। ছেলে মেয়েরা ইন্টারনেটে কি দেখে। শিশুরা কোন সাইটগুলোর প্রতি দুর্বল তার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

এই কিশোর গ্যাং ধ্বংস করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পুরো সমাজকে ভাবতে হবে। আমাদের সবার চিন্তার সময় এসেছে কিশোর গ্যাং-এর মাধ্যমে আমার একটা ছেলে খারাপ হয়ে যাওয়া মানে সমাজ এবং দেশকে দূষিত করে ফেলা। তাই কিশোর গ্যাংমুক্ত সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য সকলের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করছি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।






ads
ads