আমাদের শিক্ষক সমাজ ও বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা


poisha bazar

  • মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ
  • ২১ জানুয়ারি ২০২১, ১০:২৩

শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষক ছাড়া যোগ্য সমাজ ও উজ্জ্বল জীবন কল্পনাতীত। শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের কাছে বাবা-মায়ের মতো। বাবা-মা যেমন তাদের ভালোবাসা-স্নেহ-মমতা দিয়ে সন্তানদের বড় করেন, ঠিক তেমনি শিক্ষকেরা শিক্ষার আলো দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে যান।

এর সঙ্গে থাকে স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা। তাদের শিক্ষার আলো যেমনি শিক্ষার্থীদের সামনের পথ চলাকে সুদৃঢ় করে, তেমনি তাদের স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে। অনেক ক্ষেত্রে পিতামাতা কেবল সন্তান জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত হন। কিন্তু শিক্ষকেরা শত কষ্টে আমাদের মানুষ করে গড়ে তোলেন।

তাই, তাদের প্রতি আমাদের ঋণের কোনো শেষ নেই। বর্তমানে শিক্ষকদের জীবনে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা। আজকাল সামর্থ্যবানদের ডাকে সবাই সাড়া দেয়। শিক্ষকেরা সামর্থ্যহীন শ্রেণির মানুষ। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকগণ এক রকম ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থায় দিনযাপন করেন। আজকাল যার আর্থিক সচ্ছলতা যত বেশি, তার মর্যাদা তত বেশি।

অশিক্ষিত ও নিরক্ষর সামর্থ্যবানদের ঠেলায় সমাজে আজ সামর্থ্যহীন শিক্ষকেরা এক রকম কোণঠাসা হয়ে আছেন। আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় আজ আমাদের দেশে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা একদম নিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে। শিক্ষকতার মতো সৃজনশীল পেশা খুব কমই আছে পৃথিবীতে।

শিক্ষকদের পেশাজীবন কেবল একটি চাকরির ক্ষেত্রে সীমিত হলেও, একজন মানুষের জীবনে আদর্শবান শিক্ষকদের গুরুত্ব অপরিসীম। এই পেশায় নিয়োজিত হওয়ার পূর্বে মানুষ সাধারণত দুটি দিক থেকে অনুপ্রাণিত হয়। একটি চাকরি অথবা অর্থনৈতিক প্রবণতা, অন্যটি আদর্শিক বা ভাবপ্রবণতার দিক।

প্রথমটির মাধ্যমে তিনি চান অর্থ সম্পদ যার দ্বারা সাংসারিক জীবনে একদিকে যেমন সুখ ও সমৃদ্ধি লাভ করা যায়, অন্যদিকে তেমনি তার সৎ ব্যবহারের দ্বারা জীবনে সম্মান ও গৌরবের সর্বোচ্চ স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা অর্জন করা যায়। দ্বিতীয়টি দ্বারা তিনি চান সেবা ও আত্মনিয়োগ। যারা দ্বিতীয়টি দ্বারা অনুপ্রাণিত হন তারা পার্থিব সুখ-সমৃদ্ধির দিকে আর্থিক মনোযোগী নন।

ফলে উৎসর্গীকৃত জীবন যাপনে তারা আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। প্রকৃত আদর্শ শিক্ষক হতে হলে চাই আত্মোৎসর্গ করার প্রেরণা। করোনা মহামারীর কারণে লণ্ডভণ্ড বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন শিক্ষকরাও। লাখ লাখ শিক্ষার্থী আজ শিক্ষাঙ্গনের বাইরে। তাদের একটি বড় অংশ পরিবারসহ রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে।

এ সংকট ও নানান প্রতিক‚লতার মাঝেও আমাদের শিক্ষক সমাজ আগামী প্রজন্মকে একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ হাতে ডিজিটাল কন্টেন্ট বেইসড, জুম অ্যাপস্, গুগলমিট, ফেসবুক লাইভ, মেসেঞ্জার, ইউটিউব চ্যানেলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে উদ্দীপনা ও সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

তারা ব্যক্তিগত প্রয়াস, সংশ্লিষ্টজনের সহযোগিতা আর প্রযুক্তির প্রয়োগ ও সুযোগের সমন্বয়ে শিক্ষার অবিরত ধারা অব্যাহত রেখেছেন। ঠিক তেমনিভাবে অনাগত দিনে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে দিতে হবে সামাজিক নেতৃত্ব ও রাখতে হবে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা। বুঝিয়ে দিতে হবে জাতিগঠনে তাদের অনিস্বীকার্য গুরুত্ব ও অবদান।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে নিকৃষ্ট দিক হচ্ছে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। বিশাল এই জনগোষ্ঠী দেশের সম্পদ। তবে বর্তমানে বেসরকারি স্কুল-কলেজের ভিড়ে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় না।

সাম্প্রতিক আমাদের দেশে বিভিন্ন অনৈতিক, অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস, ঘুষ, জালিয়াতি এমনকি ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর কর্মকাণ্ডেও শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা বরাবরই লক্ষণীয়। এছাড়া মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাপর্যায়ে বেসরকারি ক্ষেত্রে পূর্বে যে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক এবং উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে হয়েছে বলে শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে এদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে।

শিক্ষকতা পেশায় বাণিজ্যের ছাপ শিক্ষাব্যবস্থাকে করুণ করে তুলেছে। একটা সময় ছিল যখন শিক্ষকদের কাছে পড়তে টাকা লাগত না। তারা নিজ গুণে পড়াতেন। আস্তে আস্তে সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এরপর সেখান থেকে শিক্ষাকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য বেসরকারি স্কুল কলেজ আর কোচিং সেন্টার খোলা হয়েছে।

একজন শিক্ষক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যত না টাকা পান তার থেকে বহু গুণে বেশি টাকা মেলে বাইরে কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিলে, এমনকি অনেক শিক্ষক আজকাল নিজস্ব কোচিং সেন্টার খুলে বসে আছেন। এসব ব্যক্তি মালিকানাধীন বা নিজস্ব কোচিং সেন্টারগুলোতে ভালো সেবা দেয়ার নামে দিনের পর দিন চলছে ব্যবসা। প্রাইভেট আর টিউশনই বা কোনো দিক থেকে কম নয়।

ঐ শিক্ষকের কাছে টিউশন না করলে পরীক্ষায় নাম্বার কম দেবে এমনটাও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে বাসা বেঁধে রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই অভিভাবকগণ তার ছেলে-মেয়েদের কোচিং টিউশনে পাঠায়। এতে করে দরিদ্র অসহায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়। কোচিংবাজ শিক্ষকরা এতটাই ভয়াবহ যে তারা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিবেচনায় নেন না।

শিক্ষকরা শিক্ষাকে বাণিজ্যিকভাবে নিয়ে কখনো গুরু হতে পারবে না। তাদের কেউ সম্মান করবে না। শিক্ষকদের এই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত বেতন-ভাতা ও সুযোগ সুবিধা কম, দ্বিতীয়ত সরকারের তৃণমূলের শিক্ষকদের প্রতি অনীহা, দক্ষ ও যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে ব্যর্থতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বন করা। এসব কারণের দরুন আজ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এই হাল।

এর থেকে পরিত্রাণ পেতে শিক্ষকদের শিক্ষাক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করে দেয়া জরুরি। শিক্ষকেরা হচ্ছেন যে কোনো শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র এবং শিক্ষার মান, শিক্ষকের মান ও প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান যদি দিতে না পারি তাহলে তাদের কাছ থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা যুক্তিসংগত নয়।

সম্মানিত শিক্ষকদের মনে রাখা দরকার শিক্ষকতার পেশা শুধু চাকরি নয়, শিক্ষকতা মহান ব্রত। শিক্ষকের আচার-আচরণ, ব্যক্তিত্ব, আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই সকলের নিকট অনুকরণীয়-অনুসরণীয় ও শিক্ষকসুলভ হতে হবে। তাই শিক্ষার সকল স্তরে উচ্চতর যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে বাছাই করে নিতে না পারলে, তাদের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত না করলে কোনো কিছুই সফল হবে না।

আমরা খুবই আশাবাদী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শিক্ষাবান্ধব সরকার বর্তমানে ক্ষমতাসীন এবং আগামীতে সে ধারা অব্যাহত থাকবে। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যার হস্তক্ষেপে সকল সমস্যার সমাধান হবে-এমনটাই আশা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট






ads
ads