নদীর স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে


poisha bazar

  • ফারিয়া ইয়াসমিন
  • ২১ জানুয়ারি ২০২১, ১০:১৯

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। নদীর প্রাণোচ্ছলভাবে বয়ে চলার মাঝেই ফুটে ওঠে এদেশের আসল সৌন্দর্য। আর সেই নদীকেই তার নিজস্ব সৌন্দর্য হারাতে আমরা বাধ্য করি। আমরা আমাদের প্রয়োজনের স্বার্থে অনবরতভাবে নদী ভরাট করে চলেছি, যার ফলে নদী তার স্বাভাবিক গতি হারাচ্ছে।

নদীর আগের বিচিত্রতার কথা চিন্তা করলে দেখা যায় তখন বৈশাখ মাসেই নদীতে হাঁটু ভরা জল ছিল আর এখন সেই নদীটি মৃতপ্রায় শুধুমাত্র মানুষ্য সৃষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য। বাংলাদেশ আগে জলময় ও বনময় ছিল। এখন আগের অনেক নদী আর খাল-বিলই মৃত। প্রাকৃতিক কারণে নয়, মানুষের কারণে এসব মৃত। বাংলাদেশের সর্বত্রই নদীগুলো দখল, দূষণ ও ভরাট হচ্ছে।

বিষয়টা এমন নয় যে, আমরা নদীর উপকারিতা সম্পর্কে বা নদীমাতৃক দেশে নদীর গুরুত্ব সম্পর্কে জানি না। সব কিছু জেনে শুনেই নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আমরা অনবরত নদী ভরাট করে চলেছি। প্রতিনিয়ত নদী ভরাটের কারণে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। কমে যাচ্ছে নদীর পানি ধারণক্ষমতা।

শুধুমাত্র নদী ভরাট করার মাধ্যমে দখল করাই নয়, পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নদী দূষিত হচ্ছে। আগে বলা হতো নদীর এক‚ল ভাঙে ওক‚ল গড়ে। তাও যে হচ্ছে না তা নয়, তবে নদীগুলোর উজানে মানবসৃষ্ট বাধার জন্য নদীর প্রবাহ কমে যাচ্ছে, নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে ষাটের দশকে দেওয়া বেড়িবাঁধ স্বাভাবিক নদীপ্রবাহ নষ্ট করেছে, ফলে নদীমুখ ভরাট হয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে।

আর এই জলাবদ্ধতার কারণে বিঘ্নিত হয় স্বাভাবিক জীবনযাপন। সারাদেশে অনেক নদীতে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ ও সুইস গেট নির্মাণ এবং রাস্তা তৈরি করে নদীপ্রবাহে বাধা দেয়া হয়েছে ও ভরাটের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের দেয়া ফারাক্কার বাঁধের কারণে পদ্মা নদী বালিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

পদ্মা নদী ভরাট হওয়ার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। এইভাবে যদি অনবরত নদীর ওপর অত্যাচার চলতে থাকে তাহলে নদীমাতৃক দেশ থেকে নদী নামক শব্দটাই বিলীন হয়ে যাবে। শুধু সংস্কৃতিতে নয়- আপামর জনসাধারণের জীবন ও জীবিকা, চলাচল ও যোগাযোগ, কৃষি ও শিল্প, পেশা ও নেশা, ব্যবসা ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, গঠন, পরিবর্ধন ও বিস্তারে নদীর প্রত্যক্ষ ভ‚মিকা রয়েছে।

নদী মরে গেলে উজানের পানি ও বৃষ্টির পানি গ্রাম-শহর-ফসলের মাঠ ভাসিয়ে দেবে, জলাবদ্ধতা হবে এবং সর্বশেষ সাগরে চলে যাবে। এতে রাস্তার স্থায়িত্ব কমে যাবে। বর্ষা শেষ হতেই মৃতপ্রায় নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়বে। ভ‚গর্ভে যথেষ্ট পানি প্রবেশ করতে পারবে না। পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাবে। চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্রমে মরুকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। এমনি আরো অনেক কারণ রয়েছে, এ কথা বলার যে নদী বাঁচলেই দেশ বাঁচবে।

স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে পলি ও বালি দ্বারা ভরাট হতে হতে সেই নৌপথ কমতে কমতে চার হাজার কিলোমিটারে ঠেকেছে। এই নৌপথের চার ভাগের এক ভাগ মাত্র শুষ্ক মৌসুমে নৌ-চলাচল উপযোগী থাকে। নদীর নাব্য রক্ষার জন্য বছরে ৭০-৮০ লাখ ঘনমিটার পলি-বালি ড্রেজিং বা খনন করার প্রয়োজন হলেও বিআইডব্লিউটিএ মাত্র ৩০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করতে পারে।

নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। ফলে এখন থেকে নদী দখল, ভরাট, নদী দূষণ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে এখনো নদী ভরাট করার মতো অপরাধ কমেছে বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আইনি তৎপরতা ছাড়াও আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে সচেতন না হওয়া পর্যন্ত এই ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম কমবে না। আইনের বাধা থাকা সত্ত্বেও আমরা নদী ভরাট করে চলেছি। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে ক্ষমতার বলে এই আইনকে দমিয়ে এসব অপরাধমূলক কাজ করা হয়ে থাকে।

২০২০ সালে দেশে নদী দখলদারের সংখ্যা ৬৩ হাজার ২৪৯ জন, যা গত বছর দখলদারের এই সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার ৩৯০ জন। এইভাবে যদি নদী দখলের পরিমাণ বেড়ে যায় পরবর্তীতে তা রোধ করা কঠিন হয়ে যাবে। তাই এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বোপরি যে সিদ্ধান্ত বা আইনি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়ন খুবই দরকার।

রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে আইনকে দমিয়ে কেউ যেন এসব নদী দখল করতে না পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। নদীতে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা এবং দখল রোধের দায়িত্ব দেওয়া আছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। আবার নদীর দূষণ ঠেকানোর দায়িত্ব পরিবেশ অধিদফতরের। এভাবে নদী রক্ষার সঙ্গে জড়িত আছে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।

এগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে। নদী দখল, দূষণের অপরাধে যথাযথ শাস্তি প্রদান করতে হবে এবং সে শাস্তি যেন অন্য অপরাধীদের কাছে উদাহরণস্বরূপ হয়ে থাকে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বিভিন্ন মামলার রায়, আদালতের নির্দেশনা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের পরামর্শসভার মতামত নিয়ে নদী রক্ষায় ১২২ দফার সুপারিশ তৈরি করেছে।

২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে সুপারিশগুলো দেওয়া হয়েছে। শুরুতে নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখলদার চিহ্নিতকরণ, দখলদার উচ্ছেদ ও নদী উদ্ধারে কমিশন ৩১টি সুপারিশ করেছে। যথাযথ নির্দেশনা মেনে আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে এবং অবৈধ দখলদার চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে তাদেরকে শাস্তি প্রদান করতে হবে। নদী রাষ্ট্রের একার সম্পদ নয়, এটাকে রক্ষা করা জনগণেরও কর্তব্য। তাই সকলেই নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে সচেতন হতে হবে। নদী বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র আর সেই প্রাণকেন্দ্রকে যেন আমাদের কর্মকাণ্ডের ফলে ধ্বংস হতে না হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট






ads
ads