বাঙালি জাতির জনক ও তার আধুনিক কৃষি ভাবনা


poisha bazar

  • মো. মাসুদ রানা
  • ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ১৬:৪৫

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তারিখে বর্তমান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার অজপাড়াগাঁয়ের প্রত্যন্ত ছায়াঘেরা পরিবেশে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। কথিত আছে শেখ পরিবারের বড় ছেলে খোকা (শেখ মুজিবুর রহমানের ডাক নাম) যে বছর জন্মগ্রহণ করেন সে বছর গ্রামে ফসল ভালো হয়েছিল এবং গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়েছিল।

শৈশবকাল থেকেই কৃষি ও কৃষকের হাড়ভাঙা কঠোর পরিশ্রম ও দুঃখ দুর্দশা শিশু মুজিবের মনকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। গ্রামে বেড়ে ওঠার সুবাদে বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতি ও ঋতু বৈচিত্র্য কিশোর মুজিবকে সম্মোহিত করে রাখত। ছোটবেলা থেকেই তিনি পরোপকারী ও মিশুক প্রকৃতির ছিলেন। যে কেউ বিপদে পড়লে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতেন। শৈশবেই নেতা হয়ে ওঠার সকল গুণাগুণ প্রকাশিত হতে থাকে কিশোর মুজিবের মাঝে। তিনি ছোটবেলা থেকেই খুব দুরন্ত ও ডানপিটে ছিলেন। কোন প্রকার অন্যায় অবিচার সহ্য করতেন না।

গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো প্রথিতযশা ও স্বনামধন্য রাজনীতিবিদরা রত্ন চিনতে ভুল করেননি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সরাসরি সান্নিধ্যে রাজনীতির হাতেখড়ি হয় সদ্য কিশোর বয়স পেরোনো শেখ মুজিবুর রহমানের। এর পর থেকেই কৃষক শ্রমিকসহ গরিব, দুঃখী, মেহনতি মানুষের ভাবনা, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণ চিন্তা- এ সবই মুজিবের মনজুড়ে তোলপাড় হতে থাকে।

কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধি তুখোড় ছাত্রনেতা শেখ মুজিব তখন রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে নানাবিধ সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ক্রমেই শেখ মুজিবুর রহমানের সাংগঠনিক দক্ষতা প্রকাশ পেতে থাকে এবং তার জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ভারতবর্ষ ততদিনে দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানে পরিণত হয়েছে।

তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বুঝতে বাকি রইল না দেশে স্বাধীনতার মুখোশের আড়ালে স্বেচ্ছাচারিতা, অপশাসন, শোষণ ও নির্যাতন চলছে। তাই তো মুসলিম লীগ ছেড়ে তিনি গঠন করলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। কিভাবে বাংলার গরিব, দুঃখী মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে, কিভাবে তাদের মুক্তি আসবে এই বিষয়গুলো সবসময় তার চিন্তা চেতনা জুড়ে থাকত।

সেই লক্ষ্যে সমগ্র দেশব্যাপী শুরু হলো তার রাজনৈতিক ঝটিকা সফর, বিরামহীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি অসংখ্যবার শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। শেখ মুজিব জেল জুলুমে কখনোই ভীত ছিলেন না, তাই তো শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি সবসময় সঠিক ও ন্যায় কথাটি বলেছেন।

খুব সহজেই তিনি সাধারণ মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন এজন্য দিন দিন তার জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তাই তো স্বৈরশাসকেরা তাকে বারবার জেলে ঢুকিয়েছেন আবার ছেড়ে দিতেও বাধ্য হয়েছেন। ইতোমধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে আওয়ামী লীগ।

উপায়ন্তর না পেয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলার গণমানুষের নেতাকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামক মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে। কিন্তু বাংলার কৃষক, শ্রমিক, জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসকরা বাধ্য হয় বাংলার আপামর জনতার প্রিয় নেতাকে মুক্তি দিতে এবং ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করে। সেই থেকে বঙ্গবন্ধু নামে সারা বাংলায় তিনি ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

ইতোমধ্যে ১৯৭০ সালে বাংলার উপক‚লীয় এলাকায় প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানিসহ মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কোন ভ্রুক্ষেপ না করে বিষয়টি উপেক্ষা করে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তার দল ঝাঁপিয়ে পড়েন দুঃখী ও বিপদগ্রস্ত মানুষের সেবায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন অত্যাচার, শোষণ ও নিপীড়নের মুখে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি পেশ করেন। এরই ধারাবাহিতায় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে শুরু করে নানা টালবাহানা ও ষড়যন্ত্র। এমতাবস্থায় বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতা অর্জন ব্যতীত অন্য কোনো পথ ছিল না। তাই তো ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার ডাকে সারা দিয়ে এদেশের মুক্তিপাগল জনতা পরাধীনতার শিকল ভেঙে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল।

এ সময় বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কারাগারে আটক করে রাখে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত এবং দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ আর বঞ্চনার শিকার ছিল এ বাংলা।

এ বাংলার অর্থনীতির অবস্থান ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল শোষণমুক্ত, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ এখন সোনালি ফসলে ভরপুর।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।






ads
ads