২০২০-এর শিক্ষা এবং ২০২১-এর প্রত্যাশা


poisha bazar

  • ইমরান ইমন
  • ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ১২:১২

মনে বিষাদ নিয়ে বিষে ভরা ২০২০ সালকে আমরা বিদায় দিয়েছি। নতুন ভোরের প্রত্যাশায় বরণ করে নিয়েছি ২০২১ সালকে। এবার ২০২১ কে ঘিরে আমাদের অনেক স্বপ্ন, অনেক পরিকল্পনা। কিন্তু মহামারী করোনামাখা বিদায়ী বছর-২০২০ আমাদের কী শিখিয়েছে? সেটা কি আমরা স্মরণে রেখেছি? নাকি বেমালুম ভুলে গেছি বা মনে রাখার প্রয়োজনবোধ করিনি? মহামারী করোনামাখা ২০২০ আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়েছে।

বিশেষ করে শিখিয়েছে, কোনো ধরনের দুর্যোগ-মহামারী আসার আগে সেটা মোকাবিলা করার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা। যাতে দুর্যোগ-মহামারী এলে বা রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে মোকাবিলা করার মতো প্রয়োজনীয় সবধরনের ব্যবস্থা থাকে। সরকারি থেকে বেসরকারি পর্যায়ে সেই প্রস্তুতি থাকলেই তখন দুর্যোগ-মহামারী মোকাবিলা সম্ভব। অন্যথায় দেশকে এবং দেশের মানুষকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। যার বাস্তব চিত্র আমরা দেখেছি যখন বিশ্বজুড়ে মহামারী করোনা ভাইরাস হানা দিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ২০২০ সালের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল মহামারী করোনা ভাইরাস। ২০২১-এ এসেও এ ভাইরাস প্রধান আলোচিত বিষয় এবং ভাইরাসের শক্তি এখনও বেগবান। মহামারী এই করোনা ভাইরাস পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে বিশ্ব উন্নয়নের সব রূপরেখা ও কর্মপরিকল্পনাকে।

২০১৯-এর ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া এই মহামারী ভাইরাস আস্তে আস্তে বিশ্বের অন্য দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়ে। করোনা দেখিয়ে দিয়েছে বিশ্বের কোন দেশ দুর্যোগ-মহামারী মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত!

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য খাত কতটা দুর্বল বা সবল তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কোন দেশের স্বাস্থ্য খাতের কেমন হালচাল তা প্রকাশ পেয়েছে। জনসম্মুখে উঠে এসেছে সকল অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও সমন্বয়হীনতার চিত্র। উঠে এসেছে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের অমানবিক কর্মকাণ্ড।

প্রকাশ্যে উন্মুক্ত হয়েছে কতটা অদক্ষ জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। প্রকৃত অর্থে একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। মহামারী করোনা ভাইরাস প্রমাণ করেছে যুদ্ধ ও কূটরাজনীতির সক্ষমতার জন্য রাষ্ট্রসমূহ যে পরিমাণ সময় ও অর্থ ব্যয় করে, স্বাস্থ্যসেবার জন্য ততটা করে না। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত না থাকলে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা কাজে আসে না।

কেন না জনগণই একটি দেশের শক্তি। উন্নত রাষ্ট্রগুলো সামরিক খাতে বিশেষ করে অস্ত্র উদ্ভাবন, তৈরি, ক্রয় ও বিক্রয়ে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। অথচ এই রাষ্ট্রগুলো মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে না। প্রায় সব দেশেই দেখা যায় অন্যান্য খাতের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ সবচেয়ে কম থাকে।

কিন্তু জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত না থাকলে অর্থনৈতিক সচ্ছলতাও যে খুব একটা কাজে আসে না সেটা প্রমাণ করেছে করোনা ভাইরাস। বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ও শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ আজ দিশেহারা এই অতি ক্ষুদ্র অণুজীব করোনা ভাইরাসের কাছে। বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রগুলো এখন করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় দিনাতিপাত করছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, চীন, রাশিয়া, জার্মানি এসব দেশের মধ্যে এখন কে কার আগে করোনা টিকা আবিষ্কার করে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্ব জয় করবে? তার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সংক্রমণ রোধে সফল দেশগুলোও এখনো দাবি করতে পারে না তারা সংক্রমণ থেকে পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত, কারণ করোনা পুনরায় ফিরে আসতে পারে। অর্থাৎ পুনঃসংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। জাপান, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়া তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এসব দেশে করোনার পুনঃসংক্রমণ ঘটেছে।

একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, যেসব দেশ তার স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিল সেসব দেশ করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে বেশ সফলতা দেখিয়েছে। এর মধ্যে ভিয়েতনাম ও কিউবা অন্যতম।

স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ও চিকিৎসা কর্মসূচিতে সফল ভিয়েতনামের এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়- দেশটিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২৬৮ জন, সুস্থ ২২৪ জন এবং একজনও মারা যাননি। (সূত্র : ওয়ার্ল্ডমিটার)।

করোনা প্রতিরোধে ভিয়েতনামের এমন? সফলতা সম্পর্কে বলা হচ্ছে, সরকারিভাবে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ও রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করার যে কর্মসূচি ভিয়েতনাম বহুদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছে, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সেটি বড় কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে।

ভিয়েতনামে প্রথম একজন বিদেশি করোনা রোগী শনাক্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ইমারজেন্সি এপিডেমিক প্রিভেনশন সেন্টার সক্রিয় করে। এরপর একজন ভিয়েতনামী নারীর করোনা শনাক্ত হলে তৎক্ষণাৎ প্রধানমন্ত্রী এটাকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা দেয়। বিমান চলাচল সীমিতকরণসহ সীমান্তে কড়া নজরদারি ও ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

ব্যাপক আকারে সংক্রমণ ঠেকাতে সকল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। করোনা ভাইরাস নিয়ে ব্যাপক প্রচারে নামে সরকার। পাশাপাশি দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে পরীক্ষা করা শুরু করে। আর কোভিড-১৯ দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আগেই পর্যায়ক্রমে তারা পুরো দেশটাই লকডাউন করে দেয়। করোনা সতর্কতা নিয়ে ভিয়েতনামের আরো বহু কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।

করোনা সংকটে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে কিউবা। করোনার জন্য কিউবা আলোচনায় এসেছে প্রধানত দুটি কারণে। এক- করোনা নিয়ন্ত্রণে তাদের স্বাস্থ্য খাতের ভ‚মিকা। দুই- একটি ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রের করোনা মোকাবিলায় পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে মেডিক্যাল টিম প্রেরণ এবং ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করা।

অন্যদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে করোনা ভাইরাসকে মোটেও গুরুত্ব দেয়নি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনের বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে তথ্য দেয়ার পরও কিছু ভাইরাস বিশেষজ্ঞসহ নীতিনির্ধারকেরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। যদিও তারা এই ভাইরাস সম্পর্কে অবগত ছিলেন। কিন্তু তারা প্রস্তুতি নেননি। এ ধরনের মহামারী মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র অপ্রস্তুত, এই কথা জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব সতর্কবাণী গ্রাহ্য করেননি। ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ২২ জানুয়ারি ট্রাম্প বলেছিলেন, বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের টুইট, ‘আমাদের দেশে মাত্র ১১ জন আক্রান্ত এবং তারাও সেরে উঠেছেন’।

২৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বললেন, যুক্তরাষ্ট্রে করোনা বেশ ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আছে। এভাবে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলেছেন এবং ৯ মার্চ তিনি বললেন, এটা সামান্য ফ্লু, দু’দিনেই চলে যাবে। অথচ তখন করোনা ভাইরাস দু-চার জন করে বাড়ছে আর ছড়িয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে। আর বর্তমানে করোনা আক্রান্তে ও মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এক নম্বরে অবস্থান করছে।

অথচ ট্রাম্প ওই সময় একদিন বলেছিলেন, এটা কোনো সংকটই নয়, এটা সাধারণ ফ্লুর মতো। পরদিনই তিনি আবার বললেন, এখন ভয়াবহ সংকটের সময়। এ ধরনের বক্তব্য সংকট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ এলার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের পরিচালক এবং করোনার টাস্কফোর্স বিশেষজ্ঞ ডা. ফাউসি ফেব্রুয়ারিতেই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন।

কিন্তু এ ব্যাপারে কোনোই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি যখন নিউ ইয়র্কে ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত, ৬৭২ জন মানুষ মারা গেছে, তখনও ট্রাম্প বলছেন, দুই সপ্তাহের লকডাউনের প্রয়োজন নেই। এভাবে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের দায়িত্বহীন আচরণের ফলে প্রচুর সময় নষ্ট হওয়ায় সেখানে ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপর তো ট্রাম্প সাহেব নিজেই আক্রান্ত হলেন। সে নিয়ে নানা ঘটনা তো বিশ্ববাসী দেখলই।

অন্যদিকে চীনের নিকটবর্তী দেশ তাইওয়ান সম্পূর্ণ লকডাউন না করেও সফল হয়েছে। অথচ চীনের সঙ্গে নিকট সংশ্লিষ্টতার জন্য তাইওয়ানকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা মনে করা হচ্ছিল। মাত্র ২৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশটির প্রায় ০.৮৫ মিলিয়ন নাগরিক চীনের মূল ভ‚খণ্ডে বসবাস করে।

এরা চীনা নববর্ষে চীন থেকে তাইওয়ানে বেড়াতে আসেন। ফলে এ আশংকা অমূলক ছিল না যে এসময় করোনার প্রাদুর্ভাব বেশি হবে। কিন্তু ডধৎষফড়সবঃবৎ-এর তথ্য অনুযায়ী (২৩ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত) সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ৪৩৮ জন, সুস্থ হয়েছে ২৫৩ জন মারা গেছে মাত্র ৬ জন। লকডাউন না করেও তাই সফল তাইওয়ান।

তাইওয়ানের করোনা নিয়ন্ত্রণের মূলে রয়েছে তাদের সার্স ভাইরাস সংকটের অভিজ্ঞতা। ২০০২-০৩ সালের সেই মহামারীতে প্রায় দেড় লাখের বেশি মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা এমন সংকটের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি জনস্বাস্থ্য রেসপন্স মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করে। অভিজ্ঞতা থেকে তারা আসন্ন সংকটকে দ্রুত উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ইমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাগুলো সক্রিয় করে তোলে।

জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহতম রাষ্ট্র ভারত করোনা প্রতিরোধে সাফল্য দেখাতে পারেনি। তবে ভারতের মধ্যে একমাত্র কেরালা রাজ্য করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে কিছুটা প্রশংসিত হচ্ছে এবং ‘কেরালা মডেল’ হিসেবে আলোচিত হয়েছে।

গণহারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন রাখা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা লোকজনকে দ্রুত খুঁজে বের করা, দীর্ঘ সময় কোয়ারেন্টাইনে ব্যবস্থার পাশাপাশি হঠাৎ লকডাউনের কারণে আটকে পড়া হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা ও কয়েক লাখ শ্রমিকের কাছে নিয়মিত খাবার পৌঁছানো এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করা পরিবারদের জন্য খাবার বিতরণ ব্যবস্থার মতো মানবিক উদ্যোগের কারণেই প্রশংসিত হচ্ছে কেরালা।

তাছাড়া ছোট ছোট ‘কিওস্ক’ বা স্টলের মাধ্যমে স্বল্প খরচের করোনা টেস্টের ব্যবস্থাও করা হয়েছে সেখানে। এসব ব্যবস্থা নেয়ার কারণে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিল তারা। ফলে সংকোচ, লোক লজ্জার ভয় ছুড়ে ফেলে দিয়ে মানুষও আরো বেশি করে এগিয়ে এসে নিজেদের পরীক্ষা করিয়েছেন।

স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী শারীরিক দূরত্ব মেনে চলেছেন। অবশ্য কেরালার অধিক শিক্ষার হার এবং দীর্ঘদিনের কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনের পরিবেশ মানুষকে সচেতন করতে সহায়ক হয়েছে। কেরালার মডেল মূলত সফল অর্থনৈতিক-স্বাস্থ্য-সামাজিক এই তিনটির মিলিত ফসল।

এবার আসা যাক বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির দিকে। বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। দেশে করোনা সংক্রমণের পর থেকে আস্তে আস্তে চোখে পড়তে শুরু করে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল অবস্থা। করোনা না আসলে হয়তো দেখা যেত না দেশের স্বাস্থ্য খাতের এমন দুর্বলতা, অপব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির হালচাল তথা স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক করুণ চিত্র।

সাবরিনা-শাহেদদের ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট বাণিজ্য, করোনা সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের কর্মকাণ্ড, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা, চিকিৎসার অবহেলায় রোগীর মৃত্যু, ড্রাইভার মালেকের দুর্নীতিকাণ্ড, করোনার প্রণোদনায় লুটতরাজ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড জনসম্মুখে প্রকাশ পেতে শুরু করে।

এসব বিষয় আলোচনায় আশার পর, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর সরকারের টনক নড়ে। সরকার অসুস্থ স্বাস্থ্য খাতের পুনরুদ্ধারে তৎপর হয়। দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের প্রতিহত করতে মাঠে নামে। করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনতায় প্রচার-প্রোপাগান্ডা শুরু করে। কিন্তু তাতে দেশের বেশিরভাগ মানুষ তেমনটা কর্ণপাত করেনি।

সরকার এক পর্যায়ে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ নীতি এবং জেল-জরিমানা শুরু করে। তবুও দেশের মানুষকে পুরোপুরি সচেতন করা সম্ভব হয়নি। একদিকে দেশের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা অন্যদিকে দেশের জনগণের উদাসীনতা- ফলে করোনা প্রতিরোধে আমাদের তেমনটা সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

করোনামাখা ২০২০ থেকে আমাদের বিশেষ শিক্ষা হলো যেকোনো দুর্যোগ-মহামারী মোকাবিলায় দেশকে সবসময় প্রস্তুত রাখতে হবে। আর এর জন্য যা যা করা দরকার তা তা করতে হবে।? দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে করতে হবে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর এবং শক্তিশালী। অবকাঠামোগতভাবে দেশকে রাখতে হবে শক্তিশালী। করোনা এমন এক ভাইরাস যা ধনী-গরিব, সাদা-কালো কিছুই মানছে না।

অথবা ধনী দেশ, গরিব দেশ মানছে না। ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে ধর্ম বা জাতির শ্রেষ্ঠতার দম্ভ। করোনার আরেকটা বার্তা হলো, শুধু নিজে সুস্থ থাকলে হবে না, অন্যকেও সুস্থ থাকতে হবে। না হলে অন্যের ভাইরাস একশো জন ঘুরে তাকেও আক্রান্ত করবে। করোনার থেকে আমরা আরো জানলাম যে, জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত না হলে ব্যক্তি বিশেষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কোনো মূল্য নেই। তাই পৃথিবীর সকল দেশের জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই মানব? জাতির সার্বিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

করোনাকালীন ২০২০ এ দেখা গিয়েছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা প্রযুক্তিতে কতটা পিছিয়ে আছি। করোনাকালীন বিশ্বের অন্যান্য দেশের জনগণ যখন ঘরে বসে অনলাইনে তাদের সব কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে আমরা কিন্তু তেমনটা পারছি না। এর প্রধান কারণ হলো আমাদের প্রযুক্তির দুর্বলতা।

এখনও পর্যন্ত কিন্তু আমাদের দেশের সব জায়গায় আনাচে-কানাচে পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা পাওয়া যায় না। তাছাড়া জনগণের প্রযুক্তি সম্পর্কে এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের যথেষ্ট জ্ঞান না থাকা আমাদের প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। আমাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক/ শিক্ষিকাই কিন্তু এ ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার জানেন না। যা করোনাকালীন ২০২০ সময়টাতে জনসম্মুখে উঠে এসেছে। ২০২১ এ আমাদের যাতে এসব সমস্যার আর সম্মুখীন হতে না হয় এটাই প্রত্যাশা।

করোনাকালীন? ২০২০ এ মানুষের জীবন যখন বিষ হয়ে আছে তখন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া করে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আজকে চালের দাম বৃদ্ধি, কালকে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি ইত্যাদি কারসাজি করে মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে সিন্ডিকেট চক্র। আশা করি জনসাধারণের ২০২১- এ এসে আর এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে না।

শোনা যাচ্ছে, বাজারে সর্বমহল স্বীকৃত করোনার ভ্যাকসিন আসছে। এটা আমাদের সবার জন্য বড় ধরনের সুসংবাদ। প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য মতে, আমাদেরও জুনের দিকে ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন এ ভ্যাকসিন যেহেতু ঠিকঠাক দেশের সব জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায় সে জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। সচরাচর এদেশের সবকিছুতে সিন্ডিকেটের প্রভাব লক্ষণীয়। জীবন রক্ষাকারী এ ভ্যাকসিনে যাতে সিন্ডিকেটের হাত পড়তে না পারে, এ ভ্যাকসিন নিয়ে যাতে কোনো ধরনের রাজনীতি বা ব্যবসা না হয় এটাই এসময়ের দাবি, এখনকার চাওয়া।

আমরা ২০২০ কে বিদায় দিয়ে ২০২১ কে বরণ করে নিয়েছি। ২০২০ আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়েছে। সর্বোপরি, ২০২০-এর দুর্বলতা-অপূর্ণতা-ব্যর্থতাগুলো থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোতে হবে। আর এটাই ২০২১-এর প্রত্যাশা। অপূর্ণতা, ব্যর্থতা, দুর্বলতাগুলোকে এক একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলেই আস্তে আস্তে আমাদের পূর্ণতা আসবেই। আমরা একদিন আলোর দেখা পাবই।

লেখক: শিক্ষার্থী: ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।






ads
ads