নতুন কারিকুলামে থাকুক চিন্তাশক্তি বিকাশের প্রিয় পাটিগণিত

মো. নিজাম উদ্দীন

মো. নিজাম উদ্দীন
মো. নিজাম উদ্দীন - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪৬

গণিত শাস্ত্রের প্রাচীনতম শাখা হচ্ছে পাটিগণিত। জীবনের ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা থেকে পাটিগণিতের উৎপত্তি ও বিকাশ। নাম শুনেই মনে হয়, পাঠ করে করে সমস্যা সমাধান করতে হয়, নয়তো দিবসের শেষে পাটিতে বসে দৈনন্দিন হিসাব নিকাশ করার সঙ্গে সম্পর্ক আছে পাটিগণিতের।

তখনও গণনা শিখে নাই মিশরীয়রা, সংখ্যা গণনার চার নিয়ম তারা শিখে ওঠেনি, তখনও তারা গুণে রাখতো সব কিছু। তখন তাদের গণনার বিষয়টি ছিল বেশ মজার। যতোগুলো পালিত মেষ বাইরে যেতো ততোগুলো পাথরের টুকরো সরিয়ে রাখা হতো একটি পাত্রে। আবার দিন শেষে সন্ধ্যা বেলা ফিরবার সময়ে মিলিয়ে দেখতো সেই পাথর। যদি পাথর অবশিষ্ট থাকতো তবে বুঝতো সবগুলো মেষ ফেরেনি। কিন্তু পাথর আগেই শেষ হয়ে গেলে বুঝতো অতিরিক্ত কিছু অতিথি মেষ প্রবেশ করেছে তাদের পালিত মেষের সঙ্গে। এমন গল্পধারা থেকে পাটিতে বসে গণনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আরো পড়তে ক্লিক করুন- আসন্ন নতুন পাঠ্যপুস্তক : কয়েক দফা আশঙ্কা

তাছাড়া পাটিগণিতের পাঠোদ্ধার করে সমস্যা সমাধান করবার বিষয়টিও অনুমান করা যায়। তাই পাঠ শব্দের সঙ্গে পাটি শব্দের ধ্বণিগত মিল দেখা যায়। পাটিগণিতের সঙ্গে জীবন ঘনিষ্টতার বিষয়েও অনুমান করা যায়। তাছাড়া পাটি শব্দের অর্থ পরিপাটি, সুশৃঙ্খল, ধারাবাহিক ইত্যাদি। পাটিগণিতের সমস্যা সমাধান করতে গেলেও তাকে গুছিয়ে সাজিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখতে হয়, নয়তো সমাধানের পথে গোল বেঁধে যেতে পারে।

প্রাচীন পাটিগণিতে অবদান রেখেছেন আর্কিমিডিস, পীথাগোরাস, গ্যালিলিও প্রমূখ। আধুনিককালে অনেকের নামই উল্লেখ করা সম্ভব। তবে ভারতীয় গণিতবীদ ও জ্যোতির্বিদ আর্য্যভট্টকে (৪৭৬-৫৫০ খ্রি) পাটিগণিতের জনক বলা হয়ে থাকে। ধনাত্বক সংখ্যার যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ ইত্যাদি সম্পর্কিত চার নিয়মের সমস্যা সমাধানের কৌশল পাটি গণিতের অন্তর্ভূক্ত বলে ধরা হতো। তবে আধুনিক সময়ে ঋনাত্মক সংখ্যা, ভগ্নাংশ ইত্যাদির সংগে পাটিগণিত সাংঘর্ষিক নয়।

মানুষের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই এক প্রকার গাণিতিক জ্ঞানের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। যেমন বাবার বয়স ২৫ হলে ছেলের বয়স ১৫ হতে পারে না, আবার সন্তান ১৮ হলে মা ৩০ হতে পারে না। এ ধরণের যুক্তির দুর্বলতা অনুধাবনের জন্য দরকার হয় মানুষের গাণিতিক কাণ্ডজ্ঞান। সে লেখাপড়া না জানুক, স্কুলে কোন দিন না যাক তবু এই প্রাকৃতিক জ্ঞান তার ভেতরে লক্ষ্য করা যায়। একজন নিরক্ষর মানুষ জীবন যাপনের ভেতর থেকেই হিসাব নিকাশ করবার নিজস্ব একটি পদ্ধতি রপ্ত করে নিতে পারে। ধান চালের পরিমাণগত হিসাব, ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত লাভ-ক্ষতির হিসেব সে মুখে মুখেই শিখতে পারে। গণিতের এ ধরনের জ্ঞানকে প্রাকৃতিক গাণিতিক জ্ঞান বলা যেতে পারে। ভাষা জ্ঞান ও সামাজিক জ্ঞান বিকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এই জ্ঞানও বিকাশ লাভ করে।

কিন্তু বীজ গণিতীয় জ্ঞান এভাবে ব্যবহারিক জীবনের ভেতর দিয়ে বিকাশ লাভ করতে পারে না। কেননা পাটিগণিতের ভেতরে প্রবেশ করে তার ঘটনাটির অর্থ উদ্ধার করতে হয়। কিন্তু বীজগণিতের ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন হয় না এবং তা সম্ভবপরও নয়। জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সমস্যার কল্পনায় পৌঁছানো সম্ভব হয় সহজেই। বীজ গণিতের মাধ্যমে সকল সুক্ষ ও জটিল হিসাব সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও গণিতের লোকায়ত ধারা পাটি গণিত যা গণিতের ভিত্তি নির্মাণে প্রধান ভূমিকা রাখে।

বীজগণিতের ক্ষেত্রে কোন ঘটনা চিন্তা করতে পারি না। উৎপাদকে বিশ্লেষণ করা, সমাধান করা, সেটের সমাধান করা, সরল করা ইত্যাদি শুধুমাত্র গাণিতিক কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে পাঠনির্ভরতা নেই এবং গল্পের তাৎপর্য বুঝে সমাধান করা দরকার হয় না।

পাটিগণিতের ক্ষেত্রে ক্রমাগত চিন্তা শক্তিকে কাজে লাগাতে হয় এবং কাজে লাগানোর মাধ্যমেই গাণিতিক সমস্যা সামাধানের সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পেতে থাাকে।

এভাবে গণিত চর্চার সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতিগত এক ধরনের ঐক্য লক্ষ্য করা যায়। আমাদের বালক বেলাতেও পিতা মাতা, সহপাঠী, শিক্ষক, আত্মীয় অনাত্মীয় প্রতিবেশিরা মাঝে মাঝে এক প্রকার ছন্দে নির্মিত ধাঁধাঁ দিয়ে আমাদের বুদ্ধিমত্তা যাচাই করতেন। আমরাও বেশ মজা উপভোগ করতাম। বেশিরভাগেই থাকতো গাণিতিক বুদ্ধির খেলা। আমরা এসবের উত্তর বের করার জন্য যতোটা মাথা খাটাতাম অন্য কোন কিছুতেই ততোটা মাথা খাটাতাম না। কখনও কয়েকদিন কেটে যেতো। এমনকি একজন অন্যজনকে বলতাম না, পাছে কেউ উত্তর আগেই জেনে ফেলতে পারে! ব্রেইন স্টর্মিং হতো বেশ। নিজে নিজেই উত্তর বের করবার চেষ্টা করতাম, যেন নিজের সঙ্গেই নিজের প্রতিযোগীতা। এর ভেতরে এক প্রকার আত্মপ্রত্যয় অনুভব করতাম। শিক্ষার প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি তেমনই। মনের ভুল কিনা জানি না, আজকাল বোধহয় আত্মপ্রত্যয়ের বড়ো অভাব। ছেলে মেয়েরা উত্তর জানতে পারলেই খুশি, সেটা কীভাবে হলো তা না বুঝলেও কোন গ্লানি অনুভব করে না।

একবার সেকেণ্ড স্যার ক্লাসে এসেই কোন বই চাইলেন না। বরং একটা ধাঁধাঁ ছুড়ে দিলেন। খুব আগ্রহে শুনে নিলাম। ধাঁধাঁটি এমন : একটি বাড়ির টিনের চালে একটি পায়রা বসে আছে, আরো একদল পায়রা দূর থেকে নিকটে আসছে। চালে বসে থাকা পায়রাটি জানতে চাইছে, তোমরা কতোজন যাচ্ছো? দলনেতা উত্তর দিচ্ছে- আসছি যতো, আসবে ততো, তার অর্ধেক, তার পাই, তোমাকে নিয়ে শত পুরাই। বলো তো এবার সামনের দলে কতোজন উড়ে যাই?

সমাধান : আসছি যতো : x ,আসবে ততো : x,তার অর্ধেক : (x )/২, তার পাই : (x )/4, তোমাকে : ১
কাজেই শত পুরানোর শর্তমতে : x + x + (x )/২+ + (x )/৪+ +১=১০০, সামাধান করে পাই, x=৩৬, অর্থাৎ প্রথম দলে ছিল ৩৬ টি পায়রা।

কিন্তু হিসেবের এই বীজগণিতীয় পদ্ধতি (false method) সম্পর্কে জানতাম না। বীজ গণিতের নাম পর্যন্ত জানা ছিলনা আমাদের। ফলে বিভিন্ন সংখ্যা অনুমান করে হিসেব করে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে বের করেছিলাম সেই উত্তর। অন্য রকম সফলতার আনন্দ উপভোগ্য ছিল। এসব কাজগুলো একাডেমিক পদ্ধতির পাশে অপ্রয়োজনীয় এবং বেমানান মনে হতে পারে। কিন্তু এগেুলোই আমার এবং অনেকের গণিতের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। আমরা সে সময়ে অন্য গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতাম কিনা মনে পড়ে না, বাড়ির কাজে ততোটা মনোযোগী ছিলাম বলেও মনে পড়ছে না। কিন্তু গণিতের ব্যাপারে উৎসাহ পেয়েছি এবং গণিত ভীতিও কেটেছে এবং সেই ভিত্তিমূলের উপরেই দাঁড়ানো আছে পরবর্তীতে গণিত সহ সকল বিষয়ের আত্ম বিশ্বাস।

কিন্তু বাস্তব ও নিষ্ঠুর সত্য হলো পরবর্তিতে সেই পাটিগণিতের বৈচিত্র মুছে ফেলা হলো। কিন্তু আমাদের শিক্ষা কমিশনগুলো সবসময়ই প্রস্তাব করেছেন বাস্তব ও জীবনমুখী শিক্ষার কথা। মূর্ত থেকে বিমূর্ত, জানা থেকে অজানা ইত্যাদি পদ্ধতিকে উৎসাহিত করে থাকে। এ পদ্ধতিতে চিন্তার গভীরে প্রবেশ অনেকটা সহজ বৈকি! এর উত্তরে আজ হয়তো কেউ বলতে পারেন, শিক্ষক চাইলে আজও তেমন কর্মকাণ্ড করতে পারেন, কেউতো আর নিষেধ করছে না। নিষেধ করছেন না ঠিকই, কিন্তু এ ধরনের চর্চার অভাব হলে সেরকম শিক্ষক তৈরি প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যাবে। এখন শিক্ষক অনেক জানেন, ভালো পাঠদানও করেন। কিন্তু মনে হয় আমরা পুরো জাতিই আজ শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি।

আমরা বিভিন্ন প্রসঙ্গে অতীতকে মনে না রাখবার জন্য আফসোস করে কথা বলে থাকি। আমরা জানি যে,অতীতই হচ্ছে অভিজ্ঞতা আর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। তাহলে অতীতের অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে সম্ভাবনাকে কেন আমন্ত্রণ জানাবো না। ভবিষ্যৎকে আমরা অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করি না।ভবিষ্যৎকে দেখতেও পাই না। সমুখে আগাই অতীতের আলোতে। কবিগুরু বলেছেন-

পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়
ও সেই চোখের দেখা প্রাণের কথা সে কি ভোলা যায়
আয় আর একটি বার আয়রে সখা প্রাণের মাঝে আয়---

সর্বোপরি,যেখানে পাটিগণিত প্রাচীন এবং জীবনঘনিষ্ট একটি নিশ্চিত জ্ঞান শাখা, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের লোকায়ত কৃষ্টি,চিন্তাশক্তি বৃদ্ধির উপকরণ,সৃজনী ক্ষমতার উৎস,গাণিতিক বিনোদন, সেখানে এর মানোন্নয়ন না ঘটিয়ে কোন যুক্তিতে এটি সংকুচিত কিংবা বাতিল করা হলো ঠিক বোধগম্য নয়। পাটিগণিত চর্চায় চিন্তাশক্তির যে সম্প্রসার ঘটে, তা যাপিত জীবনের সকল ক্ষেত্রেই কাজে আসে । তাই শিক্ষার্থীরা চিন্তা প্রক্রিয়ার ভেতরে যে বয়সে কেবল প্রবেশ করতে শুরু করে, বিশেষ করে নবম শ্রেণিতে, সেখান থেকেই পাটিগণিত বাদ দেয়া হলো! বলছি না যে পাটিগণিত একবোরেই বাদ দেয়া হয়েছে।তবে নবম শ্রেণিতে বিস্তৃত আকারে পাটিগণিত থাকা দরকার।

শুনেছি নতুনভাবে পাঠ্য পুস্তক রচিত হতে যাচ্ছে। যদি কারো নজর কাড়ে, আবার নতুনভাবে বিবেচিত হয় পুরোনো সেই দিনের কথা, সে প্রত্যাশায় এই নিবেদন।

লেখক- মো. নিজাম উদ্দীন : শিক্ষক, প্রাথমিক বিদ্যালয়, টঙ্গী, গাজীপুর।
ইমেইল : [email protected]

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads