আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলামের প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

সুজন হাজং

বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম
বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ২০ নভেম্বর ২০২০, ১৫:২২

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বপ্নদ্রষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের প্রয়াণ দিবস আজ। ২০১১ সালে তিনি লিকুমিয়া ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তাঁর ছোটবোন সুফিয়া আক্তার রীনার বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে তিনি দু'বছর বেঁচেছিলেন। ২০১৩ সালে এই দিনে (২০ নভেম্বর) কানাডার ভ্যাঙ্কুভার জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। কানাডা সুবিশাল ব্রাইডাল জলপ্রপাতের বিস্তীর্ণ পাহাড়ের চূঁড়ায় তাকে সমাহিত করা হয়।

কানাডা প্রবাসী বাঙালি রফিকুল ইসলাম ১৯৯৮ সালে ৯ জানুয়ারি জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি লিখেন ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়ে। চিঠিতে আমাদের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ভাষা শহীদদের গৌরবোজ্জ্বল আত্মত্যাগের মহিমা তুলে ধরেন রফিকুল ইসলাম।

১৯৯৮ সালে ২৩ জানুয়ারি সেই চিঠির উত্তরে জাতিসংঘে মহাসচিব কফি আনান লিখেন এটি ব্যক্তিগত প্রস্তাবে হবে না। তিনি যেন এটি তাঁর নিজ সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রস্তাবটি জাতিসংঘে প্রেরণ করেন। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যারা আত্মহুতি দিয়েছেন তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে রফিকুল ইসলামের এই মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান।

চিঠির ইতিবাচক উত্তর পেয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন রফিকুল ইসলাম। বিশ্বব্যাপী সকল মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াই করতে একটি প্লাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন রফিকুল ইসলাম। যার প্রেক্ষিতে রফিকুল ইসলাম তাঁর আরেকজন ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলী বন্ধু কানাডা প্রবাসী বাঙালি আবদুস সালামকে নিয়ে ভ্যাঙ্কুভারে বসবাসরত ৭টি ভাষার ১০ জনকে নিয়ে গঠন করেন "দি মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দি ওয়ার্ল্ড সোসাইটি'' নামে একটি মাল্টিলিঙ্গুয়াল সংগঠন।

১৯৯৮ সালে ২৯ মার্চ এই সংগঠনের ১০ জন সদস্যের স্বাক্ষর সম্বলিত একই আবেদন আবারও জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনানের কাছে প্রেরণ করেন ৭টি ভাষাভাষী ১০ জন। তাদের মধ্যে ফিলিপিনো ভাষার দুজন আলবার্ট ভিনজুন ও কারমেন ক্রিষ্টোবাল, ইংরেজি ভাষার দুজন জেসন মরিন ও সুজান হডজিনস, কেন্টনিজ ভাষার একজন, ডা.কেলভিন চাও। কাঁটি ভাষার একজন নাজনীন ইসলাম, জার্মান ভাষার একজন রেনেটা মার্টিনস, মাতৃভাষা হিন্দি একজন করুণা জুসি এবং বাংলা ভাষার দুজন রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম।

আবেদনের একটি কপি জাতিসংঘে কানাডার অ্যাম্বাসেডর এবং স্থায়ী প্রতিনিধি ডেভিড ফাওলারকে প্রেরণ করেন এবং তাকে অনুরোধ করা হল তিনি যেন‌ প্রস্তাবটি যথাযথভাবে জাতিসংঘে উত্থাপনে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অ্যাম্বাসেডর বিষয়টি অনুমোদনের জন্য পাঠালেন কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সংগঠনের পক্ষে কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ করেন রফিকুল ইসলাম।

১৯৯৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে আবারো রফিকুল ইসলাম টেলিফোনে যোগাযোগ করলেন জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের দপ্তরে অফিসার ইনচার্জ পাবলিক ইনকুয়ারিজ ডিপার্টমেন্টের হাসান ফেরদৌসের সাথে। তিনি তাকে কার্যকর পরামর্শ দিলেন। তিনি রফিকুল ইসলামকে বললেন, এরকম বিষয় বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার উপযুক্ত ফোরাম হচ্ছে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো। ইউনেস্কো বৈচিত্রময় ভাষা, সংস্কৃতি রক্ষা, উন্নয়ন ও বিভিন্ন ভাষার শিক্ষা কার্যক্রমের উপর কাজ করে থাকে।

হাসান ফেরদৌস ইউনেস্কোর ল্যাঙ্গুয়েজ ডিভিশনের ডাইরেক্টর জোসেফপদ-এর ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর দিয়ে রফিকুল ইসলামকে ইউনেস্কোতে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি টেলিফোনে ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের ডাইরেক্টর জোসেফ পদের সাথে রফিকুল ইসলাম কথা বললে তিনি তাদের প্রস্তাবটি ইউনেস্কো সদর দপ্তরে কর্মরত প্রোগ্রাম স্পেশালিষ্ট আন্নামারিয়া মাজলফের কাছে প্রেরণ করতে বলেন। রফিকুল ইসলাম সেদিনই আন্নামারিয়া বরাবর ফ্যাক্সের মাধ্যমে প্রস্তাবটি পাঠান। প্রস্তাবটি ইউনেস্কোর ১৫৭তম অধিবেশনে পেশ করা হবে।

আন্না মারিয়া রফিকুল ইসলামকে ৫টি দেশের ন্যাশনাল কমিশনের ঠিকানা দিয়ে তাদের যে কোন একটি দেশের পক্ষ থেকে ইউনেস্কোতে প্রস্তাবটি আবার পাঠাতে পরামর্শ দিলেন। দেশগুলো হল বাংলাদেশ, ভারত, কানাডা, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড।

রফিকুল ইসলাম ৫টি দেশেরই ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোকে অনুরোধপত্র প্রেরণ করেন তারা যেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার জন্য ইউনেস্কো হেডকোয়ার্টার ১০ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ তারিখের মধ্যে একটি অনুষ্ঠানিক প্রস্তাব প্রেরণ করেন।

২৩ জুন ১৯৯৯ রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর সেক্রেটারি জেনারেল (শিক্ষা সচিব) রকিব উদ্দিন আহমদকে আমাদের মহান ভাষা শহীদ দিবস ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে পাঠানোর অনুরোধ করেন। সাথে সংযুক্ত ‌দেন জাতিসংঘ ও ইউনেস্কোর হেডকোয়ার্টারের চিঠিসমূহ।

৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে রফিকুল ইসলাম ফোন করলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেন এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যলয় থেকে বলা হয় এ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে আছেন। রফিকুল ইসলাম সংসদে ফোন‌ করলেন সেখান থেকে বলা হয় এ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী হাউজে আছেন। তিনি ফোন‌ করলেন শিক্ষা সচিবকে। তারাও তখন জাতীয় সংসদে। এবার ফোন করলেন বিএনসিইউর সচিব প্রফেসর কফিল উদ্দিনকে। কফিল উদ্দিন বললেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সময়ের স্বল্পতা জানতে পেরে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিয়েছেন অফিশিয়াল ফর্মালিটিস পরে হবে আমার স্বাক্ষর পরে নিয়ে নেবেন প্রস্তাবটি আজই পাঠিয়ে দিন। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে প্রফেসর কফিল উদ্দিনের স্বাক্ষরিত একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি ফ্যাক্সের মাধ্যমে ইউনেস্কোর হেডকোয়ার্টারে প্রেরণ করেন।

১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ ইউনেস্কো সদস্যভুক্ত ১৮৮টি দেশের স্বত:স্ফূর্ত সমর্থনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেন। ২০০০ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন সিদ্ধান্ত নেন ইউনেস্কো হেড কোয়ার্টার,প্যারিস। সেখানে রফিকুল ইসলামকে আমন্ত্রণ করেন প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ইউনেস্কোতে উদযাপনের জন্য। রফিকুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী বুলি ইসলামসহ প্যারিসে বাংলাদেশ মিশন এবং ইউনেস্কো গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্যারিসে উদযাপন করেন। সেখানে রাষ্ট্রদূত ও ইউনেস্কোর স্থায়ী প্রতিনিধি সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী তাঁর লিখিত ভাষণে উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার উদ্যোক্তা কানাডার মাল্টিলিঙ্গুয়াল গ্রুপ "দি মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দি ওয়ার্ল্ড সোসাইটি" নামে পরিচিত যার প্রেসিডেন্ট রফিকুল ইসলাম আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত আছেন।

২০০১ সালে দি মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দি ওয়ার্ল্ড সোসাইটিকে ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণায় অনন্য অবদানে স্বীকৃতি স্বরূপ একুশে পদকে ভূষিত করেন এবং ২০১৬ সালে রফিকুল ইসলামকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক এবং আবদুস সালামকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম ১৯৫৩ সালে ১৬ জুলাই কুমিল্লা শহরে গণিলজ রাজবাড়ী কম্পাউন্ডে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রফিকুল ইসলাম কুমিল্লা হাই স্কুল থেকে এসএসসি, ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিভাগে মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে ভারতের মিলিটারি একাডেমি দেরাদুনে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সাল থেকে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ইমিগ্রেন হিসেবে বসবাস শুরু করেন রফিকুল ইসলামের পরিবার স্ত্রী বুলি ইসলাম এবং তার দুই ছেলে‌ জ্যোতি ইসলাম এবং জয়ন্ত ইসলাম।

মাতৃভাষাপ্রেমিক রফিকুল ইসলাম আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াই করতে হয়। কিভাবে বিশ্বের দরবারে নিজস্ব ভাষাকে তুলে ধরতে হয়, কিভাবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

লেখক- সুজন হাজং : সাংগঠনিক সম্পাদক, দি মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দি ওয়ার্ল্ড সোসাইটি, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads