পাটশিল্প ও আগামীর সম্ভাবনা


poisha bazar

  • মো. ফুয়াদ হাসান
  • ২০ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৩৩

সোনার বাংলার সোনালি আঁশ। আবহমানকাল থেকে বাংলার পথঘাট, গ্রাম-গঞ্জ, কৃষক-মজুরের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে আছে পাট। আর এই পাটকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল শিল্প করারখানাসহ আধুনিকতার নতুন দ্বার। আমাদের সোনালি আঁশের পিছনে রয়েছে এক উজ্জ্বল সোনালি যুগ। এক সময়ের আদমজী পাটকল ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাটকল। আমাদের অর্থনীতিতেও এর অবদান কম নয়।

এক সময় পাটই ছিল আমাদের অর্থনীতির ধারক-বাহক। শুধু তাই নয়, এক সময় পাটই বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশকে পরিচয় করে দিয়েছিল, এখনো তার গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি। বাংলার কৃষকদের হাসি-কান্না, আবেগ-অনুভ‚তির সঙ্গী পাট শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে কিছু বেদনাদায়ক ইতিহাস, যা কারোর অজানা নয়।

আমাদের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের চালিকা শক্তি হলেও নানা কারণেই অবহেলিত হয়ে পিছিয়ে পড়েছে পাঠ শিল্প। তবে আশার কথা এই যে, কৃত্রিম তন্তু, প্লাস্টিক আর পলিথিনের আধুনিক এই যুগে পাটজাত পণ্যের চাহিদা কিছু মাত্র কমেনি বরং নানাভাবেই এর চাহিদা বৃদ্ধি হচ্ছে। সরকারি কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে পাটচাষির সংখ্যা ৪০ লাখ। দেশের জিডিপিতে পাট খাতের অবদান দশমিক ২৬ শতাংশ ও কৃষি জিডিপিতে ১ দশমিক ৪ শতাংশ অবদান রাখছে এই খাত।

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, দেশে সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে পাটচাষ হয়, যা থেকে কম বেশি ৮০ লাখ বেল পাট উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে পাটচাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ৭৪ দশমিক ৪০ লাখ টন। দেশের মোট রফতানি আয়ের শতকরা ৩-৪ ভাগ আসে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে।

বাংলাদেশ বিশ্বের মোট পাটের ৩৩ শতাংশ উৎপাদন করে এবং কাঁচা পাটের ৯০ শতাংশ রফতানি করে। করোনার মাহামারীর ফলে দেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রা হুমকির মুখে পড়ে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখাদেয় কর্মসংস্থান ঘাটতি, ক্রমাগত কর্মঠ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় দেশের বেকারত্বের হার ফেঁপে ওঠে। এমনিতেই আমরা উচ্চ বেকারত্বের দেশ করোনা ভাইরাসের প্রভাবে যা আরো ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। এই দূর সময়েই গত জুলাই মাসে সরকার বিজেএমসির আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকলে উৎপাদন বন্ধ করে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে অবসরে পাঠায়, যা দেশের বেকারত্ব সমস্যা ও পাট-শিল্পের জন্য ছিল চরম বেদনাদায়ক।

২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম দু মাস জুলাই-আগস্টে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানি করে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার আয় করে বাংলাদেশ। এই সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমত্রার চেয়ে প্রায় ১ শতাংশের মতো বেশি। গত অর্থবছরে ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করে চামড়া খাতকে পিছনে ফেলে তৈরি পোশাক শিল্পের পরের স্থান দখল করে নেয় পাট খাত।

এদিকে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বিভিন্ন পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ ৬৮৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার আয় করেছে। এর মধ্যে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার এসেছে পাট ও পাট পণ্য রফতানি থেকে। এই দুই মাসে পাটসুতা (জুট ইয়ার্ন) রফতানি হয়েছে ১৪ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারের; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৭ শতাংশ।

কাঁচাপাট রফতানি হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার; আয় বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রফতানি হয়েছে ২ কোটি ৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারের। আয় বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। পাট ও পাট সুতা দিয়ে হাতে তৈরি বিভিন্ন পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ২২ লাখ ৩০ হাজার ডলার; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। এছাড়া পাটের তৈরি অন্যান্য পণ্য রফতানি হয়েছে ১ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার ডলারের।

গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ মোট ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার আয় করেছিল। ওই অঙ্ক ছিল আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি এসেছিল ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে পাটসুতা রফতানি থেকে ৫৬ কোটি ৪৬ লাখ ডলার আয় হয়েছিল। অর্থাৎ মোট রফতানি ৬৪ শতাংশই এসেছিল পাটসুতা রফতানি থেকে। কাঁচাপাট রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ১৩ কোটি ডলার। পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রফতানি হয়েছিল ১০ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের। এছাড়া পাটের তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য রফতানি হয়েছিল ১৯ কোটি ডলারের।

অতীতে বাংলাদেশের কাঁচাপাট ছিল বিশ্বের কাছে সর্বাধিক সমাদৃত। আমাদের উৎপাদিত কাঁচাপাট প্রধানত ভারত, পাকিস্তান, চীন, ই্উরোপ, আইভোরিকোস্ট, থাইল্যান্ডের বাজারে রফতানি করা হয়। পাট অধিদফতরের তথ্য বলছে, বর্তমানে কাঁচাপাট নয়, বরং পাট খাত থেকে রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে পাটজাত পণ্য থেকে যা ইউরোপ, তুরস্ক, ইরান, আমেরিকা, সিরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি-আরব, জাপান, সুদান, ঘানাসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করে।

বিশ্বের প্রতি বছর ১ ট্রিলিয়ন পলিথিন ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে ফলে পরিবেশ দূষণ রোধে আবারাও পচনশীল পরিবেশবান্ধব পাটের চাহিদা বাড়ছে বিশ্ব বাজারে। পাট এমন একটি ফসল যার কোন অংশ মূল্যহীন নয়। পাটপাতা থেকে শুরু করে পাটকাঠির ছাই সবকিছুই বহুবিদ ও মূল্যবান ব্যবহারযোগ্য।

পাটের আঁশ থেকে তৈরি করা হয় ভিসকস সুতা, যা দ্বারা তৈরি হয় দামি ও আরামদায়ক পোশাক। পাটের আঁশ থেকে তৈরি হচ্ছে শাড়ি, লুঙ্গি, সালোয়ার, কামিজ, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, খলনা, শোপিস, ওয়ালেট, আলপনা, নকশিকাঁথা, পাপোশ, জুতা, স্যান্ডেল, শিকা, দড়ি, সুতলি, পর্দার কাপড়, গহনা অলংকারসহ নানা ধরনের পণ্য। তাছাড়া পাট থেকে তৈরি করা হয় বাহারি ডিজাইনের ও আধুনিক ব্যাগ, যা বিশ্ববাজারে ভোক্তা নন্দিত। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে।

বাঁধ নির্মাণ, ভ‚মিক্ষয় রোধ, পাহাড়ধস রোধে ব্যবহৃত হয় পাট থেকে তৈরি জুট জিওটেক্সটাইল। বিশ্বের অনেক দেশে গাড়ি নির্মাণ, কম্পিউটারের বডি, উড়োজাহাজের পার্টস তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বাংলাদেশে উৎপাদিত উন্নত পাট। এছাড়া ও ইনস্যুলেশন, ইলেকট্রনিক্স, মেরিন ও স্পোর্টস শিল্পে বিশ্বে বেশ পরিচিত আমাদেশের উৎপাদিত পাট। পাটকাঠি থেকে তৈরি হয় উন্নতমানের অ্যাকটিভেটেড চারকোল বা ছাই, যা থেকে তৈরি হচ্ছে কার্বন পেপার, আতশবাতি, কম্পিউটার ও ফটোকপির কালি, মোবাইল ফোনের ব্যাটারি, ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্ল্যান্ট ও বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী। পাটের চারকোল বা ছাই রফতানি হচ্ছে চীন, তাইওয়ান, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে।

এছাড়া মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে আমাদের চারকোলের বড় বাজার রয়েছে। পাটপাতা শাক ও অর্গানিক চা হিসেবে খাওয়া যায়, যা সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন। মহামারী করোনার প্রভাবে যখন সকল পণ্যের রফতানি নিম্নমুখী ঠিক তখন পাটজাত পণ্যের রফতানিতে আশার আলো।

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সবশেষ তথ্য বলছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বাংলাদেশ ৪৩ দশমিক ৮৭ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করেছে। এই সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৯ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি।

আর তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি( সূত্র : বণিক বার্তা ৩/১১/২০২০)। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, গ্রামীণ অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাট খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাছাড়া পাট আমাদের এক অহংকার ও ঐতিহ্যের নাম। পাট খাতের সাথে জড়িয়ে আছে বিপুল সংখ্যক মানুষ, যা আমাদের মতো উচ্চ বেকারত্বের দেশের জন্য সুখকর। বর্তমানে বিশ্ববাজারে পাটের বহুবিধ চাহিদা, আমাদের আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে আমাদের সোনার বাংলা সোনালি আঁশ পাট চাষে যথেষ্ট উপযোগী ও সম্ভাবনাময়।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়






ads