সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার


poisha bazar

  • মো. মাসুদ রানা
  • ২০ নভেম্বর ২০২০, ০৯:২৬

ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ শিল্প হলো কৃষি। কৃষিই কৃষ্টি। কৃষি আমাদের সংস্কৃতির অনিবার্য অনুষঙ্গ। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ।

সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে দীর্ঘ পরিক্রমায় কৃষি বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। যার ফলশ্রুতিতে ক্রমাগত কৃষি জমি কমতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈরী প্রকৃতি সত্তে¡ও বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এজন্য তিনি কৃষি বিপণনের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন গ্রামীণ জনপদের দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে। কেননা গ্রামই সকল উন্নয়নের মূল কেন্দ্র। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যখন বেগবান হবে তখন সমগ্র এগিয়ে যাবে। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের কৃষি শিক্ষায় আকৃষ্ট করতে ও দেশে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদায় উন্নীত করেন।

আমাদের দেশের কৃষির মূল চালিকাশক্তি কৃষক। কৃষক সমাজ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সবার অন্নের জোগান দেয় এজন্য তারাই প্রকৃত নায়ক। গ্রামীণ কৃষক জনগোষ্ঠী অনেক অভিজ্ঞ ও দক্ষ। তাদের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাই তো তাদের ওপরে নতুন কিছু চাপিয়ে না দিয়ে তাদের হাতে কলমে দেখানোর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় খামারের উপাদানসমূহ যেমন- মাঠে বিভিন্ন ফসল চাষ, বসতবাড়িতে ফলমূল, শাকসবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন, গবাদি পশু পালন ও মাছ চাষ এবং কৃষিতে উদ্ভাবিত নিত্য নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশলের মাধ্যমে এদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন করা হয়ে থাকে।

গ্রুপ আপ্রোচের মাধ্যমে কো-অপারেটিভ সোসাইটি গড়ে তোলার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও সার্বিক উন্নয়ন দুটিই মাত্রা পাবে। আমরা জানি খাদ্য শুধু চাল, আটা নয়, বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং কৃষি খাতের সামগ্রিক উন্নতির জন্য এবং আপামর জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বাড়াতে হবে।

বর্তমান সময়ে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার (আইএফএম) মাধ্যমে কৃষক তার খামারের সম্পদসমূহ চিহ্নিত করে এদের আন্তঃসম্পর্ক বিবেচনায় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করেন। বর্তমানে কৃষিতে উদ্ভাবিত নতুন টেকসই প্রযুক্তি যেমন- বৈরী আবহাওয়া সহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল বিভিন্ন ফসলের জাত, সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা, জৈব সার ও সবুজ সার ব্যবহার, একই জমিতে একই সময়ে একাধিক ফসল উৎপাদন, উন্নত জাতের হাঁস, মুরগি, ছাগল পালন ও মাছ চাষের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে অধিক লাভবান হওয়া যায়।

কৃষিতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে মানুষ ও সামগ্রিক পরিবেশের ওপরে। যার ফলে পরিবেশ দূষণ বেড়েই চলেছে এবং মানুষ বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এজন্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব সার ও জৈব বালাই দমন ব্যবস্থাপনার সাহায্যে অর্গানিক ফার্মিং-এর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাই পরিশেষে বলতে চাই, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের আপামর জনগোষ্ঠী খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে সুখী ও সমৃদ্ধশালী স্বপ্নের সোনার বাংলা।

লেখক: লেকচারার, কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।






ads