তদন্ত ও বিচার বিলম্বনা: জনপ্রত্যাশা


poisha bazar

  • আবুজার গিফারী
  • ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৪৮,  আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২০, ২২:১৮

আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর বা সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো; আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শাসন বা নির্বাহী বিভাগ। সরকারের যে বিভাগ আইন প্রণয়ন, পুরাতন আইন সংশোধন ও পরিবর্তন করে তাকে আইন বিভাগ বলে। বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনসভার নাম ‘জাতীয় সংসদ’। অন্যদিকে সরকারের যে বিভাগ আইনানুযায়ী রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করে তাকে শাসন বিভাগ বলে। ব্যাপক অর্থে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে গ্রাম্য পুলিশ পর্যন্ত সকলেই শাসন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। আর বিচার বিভাগ বলতে বোঝায়; যে বিভাগ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিচার সংশ্লিষ্ট কাজের সাথে জড়িত।

তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেনরি সিজউইক বিচার বিভাগের সংজ্ঞায়নটা একটু ভিন্নভাবে দিয়েছেন। তাঁর মতে বিচার বিভাগ হলো ‘সেই বিভাগ যা আইনের ব্যাখ্যা করে এবং আইনের প্রয়োগ করে’। সুতরাং আইন বিভাগের কাজ হল নতুন আইন প্রণয়ন ও পুরাতন আইন সংশোধন করা। শাসন বিভাগের কাজ হল আইনানুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করা এবং বিচার বিভাগের মূল কাজ হল আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বিচারকার্য সম্পাদন করা।

বর্তমান আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন ইস্যু মিডিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে। আবার কিছু নতুন ইস্যু তৈরী হওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। যে ইস্যু পত্রিকার প্রথম পাতা জুড়ে ছিল, কয়েকদিনের ব্যবধানে তার স্থান পত্রিকার মাঝের বা শেষ পাতায়। সর্বোপরি, এক সময় ইস্যুগুলো আমাদের নজরের বাইরে চলে যায়। এ যেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার নতুন সংস্করণ ‘এসেছে নতুন ইস্যু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে চলে যেতে হবে পুরনো ইস্যুকে’।

বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের ১৯ সদস্যকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি ৩৪ বছর পর অর্থাৎ ২০১০ সালে বাস্তবায়িত হয়। ২০২০ সালের ৭ এপ্রিল ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল মাজেদকে গ্রেফতার করা হয় এবং ১২ এপ্রিল তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা গিয়েছে; বঙ্গবন্ধুর কয়েকজন খুনি আজও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে ১৪টি ঘটনায় মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তার মধ্যে কেবল চারটি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। ১৯৮৯ সালে ধানমণ্ডিতে হত্যা চেষ্টার রায় আসে ২০১৭ সালে। সময় লেগেছে ২৮ বছর। ১৯৯৪ সালে পাবনা ঈশ্বরদীতে হত্যা চেষ্টার মামলায় রায় আসে ২০১৯ সালে। সময় লেগেছে ২৫ বছর। ২০০১ সালে গোপালগঞ্জে হত্যা চেষ্টার মামলায় রায় আসে ২০১৭ সালে। সময় লেগেছে ১৬ বছর। সর্বশেষ ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে হত্যা চেষ্টার রায় আসে ২০১৮ সালে। সময় লেগেছে ১৪ বছর।

সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড যেটি ২০১২ সালের ১১ ফেব্রæয়ারি সংঘটিত হয়েছিলো। ৮ বছর অতিবাহিত হলেও মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি। কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যা মামলাটিরও ঢিমেতাল অবস্থা। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ গণধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার ৪ বছর পার হলেও এখনো মামলার রায় হয়নি। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নিখোঁজ হয় ত্বকী। নির্মমভাবে খুন হওয়ার দুদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর তীর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তারপর কেটে গেছে সাত বছর কিন্তু এখনো মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা।

বসুন্ধরা গ্রুপের পরিচালক হুমায়ুন কবীর সাব্বির ২০০৬ সালের ৪ জুলাই গুলশানের একটি বাড়িতে খুন হয়। কেটে গেছে ১৪ বছর নিষ্পত্তি তো হয়নি বরং বিভিন্ন মহল থেকে মামলাটি ধামাচাপা দেয়ার জন্য কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সুষ্ঠু বিচারের জন্য আজও প্রহর গুনছেন তার স্বজনেরা।

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ঈদ পরবর্তী জনসভায় গ্রেনেড হামলায় নিহত হন কিবরিয়াসহ পাঁচজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও আহত হন অন্তত ৭০ জন। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ। দীর্ঘ ১৬ বছর কেটে গেছে তবুও বিচার নিষ্পত্তি হয়নি।

শুধু এখানেই শেষ নয় বরং কিছু মামলার রায় হয়ে গেলেও আসামি পক্ষ আপিল করায় আপিল পর্যায়ে আটকে আছে সহস্রাধিক মামলা।

যেমন; ফেনীর মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা, নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন মামলা, গাজীপুরের আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলা, বরগুনায় আলোচিত রিফাত হত্যা মামলার রায় হয়েছে কিন্তু ৪টি মামলায় বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এসব মামলার ফরিয়াদি পক্ষরা আপিল বিভাগের রায়ের আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।

বিচার বিভাগের কাজ দেশের আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র বিচার করা। বিচার বিভাগের কাজকে সহজ করার জন্য বাংলাদেশ পুলিশ ঢের কাজ করেন। অপরাধের সমস্ত তদন্তই সাধারণত পুলিশ করে থাকেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতকে ফাইনাল রিপোর্ট বা চার্জশিট দিয়ে থাকেন। অপরাধের অস্তিত্ব খুঁজে না পেলে ফাইনাল রিপোর্ট দেন। যেমন; অভিযুক্ত ব্যক্তির নামে যে অভিযোগটি উঠেছে সেটির কোনো যৌক্তিকতা নেই এ মর্মে রিপোর্ট।

অন্যদিকে অপরাধের অস্তিত্ব খুঁজে পেলে পুলিশ আদালতের সামনে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। যেমন; অভিযুক্ত ব্যক্তির নামে যে অভিযোগটি উঠেছে সেটি সত্য এ মর্মে রিপোর্ট। এই চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই বিচারকরা সাধারণত বিচার করে থাকেন। সুতরাং চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্টটি অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে নতুবা বিচারিক ত্রæটি পরিলক্ষিত হবে। যেটা এ দেশের কোনো নাগরিকই আশা করে না।

তবে বর্তমান সময়ে সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, পুলিশ এ দুটি তথ্য দিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যায়ের আশ্রয় নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় একটি ভুল তদন্তের জন্য নিরপরাধ মানুষকে বছরের পর বছর জেলে কাটাতে হচ্ছে। সম্প্রতি জাহালম তার জ্বলন্ত উদহারণ।
বিচার বিভাগ ১৮ কোটি মানুষের কাছে একটি পবিত্র জায়গা ও বিচার প্রার্থনার শেষ আশ্রয়স্থল।

বাংলাদেশ সংবিধানে দুইটি অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৯৪(৪) এ বলা হয়েছে ‘এই সংবিধানের বিধানবলীর-সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে’। অনুচ্ছেদ ১১৬ক-তে বলা হয়েছে; ’এই সংবিধানের বিধানবলী সাপেক্ষে বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ এবং ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে’। সুতরাং আমরা বলতে পারি আমাদের বিচার বিভাগের সম্মানিত বিচারকর্মলী বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তবে বিচার বিভাগের কাছে কিছু আক্ষেপ সাধারণ জনগণ মণিকুঠরে বিঁধে রেখেছে।

যেমন; আজ বিচারের দাবি নিয়ে বা অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতকরণে সাধারণ জনগণকে একের পর এক রাস্তায় নামতে দেখা যাচ্ছে। কোনো সময় ধর্ষকের ফাঁসি চাই ব্যানারে, খুনির শাস্তি নিশ্চিতকরণ ব্যানারে বা কোনো সময় নিরাপদ সড়ক চাই ব্যানারে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামলে তাদের বিভিন্ন রকমের আশ্বাস দিয়ে ঘরে ফেরানো হয়। কিন্তু সে আইনগুলো আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

সম্প্রতি নোয়াখালীতে এক মহিলার বিবস্ত্রের দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়ার পরেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পদক্ষেপ নেন। জনগণ এটা চায় না বরং তারা দেখতে চায় অপরাধ সংঘটনের আগেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজের তৎপরতা।

আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। আজ কেনো বিচারের দাবিতে জনগণকে রাস্তায় নামতে হচ্ছে? যেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমনের জন্য সুশৃঙ্খল পুলিশ বাহিনী রয়েছে, স্বাধীন বিচার বিভাগ রয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা, অপরাধ সংঘটনের সাথে সাথেই অপরাধীকে গ্রেফতার করে পুলিশ তাকে আইনের আওতায় আনবেন।

অতঃপর বিচার বিভাগ অনতিবিলম্বে বিচার কাজ শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত করবেন। আমরা দেখেছি, প্রশাসন যদি চায় তাহলে যে কোনো ঘটনার বিচার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারেন। যেমন; বাগেরহাটের মোংলায় আশ্রয়ন প্রকল্প এলাকায় পিতৃহীন সাত বছর বয়সী এক শিশু ধর্ষণের অভিযোগে আসামি আব্দুল মান্নান সরদারকে সাত কার্যদিবসে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত।

আইন ও শাসন বিভাগ যেন বিচার বিভাগের উপর হস্তক্ষেপ না করতে পারে তথা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে ২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করা হয়েছে। বর্তমান সংবিধানের ২২ নং অনুচ্ছেদে সেটি সন্নিবেশিত হয়েছে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ অর্থাৎ বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার না হওয়া। আমরা দেখেছি বিচার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে এক সময় ফরিয়াদি বা আসামি মারা যান। এমনকি সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া যায় না, তদন্তকারী কর্মকর্তাও অনেক সময় থাকেন না বা অনেকে অবসরে চলে যান।

এভাবেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার। ফলে সৃষ্টি হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আজ সাধারণ জনগণের বিচার বিভাগের কাছে প্রত্যাশা হলো; দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, বিচারের ক্ষেত্রে দলমত বিচার না করে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণ, রায় যথাসময়ে কার্যকর, মামলা জট কমিয়ে জনগণের অর্থ ও সময় সাশ্রয় করা। সর্বোপরি একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মানবকণ্ঠ/এসকে






ads