বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা


poisha bazar

  • মো. তাসনিম হাসান আবির
  • ১৯ অক্টোবর ২০২০, ১০:৫৩

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের মাধ্যমে জন্ম লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আজকের এই বাংলাদেশ।

২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি পালন করব। এই ৪৯টি বছর খুব সহজে অতিবাহিত হয়নি। অনেক বাধা, বিপত্তি, দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে মহান বাঙালি জাতিকে। কিন্তু স্বাধীনতার এই এত বছরে এসে আমরা জাতি হিসেবে আসলে কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি? সবার মনেই এই প্রশ্ন জাগে।

এত ত্যাগের এই বাংলাদেশ আসলে কেমন চলছে! এসব খুঁজতে গেলে আমাদের বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। বর্তমানকে দিয়ে আমরা অতীত মূল্যায়ন করব এবং ভবিষ্যৎ ভাবনা ঠিক করব। এক, স্বাধীনতার এই এত বছরে এসে এদেশের দুর্নীতির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু আমরা লক্ষ করছি যে, বর্তমানে দুর্নীতি মহামারী আকারে আমাদের দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। প্রতিটি জায়গায় দুর্নীতি কালো থাবা বসিয়েছে। আজকাল যেকোনো একটি কাজ সুষ্ঠু পথে সমাধান করা যেন আকাশকুসুম ভাবনা হয়ে গেছে। বর্তমান করোনা মহামারীতে সবথেকে দুর্নীতিগ্রস্ত খাতটি হচ্ছে স্বাস্থ্য খাত।

এই খাতের একেবারে ছোট পর্যায় থেকে শুরু করে রাঘববোয়াল পর্যন্ত তারা দুর্নীতি করছে। মানবিকতাকে তারা বিক্রি করে দিয়েছে। সাহেদ, সাবরিনা, ড্রাইভার মালেক এটার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একজন ড্রাইভার হয়ে তার সম্পদ আকাশসম। এরা তো শুধু ধরা পড়েছে। কিন্তু এমন আরো অনেক দুর্নীতিবাজ অধরাই রয়ে গেছে।

এর আগেও মেডিকেলে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার দুর্নীতি দেশবাসী দেখেছে। বালিশকাণ্ড আমরা দেখেছি। পত্র পত্রিকা খুললেই আজকাল শুধু দুর্নীতির খবর। বলা হচ্ছে, এই করোনার থেকেও দুর্নীতিটা এদেশে ভয়াবহ মহামারী হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। মূল্যবোধ, নৈতিকতা যদি জাগ্রত না হয় তবে আইন করেও দুর্নীতি রোধ সম্ভব নয়।

দেশের আদালতের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে- বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনেক ভালো কাজ করছে। নিয়মিতই তারা দুর্নীতিবাজদের ধরছে এবং আদালতেই দ্রুত বিচার হচ্ছে।

যার উদাহরণ সাহেদের মামলার রায় অতি দ্রুত হওয়া। তবে জাতি হিসেবে আমরা যদি একটি উন্নত ধারণা পোষণ না করি, সভ্যতাকে নিজের হৃদয়ে প্রতিস্থাপন না করি তবে এই দুর্নীতি খুব সহজে আমাদের থেকে যাবে না। আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী এই অভিযান আরো কঠোরভাবে চলমান রাখতে হবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে উদযাপন করব, এমনটাই সকলের প্রত্যাশা হওয়া উচিত।

দুই. ধর্ষণ, গুম, খুন, হত্যার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। ইদানীং পত্রিকার পাতা খুললেই ধর্ষণের সংবাদ পাওয়া যায়। শিশু থেকে বৃদ্ধা, তরুণী থেকে মহিলা কেউই নিস্তার পাচ্ছে না এই নরপিশাচদের হাত থেকে। স্বাধীনতার এই এত বছরে এসে নারীর প্রতি এই সহিংসতা কখনো মেনে নেয়া যায় না।

ধর্ষণের বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্য এটা আরো বেড়ে গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিছু মানুষরূপী পশু এসব জঘন্য কাজ করছে। স্বাধীন বাংলাদেশে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড রেখে আইন মন্ত্রিসভায় পাস করেছে।

রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৩ অক্টোবর থেকে এই আইন কার্যকর হয়েছে। আশাকরি এখন অন্তত ধর্ষণের পরিমাণটা কমবে। তবে ধর্ষণের মামলার বিচারগুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন আইনে এই মামলাগুলো ৬ মাসের মধ্যে বিচারের বিধান রাখা হয়েছে।

এছাড়াও গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাও অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেটা কখনোই কাম্য নয়। এই অবস্থার থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যার পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। নয়তো দেশে কোনো মানুষই প্রকৃতঅর্থে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারবে না।

তিন. বেকার সমস্যা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাধীনতার ৪৯ বছরে এসে আমাদের দেশের আরো উন্নত হওয়ার কথা ছিল। বেকার সদস্যের সংখ্যা হাতেগোনা থাকা উচিত ছিল। কারণ আমরা অনেকটা সময় পেয়েছি, সঠিকভাবে সবকিছুর ব্যবহার করলে আজকে তরুণদের এই হাহাকার শুনতে হতো না।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাস্টার্স পাস করে বেকার হয়ে বসে আছে। তাদের জন্য তাদের পরিবারও কষ্টে আছে। নিয়মিত আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। এই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে হবে। দেশে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বিভিন্ন পেশার দ্বার উন্মুক্ত করতে হবে।

কোনো পেশাকে ছোট হিসেবে দেখা যাবে না। আমাদের সমাজে এই পেশা বৈষম্য প্রকট। যার ফলে আত্মমর্যাদায় তথাকথিত ভালো চাকরির আশায় তরুণেরা বসে আছে। আর বেকার সমস্যা বাড়ছে। অনলাইনে ফ্রি-ল্যান্সির এর কাজ বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়।

অনেক তরুণরাই এদিকে এখন আসছে। এটাও একটি সম্ভাবনাময় কর্মক্ষেত্র। প্রধানমন্ত্রীও এটাকে পেশা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন। তাই ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্রটিকে আরো উন্নত করার দরকার আছে। তাছাড়াও কারিগরি শিক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।

চার. বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের আমলে প্রচুর উন্নয়নকাজ হচ্ছে। হয়তো এটা আরো অনেক আগেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্রমাগত সরকার পরিবর্তনের ফলে এদেশে তেমন দৃশ্যমান উন্নয়ন আগে হয়নি। তবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার টানা তিনবার ক্ষমতায় থেকে অনেক কাজ করছে।

পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী ট্যানেল, অসংখ্য ফ্লাইওভার, অবকাঠামো, রাস্তার সংস্কার, নতুন রাস্তার কাজসহ আরো অনেক উন্নয়ন চলছে। বর্তমানে এদেশে অনেক বিনিয়োগও আসছে। চীন, জাপান প্রচুর উন্নয়ন কাজের অংশীদার হচ্ছে। এটা অবশ্যই আশার খবর।

একটি দেশে যত বেশি উন্নয়ন কাজ হবে, তত সে দেশের জীবনমান বৃদ্ধি পাবে। আর উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতাও অনেক জরুরি। তাই বর্তমান বাংলাদেশে যে উন্নয়নের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, এটা যদি অব্যাহত থাকে তবে খুব শিগগিরই আমরা উন্নত দেশের মর্যাদা পাব।

পাঁচ. রোহিঙ্গা সমস্যা। বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা। মিয়ানমার থেকে অত্যাচারিত হয়ে প্রায় ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমান সরকার মানবিকতার দিকটি বিবেচনা করে তখন বর্ডার খুলে দিয়েছিল।

তখন বিশ্ব বলেছিল তারা যত দ্রুত সম্ভব মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন করাবে। কিন্তু আমরা সেটার বাস্তবিক কোনো দৃষ্টান্ত দেখতে পারছি না। বরং দিনকে দিন এই সমস্যা আরো জটিল হচ্ছে। কারণ রোহিঙ্গারা ক্রমাগত বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে।

সেখানে নিয়মিত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চলছে। বাংলাদেশের ভুয়া পরিচয়পত্র বানানোর মতো গুরুতর অপরাধও তারা করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর মতো ঘটনা ঘটছে। আবার বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তাই অতি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।

মিয়ানমার সরকারের খামখেয়ালির জন্য এটা সম্ভব হচ্ছে না। সুচি সরকার নিয়মিতই টালবাহানা করছে। গণতান্ত্রিক নেত্রীর পরিচয় পাওয়া সুচি এখন সে দেশের স্বৈরতন্ত্রী সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল। তাই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা, ধর্ষণের মতো ঘটনাকে ঢাকতেই তারা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করছে না। জাতিসংঘকে এ বিষয়ে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ক‚টনৈতিকভাবে যদি সমাধান না হয় তবে নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এখন সময় সামনের দিকে এগোনোর। ভবিষ্যৎকে কিভাবে আরো নিরাপদ করা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার। ২০২১ সালে অর্থাৎ পরের বছর আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। নানা চড়াই উতরাই পার করে বীরের জাতি বাঙালি তাদের স্বাধীন বাংলার ৫০ বছর পূর্তি পালন করবে।

এ সময়ে আমাদের অতীতের সমস্ত ভুলকে শুধরে নিয়ে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা করতে হবে। আর অতীতের সোনালি অর্জনগুলোকে আমাদের অনুপ্রেরণা বানাতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে উন্নত দেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। এর জন্য দুর্নীতি এদেশ থেকে দূর করতে হবে।

গুম, খুন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বন্ধ করতে হবে। যারা এসব করে তাদেরকে কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশের দারিদ্র্যকে শূন্যের কোটায় নামাতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য খাতকে আরো উন্নত করতে হবে। এই করোনা মহামারী দেখিয়ে দিয়ে গেছে যে স্বাস্থ্য খাতকে সবসময় যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি করে রাখতে হবে।

কারণ আধুনিক বিশ্বে যেকোনো সময়, যেকোনো সমস্যা আসতে পারে। সেক্ষেত্রে যেন কোনো সমস্যা না হয় তাই এই খাতের জনবল বাড়াতে হবে এবং সৎ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক নাগরিকদের নিয়োগ দিতে হবে। স্বার্থান্বেষী মহলকে সবসময় দূরে রাখতে হবে। বেকার সমস্যার দূরীকরণ করে তরুণদেরকে দেশের কাজে লাগাতে হবে।

বর্তমানে দেশের রফতানি আয় সন্তোষজনক। তবে এটা আরো বাড়াতে হবে। প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা আরো জোরদার করতে হবে। আমাদের রফতানি আয়ের অন্যতম একটি খাত হচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ। কিন্তু আজকাল নিয়মিতই প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানির অভিযোগ পাওয়া যায়।

বিদেশের মাটিতে তাদের হত্যার মতো গুরুতর অপরাধও হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে সরকারকে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ২০২১ হবে আমাদের বাঙালি জাতির জন্য অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ আমাদের সকলের প্রত্যাশা।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে উন্নয়নের, তরুণ প্রজন্মর নিরাপদ বাসস্থান। গৌরবময় বাঙালি জাতির বীরত্বগাথা ছড়িয়ে যাবে বিশ্বের সকল প্রান্তে। জয়জয়কার হবে বাঙালি সভ্যতার। সকলের একটাই আশা, সকল ক্ষেত্রে সুবর্ণজয়ন্তী হয় যেন বাংলাদেশের জন্য টার্নিং পয়েন্ট।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






ads