অনলাইন গেম আসক্তিকে না বলুন

মো. সুমন সরকার


poisha bazar

  • ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৩:৩৩,  আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৩:৪০

অনলাইন মোবাইল বা ভিডিও গেমে আসক্তিকে মনঃস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অন্যান্য নেশার মতো ইন্টারনেট বেশি ব্যবহার করা বা অধিক সময় ধরে অনলাইনে গেম খেলাও একটি আসক্তি। মানুষের মাঝে এ ধরনের আসক্তিকে বলা হয় আচারণগত আসক্তি। কেবল স্মার্টফোনের সহায়তায় নতুন প্রজš§ আজ আসক্ত হয়ে পড়েছে অনলাইন গেম নামক এক করুণ নেশায়।

ঘরে বাইরে, রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও অনেককে দেখা যায় পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে গেম খেলছে। মাদকাসক্তির মতোই অনলাইন গেম বর্তমান তরুণদেরকে গ্রাস করে ফেলছে। এক সময়ে তরুণরা অবসর কাটাত বই পড়ে, মাঠে খেলে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান সংস্কৃতি সভ্যতার চর্চাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এগুলোর জায়গা দখল করে আছে অনলাইনভিত্তিক গেমগুলো।

আজকাল লক্ষ করা যায়, প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চা থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এমনকি অনার্স পড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের তরুণরাও অনলাইন গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে, যা এখন শুধুমাত্র একটি নেশা নয়, মানসিক সমস্যাতেও পরিণত হয়েছে। এই নেশা বা আসক্তির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজ ১১তম সংশোধিত সংস্করণে (আইসিডি-১১) ‘গেমিং অ্যাডিকশন’ হিসেবে এক মনঃস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করেছে ২০১৮ সালের জুন মাসে। এরই ধারাবাহিতায় ২০২২ সালে প্রকাশিতব্য আইসিডি-১১ শীর্ষক রোগ নির্ণয় গাইডবুকে এটি সংযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ বলা যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই অনলাইন গেম, মুঠোফোন, কম্পিউটার বা ভিডিও গেমের ক্ষতিকর ব্যবহারকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের জনপ্রিয় গেম ‘ফ্রি ফায়ার এবং পাবজি নামক গেম দুটি, যা তাদের মাত্রাতিরিক্তভাবে খেলতে দেখা যায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত ফ্রি ফায়ার এর ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি নিবন্ধিত ব্যবহারকারী রয়েছে। অন্যদিকে পাবজি নামক বেশ জনপ্রিয় গেমটিরও মোবাইল ডাউনলোড প্রায় ২৩৬ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে।

বর্তমান তরুণ প্রজšে§র জন্য এভাবে মোবাইল ফোনে বা ল্যাপটপ, কম্পিউটারে গেমের প্রতি আসক্তি একটি হুমকির কারণ। ইন্টারনেটের যুগে গেম আসক্তি বিষয়টা অন্যান্য আসক্তির চেয়ে গুরুতর। আমাদের চারিদিকে একটু নজর দিলে দেখা যায়, কেউ অনলাইনে গেমের প্রতি আসক্ত, কেউ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত, কেউ মুভি দেখায় আবার কেউ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু ব্যয় করে ফেলছে।

বিশ্বজুড়ে একটি জরিপে দেখা গেছে, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ইন্টারনেট গেমিংয়ে আসক্তিতে ভুগছে। যাদের মধ্যে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হচ্ছে কিশোর আর ১ দশমিক ৩ শতাংশ কিশোরী।(জেওয়াউ ফ্যাম,২০১৮)।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিটিআরসির তথ্যমতে, এপ্রিল ২০১৯ এ বাংলাদেশে প্রায় ৯ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ ইন্টারনেটে যুক্ত হয়। ২০১৬ সালের এক তথ্যমতে, ৩৫ শতাংশ হচ্ছে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী অর্থাৎ বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরী। এরাই কিন্তু বর্তমান গেমিংয়ে বেশি আসক্তি হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

যে তরুণ-তরুণীরা স্বপ্ন দেখবে বিশ্ব জয়ের, যারা দেশকে একসময় নেতৃত্ব দেবে, তারাই আজ অনলাইন গেমে আসক্তির কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ বয়সে অতিরিক্ত পরিমাণে গেম খেলার বিষয়টি সর্বদা চিন্তা চেতনা ও আচরণের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, যা সামাজিক দক্ষতাকে কমিয়ে দেয়। এছাড়াও দৈনন্দিন জীবনযাপনের মান খারাপ করে দেয়। এক্ষেত্রে বাবা মায়ের ভূমিকাও প্রভাব ফেলে।

দেখা যায়, বাবা মা তাদের ব্যস্ত সময়ে সন্তানের সঠিক খেয়াল রাখতে পারেন না। সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। ব্যস্ততার অজুহাতে সন্তানের হাতে তুলে দেন মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার। বাবা মা তাদের সন্তানের হাতে এ ধরনের ডিভাইস তুলে দিয়ে নিজেরা স্বঃস্তি অনুভব করে।অথচ খোঁজ খবর রাখেনা তার সন্তান এগুলোর সঠিক ব্যবহার করছে কিনা।

এদিকে সন্তানেরা স্বাধীনতা পেয়ে যায় ইন্টারনেট দুনিয়ায়। পড়াশোনা বাদ দিয়ে নিজের খেয়াল খুশি মতো দিন রাত ইন্টারনেটের বিভিন্ন গেমিং সাইট বা অনলাইন গেমে মেতে ওঠে, যা এক সময় আসক্তির পর্যায়ে চলে যায়। ঘরে আবদ্ধ হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেম খেলায় মগ্ন হয়ে থাকে। খাওয়া দাওয়ার কথা ভুলে সকল চিন্তা চেতনা গেমের প্রতি দিয়ে দেয়।

সকল আনন্দ যেন অনলাইন গেমকে জুড়েই। এদিকে সকালে ঘুম থেকে উঠেই ডাটা অন করে গেম খেলা শুরু করে চলতে থাকে গভীর রাত পর্যন্তও। গেমের প্রতি আসক্তির ফলে পড়াশোনা বা স্বাস্থ্যের প্রতি কোন খেয়াল থাকে না। মেজাজ থাকে সর্বদা খিটখিটে। পরিবারের কেউ ডাকলে সারা না দিয়ে রাগারাগির পর্যায়েও চলে যায়। এ ধরনের আচরণগত সমস্যাগুলো আমাদের সামাজিক জীবন এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ।

এসব গেম খেলতে প্রয়োজন হয় পর্যাপ্ত ডাটার। ডাটা প্যাক কিনতে অনেকে মিথ্যে বলে, বাজারের টাকা মেরে বা না খেয়ে ডাটা প্যাক কিনে গেম খেলায় মগ্ন থাকে।মস্তিষ্কজুড়ে শুধুই গেমের প্রতি আসক্তি জন্মায়।

ফলে ব্যক্তিগত জীবন বাধাগ্রস্ত হয়। যে কোন কাজের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ হ্রাস পায় এবং নানা ধরনের পারিবারিক সমস্যা দেখা দেয়। আর এসব সমস্যার মূল কারণ এখন অনলাইন গেমের প্রতি আসক্তি।

আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেভাবে এসব অনলাইন গেমের প্রতি আসক্তি হয়ে পড়েছে চাইলে এর থেকে বেড়িয়ে আসাও সম্ভব। শুধু দরকার একটু পারিবারিক এবং নিজস্ব সচেতনতা। নিজের মাঝে থাকতে হবে তীব্র ইচ্ছাশক্তি। জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে নতুন রুটিন করে চলতে পারলে এ ধরনের আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে। ইন্টারনেটে একটি নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সময় দেওয়া যাবে না, নিজের কাজগুলোর প্রতি বেশি সময় দিতে হবে, খেলা ধুলা, বন্ধুদের সাথে গল্প আড্ডায় সময় দিতে হবে। আর বইকে সব চেয়ে বেশি আপন মনে করে নিতে হবে।

এছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে গেমের প্রতি আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। তাই তরুণ প্রজন্মকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে এবং বিশ্ব দরবারে তাদেরকে সফলতার শিখরে পৌছাতে মাদকাসক্তিকে না বলার মতো অনলাইন গেমের প্রতি তরুণদের আসক্তিকেও না বলতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads