আইন প্রণয়নের চেয়ে প্রয়োগ জরুরি


poisha bazar

  • মুহম্মদ সজীব প্রধান
  • ১৫ অক্টোবর ২০২০, ১১:৫৬

সংবিধান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন, যা ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। বঙ্গবন্ধু গণপরিষদে সংবিধান নিয়ে ভাষণে বলেছিলেন, ‘এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।’

বঙ্গবন্ধুর ভাষণে সর্বস্তরের মানুষের ন্যায়বিচার ও অধিকারের কথাই প্রতিফলিত হয়েছে কিন্তু সংবিধান কার্যকর হওয়ার ৪৮ বছর পরে সংবিধান ও আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই নেই। ফলে দেশে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে নানাবিধ অপরাধ ও নৈরাজ্য।

বর্তমানের সঙ্গে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বহুল আলোচিত ধর্ষণের কথাই আলোচনা করা যাক। আমাদের সংবিধানের ২৭ ধারায় আইনের দৃষ্টিতে সবার সমতার কথা বলা হয়েছে। সেখানে রাষ্ট্র নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্রে কোনো বৈষম্য রাখবে না।

অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯(১) এ উল্লেখ রয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।

সে দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ষক যতই প্রভাবশালী হোক এবং ধর্ষিতা যতই দুর্বল হোক না কেন, ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যদি সংবিধানে যে আইনের কথা উল্লেখ রয়েছে তা দল-মত নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হতো তাহলে লাগামহীনভাবে ধর্ষণ বাড়তে পারত না।

বর্তমানে ধর্ষণকে রুখতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার জোরালো দাবি উঠেছে এবং সরকারও সে বিষয়ে কাজ করছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তস্বরূপ শাস্তি দিয়ে ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়তে নতুন আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ। তবে সে আইন যদি প্রয়োগ না করা যায় তাহলে তা নিতান্তই মূল্যহীন।

বাংলাদেশে খুনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড আছে তবুও দেশে হরহামেশা খুন হচ্ছেই। এর কারণ হচ্ছে দেশে যে পরিমাণ খুন হচ্ছে সে পরিমাণ বিচার হচ্ছে না বরং অপরাধীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ধর্ষণের শাস্তি যদি মৃত্যুদণ্ড করা হয় আর সেটা যদি কেবলই লিখিত থাকে কিন্তু প্রায়োগিক না হয় তাহলে সে আইনের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।

সত্যি বলতে, ধর্ষণকে প্রচলিত আইনেই প্রতিহত করা সম্ভব হতো যদি সেটা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ প্রয়োগ করা যেত। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ারও রয়েছে অসংখ্য কারণ তন্মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে দুর্নীতি।

দুর্নীতির কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভুক্তভোগীরা বিচারের জন্য আদালত তো অনেক দূরের কথা থানা পর্যন্তও যেতে পারছে না। অন্যদিকে রাজনৈতিক ও ক্ষমতার প্রভাব অন্যতম কারণ। যখন কোনো অপরাধীর অপকর্ম প্রকাশ হয় তখন আমরা তাকে অপরাধী হিসেবে যতখানি পরিচয় খুঁজি তার থেকে বেশি খুঁজি তার রাজনৈতিক পরিচয়, যা বিচার কার্য সম্পন্ন করতে বিঘ্ন ঘটায়।

এছাড়াও, মামলার তদন্তে অস্বচ্ছতা এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব, পুলিশের অসহযোগিতা উল্লেখযোগ্য কারণ। আর এসব কারণে আইনের প্রয়োগ কঠিন হয়ে যায় এবং অপরাধীদেরও শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। গত বছরের মে মাসে একটি জরিপের ফল প্রকাশ করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

তাদের অধীনে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের’ আওতায় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, রংপুর ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯ বছরে ২২,৩৮৬ জন নারী ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনায় চিকিৎসা নেন।

এই ঘটনাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে এ সব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৫,০০৩টি। রায় ঘোষণা হয়েছে ৮২০টি, শাস্তি হয়েছে ১০১ জনের। শতকরা হিসাবে রায় ঘোষণার হার ৩.৬৬ এবং সাজা পাওয়ার হার ০.৪৫ শতাংশ? আর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে গড়ে মাত্র শতকরা চারভাগ অপরাধী শাস্তি পায়?

আর এ পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট বুঝে যাচ্ছে দেশে যে পরিমাণ নারী নির্যাতন, ইভটিজিং ও ধর্ষণ হচ্ছে সে পরিমাণে অপরাধীদের বিচার হচ্ছে না। ফলে দেশে একের পর এক পৈশাচিক ও বর্বর ধর্ষণ চিত্র দেখতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় দেশের অগ্রযাত্রার গর্বিত অংশীদার নারীদেরকে ধর্ষকের কালো থাবা থেকে রক্ষা করতে আইনের প্রয়োগ জরুরি।

অপরাধ যেই করুক তাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করতে হবে। তাছাড়া, বিচার ব্যবস্থাকে সমুদ্রের মতো স্বাধীন করতে হবে যেখানে কারো কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না এবং বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিবর্গকে নিরপেক্ষ হয়ে বিচার কার্য সম্পন্ন করতে হবে। তাহলেই নারীরা তাদের স্বাধীনতা ফিরে পাবে এবং দেশ ও জাতি গড়ায় ঈর্ষণীয় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।






ads