হুমকির মুখে প্রাকৃতিক ঢালখ্যাত সুন্দরবন


poisha bazar

  • মোহম্মদ শাহিন
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৯:১২

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন উচ্চারণ করলেই যে বনের কথা আমাদের সামনে আসে সেটি হলো- সুন্দরবন। বাংলাদেশের ফুসফুস হিসেবে খ্যাত, অফুরান্ত জীবিকার উৎস ও জীবন রক্ষাকারী প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে চলেছে সুন্দরবন নামের এই পরম বন্ধুটি।

সুন্দরবনকে আবার প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যও বলা হয়। ইউনেস্কো কর্তৃক সুন্দরবনকে ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯৭ সাল। সময়ের পরিক্রমায় প্রাকৃতিক ও মনুষ্য কর্মে বহুবার হুমকির মুখে পড়েছে আমাদের এই ঐতিহ্য ও পরম বন্ধুটি। এবারো এর ব্যতিক্রম নয়।

নতুন করে ফের হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবন। গতকাল একটি দৈনিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবন দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস ধরে পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে এই আদেশ জারি করে কর্তৃপক্ষ। ফলে পর্যটকের আনাগোনা না থাকায় তৎপরতা বেড়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের।

নির্বিকারে গাছ কেটে উজাড় করা হচ্ছে সুন্দরবনকে। অভয়ারণ্যে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারে দুষ্কৃতকারী চক্রের তৎপরতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। হত্যা করা হচ্ছে হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। এখানে নৌকা প্রতি নেয়া হয় এক হাজার টাকা। সব ঘাট ম্যানেজ করেই খুব গোপনে গাছ, মাছ ও পশু শিকার করে পাচার করা হচ্ছে। হুমকির মুখে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, যার প্রচ্ছন্ন প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে আমাদের পরিবেশের ওপর।

বাংলাদেশের জন্য সুন্দরবনকে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদই বলা চলে। কেননা যুগ যুগ ধরে ভয়ঙ্কর, প্রলয়ঙ্করী সিডর, বুলবুল, ফণী ও আম্ফানসহ অসংখ্য ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে চলেছে সুন্দরবন। আমাদের সামগ্রিক জীবনের ওপর সুন্দরবনের ভারসাম্যপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে যে অবদান, সেটির অর্থমূল্য আমরা স্বচক্ষে দেখি না বলে সুন্দরবনের মূল্য আমাদের কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না।

বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু, মাথাপিছু আয়, সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের ব্যয় ইত্যাদি বিবেচনায় সুন্দরবনের সাথে একটি তুলনামূলক আর্থিক মূল্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, সুন্দরবন যেভাবে মানুষের জীবন রক্ষা করছে, তার আর্থিক মূল্য ১৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

সুন্দরবন আমাদের ২৪টি ইকোসিস্টেম সেবা প্রদান করে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ম্যানগ্রোভ বনের ওপর পরিচালিত ১৩০টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে ২০১২ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবন এক বছরে ২৭ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৭১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ইকোসিস্টেম সেবা প্রদান করে থাকে।

এই ইকোসিস্টেমের সাথে খাপ খাইয়ে হাজার হাজার প্রাণী এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে থাকে সুন্দরবন। শুধু তাই নয়, সুন্দরবন বিশাল আয়োজনে আমাদের করে থাকে অক্সিজেন সেবা প্রদান, বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ থেকে উৎপন্ন হয়ে থাকে মরণব্যাধি রোগের ওষুধ, বিভিন্ন গাছ খাদ্যের জোগান দেয় বন্যপ্রাণীদের এবং প্রচ্ছন্ন দূষণ থেকেও পরিবেশকে রক্ষা করতে সক্ষম।

আমাদের পরম বন্ধু ও ঐতিহ্যের এই সুন্দরবন আজ ধ্বংসের মুখে ঢলে পড়ছে। যেভাবে অবাধে বৃক্ষ নিধন চলছে তাতে বিবিসি বাংলার তথ্যমতে- আগামী ২০ বছরে সুন্দরী গাছগুলো বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুন্দরবনের গত ১৫ বছরে বাঘ কমেছে ৮৬ শতাংশ।

প্রতিবছর শিকার করা হচ্ছে ১০-১২ হাজার হরিণ। একসময় সুন্দরবনে ৪০০ প্রজাতির পাখি ছিল। শিকারের কারণে যা এসে দাঁড়িয়েছে ২৭০ প্রজাতিতে, মাছ এসে দাঁড়িয়েছে ১২০ প্রজাতিতে। যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য ছিল এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, যা বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের জন্য গৌরবময়।

বিশ্বে মোট ৪৮ প্রজাতির শ্বাসমূলীয় বৃক্ষ রয়েছে যার ১৯ প্রজাতিই রয়েছে আমাদের সুন্দরবনে। এমনকি বিশ্বের ৩৩ প্রজাতির বিপন্ন প্রাণী সুন্দরবনকে আশ্রয় করে টিকে আছে। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন ও জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে- সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে বিশ্বের জন্য অসামান্য অবদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জীববৈচিত্র্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কতটা প্রভাবশালী ভ‚মিকা পালন করে তা বলার অবকাশ রাখে না। সুতরাং সুন্দরবনকে রক্ষায় অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা দ্রুত কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। পরিবেশবাদীরা বলছেন- পর্যটকদের অভাবেই অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে।

এ সময় পর্যটকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে অবৈধ তৎপরতা কমে আসবে। একইসঙ্গে সুন্দরবনের চারপাশে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা ও তার দূষণ বন্ধে সদা তৎপর হতে হবে। বঙ্গোপসাগরের পাশ দিয়ে যে সুন্দরবনটা রয়েছে তা ব্যারিয়ার হিসেবে কাজ করে।

এটা যদি রক্ষা না হয় তাহলে একসময় খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা ও ঢাকার কিছু অংশ সমুদ্রের মধ্যে চলে যাবে এবং এগুলো হাতিয়া- স›দ্বীপের মতো আইল্যান্ড হয়ে যাবে। বাংলাদেশের উজানে দেওয়া ফারাক্কা বাঁধের কারণে মিঠাপানি কমে গিয়ে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় পানির লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে।

লবণাক্ততার ক্রমাগত আগ্রাসনে সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনের অন্যতম সম্পদ সুন্দরী গাছ মরতে বসেছে। তাই দ্রুত মিঠা পানির সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে। আবার অনেক সময় দেখা যায় জলদস্যু হানা দিলে দ্রুতগামী জলযানের অভাবে সে তৎপরতা বন্ধ করা যায় না। ফরেস্ট অফিসও ভাঙ্গাচোরা, নিয়মিত টহল কার্যকর হয় না।

সর্বোপরি, একরকম উদাসীনতার কারণেই ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ফুসফুস ও প্রতিরোধী প্রাকৃতিক ঢাল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে খুব বেশিদিন লাগবে না এই সুন্দরবন অস্তিত্বহীন হয়ে যেতে। সুন্দরবন বিনষ্ট হওয়া মানে বাংলাদেশের আয়ু এক দশক কমিয়ে আনা, মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলা। জনতাকে ফের যেন ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ স্লোগান দিতে না হয় সেদিক দৃষ্টি রেখে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে- সুন্দরবন বাঁচলে, বাঁচবে বাংলাদেশ।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





ads