অন্যের উপর নির্ভর করুন ভেবেচিন্তে

এম এল গনি

এম এল গনি
এম এল গনি - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৪১

দেশে থাকতে আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই বেশ ভালো চাকুরি করতাম। ওসব ছেড়ে কানাডায় ইমিগ্রেশন নিয়ে আসলে কী কী ধরনের সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে পারি সে সম্পর্কে আগে থেকেই কিছুটা ধারণা ছিল। তা মেনে নিয়েই সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা একটি ভিন্ন সংস্কৃতির দেশে পা রেখেছিলাম আমাদের ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া কন্যা অয়ন আর আট মাসের শিশুসন্তান সাঈদকে নিয়ে।

এ লেখা দীর্ঘ করার ইচ্ছে নেই; তাই যা বলার দ্রুতই বলছি। কানাডায় পা রেখে আমরা দুজনই আগে লেখাপড়া করবো ঠিক করলাম। কারণ, কানাডার পড়াশোনা থাকলে প্রফেশনাল চাকুরি পাওয়া সহজ হয়। সে হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন দাখিল শুরু করলাম। এরই মাঝে পুরোনো সহপাঠী, বন্ধুবান্ধব, যারা আমাদের আগে কানাডায় এসেছে তারাও খোঁজখবর নিতে শুরু করলো। এদের অন্যতম কানাডার অটোয়াবাসী একজন। ধরুন, তার নাম শান্ত।

শান্ত ওই শহরের এক নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছিলো তখন। ওর সাথে আমার মাস্টার্স এডমিশন নিয়ে আলাপ করতেই ও বললো আমার কাগজপত্র যেন সরাসরি ওকে পাঠাই। ওর পরিচিত প্রফেসরের কাছে সাবমিট করলে তাড়াতাড়ি কাজ হয়ে যেতে পারে বলেও সে আশ্বাস দিলো। কথামতো সার্টিফিকেট, ট্রান্সক্রিপ্ট হতে শুরু করে যাবতীয় কাগজ পাঠালাম তার কাছে। এর মাস দুয়েক পরও ভর্তির কোনো সংবাদ না পেয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করে জানলাম আমার কোনো আবেদনই ওখানে জমা পড়েনি।

পরে বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করে জানলাম, ওই প্রফেসর এবং আমার বন্ধু দুজনই রিসার্চ নিয়ে এতটা ব্যস্ত ছিল যে, আমার আবেদনটা নিয়ে সময় দেবার ফুসরৎ করতে পারেনি। তবে, বন্ধু আশ্বাস দিলো, আমি আবার সব কাগজপত্র জমা দিলে সে অবশ্যই চেষ্টা করবে; আর ভুল হবে না। প্রস্তাব শুনে আমার তখন মনে পড়লো, 'ন্যাড়া একবারই বেলতলায় যায়।' দুর্ভাগ্য, রিসার্চে এতটা সময় দিয়েও এ বন্ধু কিন্তু শেষতক পিএইচডি কমপ্লিট করতে পারেনি! নইলে আমার পিএইচডি পাস বন্ধু বেড়ে দু'শ তেপ্পান্ন হতে চুয়ান্ন হতো। এতে অবশ্য তার বিশেষ ক্ষতি হয়নি। পিএইচডি ছাড়াই আমাদের এ বন্ধুটি এখন আন্তর্জাতিক মানের সেলিব্রেটি। দেশ বিদেশের অনেকেই তাকে চেনে।

আমি আবার কারো সাথে পরিচয়-বন্ধুত্বকে খুবই গুরুত্ব দেই। আমার খানিক ক্ষতি হলেও বন্ধুতা রক্ষার চেষ্টা করি। তাই, ওই ঘটনায় সাময়িক মন খারাপ হলেও বন্ধুকে বিরূপ কিছু বলিনি। আপনাদের দোয়া বা আশীর্বাদে আমাদের বন্ধুত্ব আজও আগের মতোই অটুট আছে। এই সেদিনও তার সাথে ফোনে অনেক কথা হলো করোনার বিস্তার নিয়ে। ও হয়তো ভেবেছে প্রায় দু' দশক আগের সে ঘটনা আমার মনে নেই। তা-ই ভালো। শেষতক আমারও ক্ষতি হয়নি কিন্তু। কারণ, ওই ঘটনার মাস দুয়েক পরেই আমি কানাডা, তথা বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি- টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার স্ত্রীও পড়াশোনা করেছেন সেখানে।

নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে প্রায় তিন দশক আগের এক কাহিনী মনে পড়ে গেলো। আমি তখন বুয়েটে পড়ি। বুয়েটের শহীদ স্মৃতি হলে থাকতো আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার রুমমেট ছিলেন এক ভারতীয় নাগরিক- মাইনুদ্দিন ভাই। তিনি আমাদের দু' বছরের সিনিয়র। ভারতে 'ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি' বা আইআইএটি নামে প্রকৌশল শিক্ষার নামি প্রতিষ্ঠান আছে। বাংলাদেশের অনেক ভালো ছাত্র-ছাত্রী ওখানে পড়তে যায়। তা মাথায় রেখে মাইনুদ্দিন ভাইকে বললাম, 'ভাই, আপনাদের ওখানে তো আইআইএটি আছে; তো আপনি সেখানে না পড়ে বাংলাদেশের বুয়েটে এলেন কেন জানতে পারি?'

মাইনুদ্দিন ভাইয়ের সাথে আলাপ করে যা জানলাম তার সারমর্ম হলো, সতীশ নামে তাঁর এক রুমমেট ছিল কলেজে পড়ার সময়। মাইনুদ্দিন ভাই তাঁর আইআইটি এডমিশনের কাগজপত্র তৈরী করে সতীশের হাতে দিয়েছিলেন আইআইটিতে জমা দেয়ার জন্য। কেন যেন সতীশ তাঁর আবেদন জমা দেননি। আবার এ বিষয়টি সময়মতো মাইনুদ্দিন ভাইকেও জানাননি। ফল যা হবার তা-ই হলো। ভাই আর আইআইটিতে ভর্তি হতে পারলেন না। তাঁর কলেজের সহপাঠী সেই সতীশও যে আইআইটিতে চান্স পেয়েছিলেন তা কিন্তু না। সতীশের উপর নির্ভর করতে গিয়ে মাইনুদ্দিন ভাই আমার মতোই বিপদে পড়েছিলেন।

আসল কথা হলো, কিছু বিষয়ে অন্যের উপর নির্ভর করতে নেই।

লেখক- এম এল গনি : কানাডা প্রবাসী লেখক, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট ও প্রকৌশলী।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads