ওষুধ শিল্প: উন্নয়নের হাতিয়ার

আল আমিন ইসলাম নাসিম
- ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • আল আমিন ইসলাম নাসিম
  • ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:৪৪,  আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:২২

বাংলাদেশে উন্নয়নের অপার সম্ভাবনাময় শিল্প ওষুধ। দেশের অর্থনৈতিক খাত চাঙ্গা করতে বা শক্তিশালী করতে ওষুধ শিল্প হলো ‘উন্নয়নের হাতিয়ার’। ওষুধ শিল্প তার দীর্ঘ প্রতিযোগিতার পথ পাড়ি দিয়ে পোশাক শিল্পের পরে শক্ত স্তম্ভের ন্যায় নিজের অবস্থান মজবুত করে নিয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ৯৬% ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো।

একইসঙ্গে স্বাধীনতা পরবর্তী কয়েক বছরের পর থেকেই দেশে ওষুধ শিল্পের উৎপাদন শুরু হয়ে থাকে। মূলত সে সময় থেকেই এ পর্যন্ত ওষুধ শিল্প অন্যবদ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ফলে বাংলাদেশ আজ নিজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ ১৬০ টির বেশি দেশে রপ্তানি করছে। বর্তমানে বছরে পঁচিশ হাজার কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল উৎপাদিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও মানুষের ঔষুধের পাশাপাশি ব্যাপকহারে কৃষি ক্ষেত্রের ওষুধ তৈরিতেও অনুরূপ সক্ষমতা অর্জন করছে দেশীয় ওষুধ শিল্প।

পূর্বে কোটি কোটি টাকার ওষুধ আমদানি করা হতো। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ অনুন্নত ৪৮টি দেশের মধ্যে ওষুধ রফতানিতে শীর্ষে অবস্থান করছে। এছাড়া ওষুধ শিল্প প্রায় দু’লাখের বেশি মানুষের জন্য তৈরি করেছে কর্মসংস্থান। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও পাঁচ লাখের মতো মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। প্রতিবছর ওষুধ শিল্পের কর্মসংস্থান বাড়ছে। ওষুধ বিপণন, খুচরা বা পাইকারি বিক্রেতা ব্যবসায়ীদের মিলে প্রায় ১৫ লাখের কাছাকাছি মানুষের জন্য তৈরি করেছে কর্মসংস্থান।

১৯৮১ সালে ওষুধ শিল্পের বাজারের প্রায় ৭০ ভাগেরই দখলদারিত্ব ছিল আন্তর্জাতিক বাজারগুলোর। কিন্তু ১৯৮২ সাল থেকে ওষুধ শিল্পের অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর থেকে অনেকটাই দখলদারিত্ব মুক্ত হতে পেরেছে বাংলাদেশের বাজার এবং পরবর্তীতে বাজার ধীরে ধীরে বাংলাদেশের হস্তগত হয়েছে। ২০০১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ওষুধ তৈরির কাঁচামাল রফতানি হয় ১ কোটি ১০ লাখ থেকে প্রায় ১৬ কোটি ৬ লাখ।

এছাড়া শুধু ওষুধ রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয় ৩১ কোটি থেকে ৬০৪ কোটি। বর্তমানে ওষুধ শিল্পের রয়েছে প্রচুর সম্ভাবনা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান। ওষুধ শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার ৬৫০ কোটি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ শিল্পের প্রবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশের ওপরে।

সুতরাং অতি সহজেই উপলব্ধি করা যাচ্ছে, ওষুধ শিল্প বাংলাদেশের উন্নয়নের চিরাচরিত পথ। কিন্তু ওষুধ শিল্পের কিছু অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন না ঘটার ফলে এই শিল্পের পরিবর্ধন ঘটানো সম্ভব হচ্ছে না। অপরপক্ষে ওষুধ শিল্পের পরিবর্ধন না হলে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় এসে দাঁড়াবে সে বিষয়ে বলা মুশকিল।

বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের অভ্যন্তরীণ রয়েছে নানা সমস্যা। তন্মধ্যে দক্ষ মানবসম্পদের অভাব। ওষুধ শিল্পের অনেক সেক্টরেই দক্ষ মানবসম্পদ রয়েছে কিন্তু পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। যদি এ শিল্পে পুরোপুরি দক্ষ মানবসম্পদ নিয়োগ দেওয়া যেত তবে হয়তো এর আরও প্রসার ঘটানো যেত।

এছাড়া দেশে প্রায় অবৈধ ওষুধের দোকানের সংখ্যা রয়েছে প্রায় ১.৫ লক্ষাধিক। এছাড়া প্রতিবছর চোরাচালানের মাধ্যমেও বিদেশ থেকে দেশে কোটি কোটি টাকার ওষুধ এসে থাকে। যার অর্থের পরিমাণ সম্ভবত এক হাজার কোটি টাকা (সূত্র : রাজধানীর মিটফোর্ড পাইকারি ওষুধ ব্যবসায়ী ও উইকিপিডিয়া)।

চোরাচালান বন্ধ করতে পারলে ওষুধ শিল্পের বাজার আবার সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো সম্ভব হবে। এছাড়া দেশে করোনাকালীন ওষুধ কোম্পানিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবাধ দুর্নীতির ফলে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা দিয়ে টিকে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে এসব কোম্পানিগুলো থেকে কাজ শিখে নিজেই নতুন করে কোম্পানি দিচ্ছে এবং পুরোপুরি না জেনে, না বুঝে নিম্নমানের ওষুধ তৈরি করছে। আবার অনেকে নকল ওষুধও তৈরি করছে।

এছাড়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে একাধিক কোম্পানির নকল ওষুধ তৈরি করছে। পাশাপাশি লেবেলিং এবং ওষুধের গায়ে বিভিন্ন তথ্যাবলি দিয়ে সিল মেরে বাজারে ওষুধ সরবরাহ করছে। এছাড়া ওষুধ তৈরি নিয়ে সিন্ডিকেট তো রয়েছেই। যারা প্রতিক‚ল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাজারে নকল ওষুধ ছাড়ছে তারা ওষুধের বাজার মূল্য কম করে ছাড়ছে যাতে চাহিদা বেশি হয়।

এ জন্য ক্রেতারাও এদিকে ঝুঁকছে বেশি। দেশীয় পদ্ধতিতেই তারা ওষুধের গায়ের ব্যাচ নম্বর, মূল্য ও মেয়াদ নতুনভাবে সংযোগ করে পুনরায় বাজারজাত করছে সিন্ডিকেট চক্রগুলো। সম্প্রতি কোভিড-১৯ এর সময়ে নকল ওষুধ পণ্য নিয়ে রাজধানীর চিত্র সম্পর্কে আমরা প্রায় সকলেই অবহিত। মানহীন নকল সুরক্ষা সামগ্রী দ্বারা পুরো রাজধানীতে মেতে উঠেছিল তোলপাড়। গুলিস্তান কিংবা মালিবাগ সর্বত্র এ দৃশ্য সকলেই গণমাধ্যমে দেখেছি।

এছাড়া নানা সিন্ডিকেট সদস্য কিভাবে রাজধানীতে নকল ওষুধ কারখানা চালাচ্ছে এবং পণ্য বাজারে সরবরাহ করছে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা টেলিভিশনে অনেক স্পষ্টভাবে দেখতে পেরেছি এবং সে সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তিতও আছে অনেকেই। ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত তদারকি কিংবা জরিমানা করলেও অনেকটাই প্রশাসনের নজর এড়িয়ে তারা তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এছাড়া ওষুধের একাধিক কোম্পানির ফলে বিভ্রাটেও পড়েছে সাধারণ জনগণ। এছাড়া সম্প্রতি ল্যানসেট প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধের মাধ্যমে জানা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক-তৃতীয়াংশ ম্যালেরিয়ার ওষুধ নকল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর ১০ লাখ মানুষ ম্যালেরিয়ায় মারা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ এসব মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। উচ্চ রক্তচাপ কিংবা হার্টের রোগীদের জন্য নকল ওষুধ আরও বড় ভয়ংকর রূপ লাভ করেছে।

যদি হার্টের রোগীরা ভালোমানের ওষুধ পায় তবে অনেকেই সুস্থ হয়ে ওঠেন কিন্তু যদি নকল ওষুধ এর পাল্লায় পড়ে তবে কিরকম বেগতিক অবস্থা হবে তা ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তথাপি জনসাধারণের ওষুধ সম্পর্কে ধারণা কম। ওষুধ সম্পর্কিত বিষয়ে ডাক্তার এবং ফার্মেসি থেকে যা বলে তাই কিনে থাকে জনসাধারণ।

তবে মাঠ পর্যায়ে ওষুধ এর অতিরিক্ত কোম্পানি নিয়ে বিভ্রাটে পড়ে থাকে ক্রেতাগণ। যার দরুন বিরূপ প্রভাব পড়ছে ওষুধ শিল্পে। এছাড়া ওষুধ শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তন্মধ্যে জ্বালানির অভাব, যোগাযোগের অব্যবস্থাপনা, গবেষণার খাতে কম খরচ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্পাদনা, মান নিয়ন্ত্রণ সম্পাদনা, আইনি ও নীতিগত বাধা, রফতানি প্রক্রিয়াকরণসহ প্রভৃতি।

ওষুধ শিল্পের প্রসার ঘটাতে জ্বালানি বড় অন্তরায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির সমস্যা দূর করতে পারলে ওষুধ শিল্পের বিস্তৃত ঘটানো অতি সহজতর হবে। পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহ করার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার চাই বিশেষ সংস্কার নতুবা প্রয়োজনমতো সময়ে ওষুধ সরবরাহ না করতে পারলে ক্ষুদ্র থেকে পাইকারি পর্যন্ত সকলের লোকসান গুনতে হবে।

এছাড়া ওষুধের শিল্পের উন্নয়ন ঘটাতে গবেষণার বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলো বছরে ১৩৫ মিলিয়ন ডলার গবেষণা কাজে বরাদ্দ দিয়ে থাকে অথচ আমাদের বরাদ্দ প্রশ্নের বাইরে! মূলত যে দেশ যত গবেষণায় উন্নত সে দেশ তত উন্নতি লাভ করবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং এক্ষেত্রে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

পাশাপাশি ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশে নানা প্রশ্ন উঠে থাকে। যার ফলে আন্তর্জাতিক অনেক স্বীকৃতি কিংবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) থেকে স্বীকৃতি মিলতে সমস্যা হয় এবং ওষুধ আন্তর্জাতিক বাজারজাত করণসহ বৈদিশিক মুদ্রা অর্জনে বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে। পাশাপাশি আইনি ও রফতানিমূলক জটিলতা বা বাধার ফলে প্রতিবছর মোটা অঙ্কের ধস নামে, ওষুধ নষ্ট হয়ে যায় এবং এর ফলে ছোট্ট বড় উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায় বা চলমান বহাল রাখতে হিমশিম খেতে হয়।

তদুপরি ওষুধ শিল্প বাংলাদেশের উন্নয়নের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত দীর্ঘদিন তবে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী, নীতিমালা, মাঠ পর্যায়গুলোতে ওষুধ সরবরাহ সমস্যার মতো উক্ত সমস্যাগুলোর জন্য বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে আজ এত ধসের দিকে। নতুবা বিশ্বে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প প্রথম স্থান অধিকার করত। সুতরাং সরকারের উচিত এই সমস্যাগুলোর দ্রুত সুরাহা করা।

ওষুধ শিল্পের সঙ্গে জড়িত সকলের মাঝে সমন্বয় সৃষ্টি করে কাজ করা। তাছাড়া ওষুধ এমন একটি শিল্প যেখানে মানসম্মত ওষুধ তৈরি করতে পারলে এর কোনো লোকসান নেই। কেননা মানব জাতি যতকাল বাঁচবে ততকাল ধরে ওষুধের প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ এর দিনে ওষুধ শিল্পের চাহিদা বাড়ছে।

দেশ বিদেশে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং তাদের চিকিৎসার জন্য প্রতিনিয়ত ওষুধ প্রয়োজন হচ্ছে। এছাড়া অন্য সবাই কর্মসংস্থান হারালেও ওষুধ শিল্পের কেউ হারায়নি কেননা এখানে কাজ চলে পুরো বছর ধরে। এছাড়া এ শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারলে যেকোনো দুর্যোগকালীন সময়েও বাংলাদেশের মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে না এবং সুস্থতার হারও বাড়বে দেশের মানুষের।

সুতরাং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এ শিল্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দেশের মানুষদের সুস্থ রাখতে, দারিদ্র্যমুক্ত, বেকারত্ব ও নিরক্ষরতা হ্রাস ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি ঘটাতে এ শিল্পের ত্রুটিগুলো সমাধান করা অতীব জরুরি। এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গন চাঙ্গা করতে ওষুধ শিল্পের বিকল্প নেই। সর্বোপরি অতি দ্রুত ওষুধ শিল্পের সমস্যাগুলো নিষ্পত্তি করা হোক। কেননা এই শিল্পই দেশের এক ও অনবদ্য উন্নয়ের হাতিয়ার।

লেখক: বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...