• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
  • ই-পেপার

শতবছরের বটবৃক্ষ সোমেশ্বরী নদীগর্ভে বিলীন

সুজন হাজং

মানবকণ্ঠ
শতবছরের বটবৃক্ষ নদীগর্ভে

poisha bazar

  • ০৫ আগস্ট ২০২০, ১৬:৪০

নেত্রকোণা জেলার সুসং দুর্গাপুর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ঐতিহ্যবাহী কামারখালী বাজার সংলগ্ন শতবর্ষী বটবৃক্ষটি গত বৃহস্পতিবার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভারতের মেঘালয় থেকে থেমে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কালের সাক্ষী শতবর্ষী বটবৃক্ষটি সোমেশ্বরী নদী ভাঙনে শিকড় সমেত উপড়ে পড়েছে। শৈশবের অনেক স্মৃতি বিজড়িত এই বটবৃক্ষটির কথা আজ খুব মনে পড়ছে। বটবৃক্ষকে ঘিরে নানান কল্পকাহিনী শুনেছি। জনশ্রুতি আছে যে, পূর্বপুরুষের অবিনশ্বর আত্মারা বটবৃক্ষে অবস্থান করেন। ইতিহাসখ্যাত টংক আন্দোলনে লড়াকু জাতি হাজংরা বটবৃক্ষকে সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখেন।

বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়াতলে বিশ্রাম নেয় মানুষ, দূর দুরান্ত থেকে আসা ক্লান্ত পথিক, গাঁয়ের দুরন্ত রাখাল। পাখিদের জন্য বটবৃক্ষ নিরাপদ আশ্রয়। বটবৃক্ষ হাজংদের কাছে পবিত্রতার প্রতীক। বটবৃক্ষের সাথে সনাতন হাজংদের সম্পর্ক খুব প্রাচীন এবং আধ্যাত্মিক। তাদের যে কোন পূজা -পার্বণ বটবৃক্ষকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। হাজংদের বিভিন্ন দেব-দেবীর মন্দির বটবৃক্ষের নিচে স্থাপন করা হয়। কামাখ্যা, বাস্তুপুজা, কালীপূজা, শিবপুজা, হরিপুজা বটবৃক্ষের নিচেই সাধারণত করে থাকে হাজংরা। গ্রামীণ জনপদে হাজংদের মেলা বসে বটবৃক্ষের নিচেই।

আবহমান গ্রাম বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে বটবৃক্ষের সম্পর্ক যেন যুগ যুগ ধরে। আদিবাসী হাজং, গারো সম্প্রদায়ের মানুষের এই চিরচেনা বটবৃক্ষটি আজ থেকে আর চোখে পড়বে না। বিজয়পুরের সাদামাটির দেশ দেখতে আসা পর্যটকদের কাছেও এই বটবৃক্ষটি ছিল বেশ পরিচিত। সপ্তাহে একদিন প্রতি রবিবার কামারখালীতে বিশাল জমজমাট বাজার বসতো। বাজারে তাজা শাক-সবজিসহ সোমেশ্বরী নদীর মাছ পাওয়া যেত। কামারখালী বাজারের পূর্ব পাশ দিয়েই বয়ে যায় সোমেশ্বরী নদী। বাংলাদেশের বিখ্যাত মহাশোল মাছটি এই সোমেশ্বরী নদীতেই পাওয়া যায়। মাছের বাজারটি ছিল এই বটবৃক্ষটির চারপাশ ঘিরেই। গত দশবছরে নদী ভাঙনের ফলে সোমেশ্বরী পাড়ে গড়ে ওঠা মানুষের বসতি ভেঙে গেছে, অনেকেই ভূমিহীন ও নিঃস্ব হয়েছেন। নদী পাড়ে বসতি গড়া মানুষের ভৌগলিক সীমারেখা বদলে গেছে। সোমেশ্বরী নদীর পাড়ে দ্রুত বেড়িবাঁধের ব্যবস্থা না করলে এভাবে প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলে কৃষকের ফসলি জমিসহ গ্রামের পর গ্রাম বিলিন হয়ে যাবে। যেমন করে বিলীন হয়ে গেছে শতবছরের পুরোনো ইতিহাসের সাক্ষী বটবৃক্ষটি।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব আমাদের চারপাশের পরিবেশ, জীবন ও জীববৈচিত্র্যকে চরম হুমকির সম্মুখীন করেছে। নদী ভাঙন ও ভূমিক্ষয়ের বিপর্যয়ের হাত থেকে কুল্লাগড়া ইউনিয়নবাসীকে দীর্ঘকাল এই বটবৃক্ষটি বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল। কিন্তু সময় ও স্রোতের বিপরীতে শেষপর্যন্ত টিকে থাকতে পারল না এই প্রাচীনতম বটবৃক্ষটি। তাছাড়া নদী ভাঙনের হুমকিতে আছে দুর্গাপুর পৌরসভার ঐহিত্যবাহী শিবগঞ্জ বাজারসহ বড়ইকান্দি, ডাকুমারা, গাওকান্দিয়া এলাকার হাজারো মানুষ।

বর্ষাকালে সোমেশ্বরী নদী ভয়ংকর টালমাটাল রূপ ধারণ করে। পাহাড়ী ঢলে নদীর বুকে বাঁধভাঙা জোয়ার আসে। দুর্গাপুর পৌরসভার বিভিন্ন স্থাপনা, ঘরবাড়ি মসজিদ, মন্দির রক্ষা করতে স্থায়ী বেড়িবাঁধে নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।

উল্লেখ্য, দুর্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি, বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি, কমলা রাণীর দিঘি, বহেড়াতলীর হাজং মাতা রাশিমণির স্মৃতিসৌধ, বিজয়পুরে চীনামাটির খনি, বিখ্যাত নীল পানির লেক, বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্প, সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী, রানিখং'য়ের ক্যাথলিক গির্জা পর্যটকদের জন্য বেশ আকর্ষণীয় স্থান। গারো পাহাড়ের পাদদেশে একটি পর্যটন সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে নেত্রকোণা জেলার সুসং দুর্গাপুর এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। ভারতের সামান্তবর্তী দুর্গাপুরের উত্তরে দাহাপাড়া, বাদামবাড়ি, ভবানীপুর, নয়াপাড়া, নলুয়াপাড়া, গোপালপুর, পূর্বে বারমারি, লক্ষ্মীপুর, ভরতপুরে ছোটবড় অসংখ্য পাহাড়গুলো পর্যটনদের ব্যাপক আকৃষ্ট করে।

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর সিলিকন বালি, নুঁড়ি পাথর ও কয়লা সেখানকার খেটে খাওয়া হাজারো দরিদ্র পরিবারের জীবিকার বড় মাধ্যম। নদী পাড়ের অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকার এই ক্ষেত্রটি বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগ যেন তাদের স্বপ্নের বসতি বটবৃক্ষের মত পাহাড়ি ঢলে ভেসে না যায়।

লেখক : সুজন হাজং, গীতিকার ও কলামিস্ট।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...