মহামারী ও বন্যার বাস্তবতায় ঈদ


poisha bazar

  • মিল্টন বিশ্বাস
  • ০১ আগস্ট ২০২০, ০৯:৫৪

মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। দুর্যোগে সরকারকে সহযোগিতা না করে কিছু মানুষ লোভের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের কঠোর নজরদারিতে স্বাভাবিক হচ্ছে অনেক কিছুই। কয়েকদিন আগে জঙ্গিবাদী হামলার সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী সতর্ক করেছে সকলকে। এ জন্য মানুষের মনে ভয়ও আছে। কারণ ২০১৬ সালে শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে জঙ্গিগোষ্ঠী হামলা করেছিল।

আজ পবিত্র ঈদুল আজহা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই ঈদ উদযাপনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে নিজের পশুত্বকে বলি দেয়ার দৃষ্টান্ত নবী ইব্রাহিমের সময় থেকে আজ অবধি মহিমান্বিত। তবে ত্যাগের মহিমায় নিজেকে উৎসর্গ করার এই দিনটি এবার ব্যতিক্রম।

গত কয়েক বছর যাবৎ আমরা দেখেছি এই ঈদের সময় দেশের একটি বড় অংশ বন্যায় প্লাবিত হয়। এতে আনন্দ মাটি করে দিয়ে প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় মানুষকে। এবারও দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। গ্রামের মানুষ যত্ন করে লালন-পালন করা গবাদি পশু বিক্রি করতে পারেনি কোরবানির হাটে।

কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে তাও এবার নেই। কারণ বন্যার আগে মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ এর মহামারীর ছোবল আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। মারণব্যাধির কবলে পড়ে তিন হাজারের বেশি মৃত্যু এবং কয়েক লাখ মানুষের আক্রান্ত হওয়ার বাস্তবতা জীবনকে অন্য রকম করে পরিচালিত করছে। এজন্য ঈদের উৎসবের চেয়ে মানুষের বেঁচে থাকা, সুস্থ থাকা বড় হয়ে উঠেছে।

এবারের ঈদ ১ আগস্টে অর্থাৎ শোকের মাসের সূচনা দিনে। জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের এবারের মাসটি আলাদাভাবে পালিত হওয়ার কথা ছিল। কারণ ‘মুজিববর্ষে’র উৎসবে সারা বিশ্বের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে অদৃশ্য জীবাণুর কাছে আমরা হেরে গেলাম। কিন্তু মানুষ দমে যাবার পাত্র নয়। এজন্য ভিন্ন মাত্রায়- অনলাইন ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় উৎসব ও উদযাপন চলছে এবং আরো কিছু দিন লকডাউনে থাকলেও তা পরিস্থিতি সামলে পরিচালনা সম্ভব হবে।

মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। দুর্যোগে সরকারকে সহযোগিতা না করে কিছু মানুষ লোভের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের কঠোর নজরদারিতে স্বাভাবিক হচ্ছে অনেক কিছুই। কয়েকদিন আগে জঙ্গিবাদী হামলার সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী সতর্ক করেছে সকলকে।

এজন্য মানুষের মনে ভয়ও আছে। কারণ ২০১৬ সালে শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে জঙ্গিগোষ্ঠী হামলা করেছিল। মহামারীতে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী ব্যস্ত থাকায় অপরাধীরা সুযোগ পেতে পারে। এজন্য আমাদের সতর্ক থাকা বেশি দরকার।

২০২০ সালের ঈদে সরকারের তরফ থেকে দুর্ভোগ অবসানের জন্য নানাবিধ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফেরি পারাপারে কিছুটা দুর্ভোগ থাকলেও কোরবানি পশু পরিবহনে তেমন একটা সমস্যা হয়নি। আগে যেমন ঈদকে কেন্দ্র করে হয়রানি, প্রতারণা আর চাঁদাবাজির উপদ্রব সকল সীমা অতিক্রম করত তেমনটি ঘটছে না এবারের ঈদে। যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রীর শত প্রচেষ্টার পর দেশের সকল রাস্তা চলাচল উপযোগী হয়ে উঠেছে। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন ঈদে সাবধানে চলাফেরা করার জন্য। ভিড় এড়িয়ে চলতে বলেছেন করোনা মহামারী বিস্তার রোধের জন্য।

মহামারীর মধ্যে অনলাইনে কোরবানির পশু কেনার ব্যবস্থা থাকায় এবারের উৎসব ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। আগে ছিল পশুর হাটে অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য। প্রতি বছর ঈদের আগে অনেক মানুষ এসব প্রতারকের কবলে পড়ত। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খখলা বাহিনীর নানা প্রস্তুতির মধ্যেও ভয়ঙ্কর প্রতারকরা হাতিয়ে নিতো মানুষের সর্বস্ব।

এবার তাদের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে না সাধারণ মানুষ। তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা করা খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ মহামারী ও বন্যা তাদের না খেয়ে থাকার বাস্তবতা তৈরি করে দিয়েছে। গত বছর ঈদ উপলক্ষে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ও যাত্রী হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ পরিষদ।

ঈদের সময় যানবাহনে স্বাভাবিক ভাড়ার দু-তিন গুণ আদায় করা হয়। ঘরমুখী মানুষকে জিম্মি করে যানবাহনের মালিকেরা এভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করত। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ির ছাদেও যাত্রী পরিবহন করা হতো।

এবারের ঈদে ঘরমুখো যাত্রীরা হয়রানির শিকার হবে না কারণ মানুষের স্রোত কমে গেছে। পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, ডিবি পুলিশ, ব্যাটালিয়ন ও আনসারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা মানুষের ব্যাধি সংক্রমণ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। ঈদকে সামনে রেখে অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও বেশি ভাড়া আদায় করা বিভিন্ন পরিবহনের স্বাভাবিক প্রবণতা হলেও সেই সুযোগ এবার নেই বললেই চলে। এর আগে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চ ছাড়তে দেখা গেছে। অবশ্য কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই সেগুলো গন্তব্যে পৌঁছেছিল। এবার নিশ্চয় সেই অবস্থা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই অব্যাহত থাকবে।

বন্যা পরিস্থিতি এবং শ্রাবণ মাসে কোরবানি ঈদ হওয়ায় অতিরিক্ত চাপ না থাকায় এবার দেশের প্রায় ২১ হাজার কিলোমিটার সড়কের অধিকাংশই ফাঁকা থাকবে। কয়েকটি রুটে যানবাহন চলাচলও বন্ধও থাকতে পারে। বিভিন্ন রুটে গাড়ি ভাড়া বেড়ে গেলেও তা অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের কারণে হতে পারে।

প্রতিবছর যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ দেখা যায়। মৃত্যুমুখে পতিত হয় কেউ কেউ। দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে এবারের বাস্তবতা ভালো থাকবে বলা চলে। এর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের অন্তত ১৪টি যানজট স্পটের আতঙ্কে থাকতে হতো মানুষকে। কিন্তু সেখানে নতুন সেতুগুলো উদ্বোধন হওয়ায় চলাচলে মানুষের কোনো হয়রানি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

তবে এখনো রেলস্টেশন ও লঞ্চ ঘাটে রয়েছে দুর্বৃত্তদের আনাগোনা। ছিনতাইকারী বেশে দুর্বৃত্তরা ট্রেনের মধ্যেই লুটে নেয় যাত্রীদের সর্বস্ব। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে যাত্রীদের খুন করে পথিমধ্যে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়। লঞ্চ ঘাটে পৌঁছানোর আগেই ব্যাগ নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভিনব ছিনতাইও রয়েছে। এসব অপরাধ এবারও কঠোর হাতে দমন করা দরকার।

‘‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’’- এ স্লোগান সামনে রেখে প্রতিবছর ঈদুল আজহা আসে। আর এ সময় বেশি ব্যস্ততা দেখা যায়। এই ব্যস্ততা চলে ঈদুল ফিতরের এক মাস পর থেকেই। কিন্তু করোনা-ভাইরাসের মৃত্যুভীতি মানুষকে রাস্তাঘাট-দোকানপাটে ভিড় করতে নিরুৎসাহিত করেছে।

ঈদ সামনে রেখে তাই সারাদেশে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে না। সব মিলে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা নিরাপদ করতে প্রশাসনের তদারকি এবার তেমন নেই বললেই চলে। তবে সংক্রমণ এড়ানোর জন্য সরকারি নির্দেশাবলি বা আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

এ ছাড়া বাস, লঞ্চ ও স্পিডবোটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। রোগের ভয় নিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরা যাত্রীরা যেন হয়রানির শিকার না হন সেই বিষয়ে মনিটরিং টিম গঠন করে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া এবং প্রতারণা-চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে সব সময় কঠোর থাকলে এবারের মতো আগামী ঈদ উৎসবও সার্থক হবে।

লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়





ads






Loading...