ইন্টারনেটে অতিরিক্ত ভ্যাট ও ছাত্রদের অনলাইন ক্লাস

মো. মহিউদ্দীন শুভ

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • ২৩ জুলাই ২০২০, ১২:৪৫

একুশ শতকে ইন্টারনেট কোনো বিলাসী ব্যাপার নয় বরং প্রযুক্তিগত অপরিহার্য সুবিধা যার ওপর জাতীয় অর্থনীতিসহ সামগ্রিক জীবন ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। করোনাকালে ইন্টারনেটের এই গুরুত্ব আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বৈশ্বিক এই মহামারীতে মানুষের মৌলিক চাহিদার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যেমন চিকিৎসা, শিক্ষা, বিনোদন ইত্যাদি বিষয়ে শুধু ইন্টারনেটের কল্যাণেই সম্পূর্ণ করা গেছে। বলাই বাহুল্য করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ইন্টারনেটের গুরুত্ব কমবে না বরং বাড়বে।

করোনার এই দুঃসময়ের প্রতিকূলতা আমাদের ইন্টারনেটের দুনিয়ায় আরো বেশি অভিযোজিত করছে। সংগত কারণেই করোনার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ইন্টারনেট পরিষেবাকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা নেয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধিই পাবে। চতুর্থ বিপ্লবের যে ধারা ইতোমধ্যেই সূচিত হয়েছে তার প্রযুক্তিগত কাঠামো যেহেতু ভার্চুয়াল যোগাযোগনির্ভর সুতরাং আগামীতে ইন্টারনেট ব্যবহার যে ক্রমাগত বাড়বে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। করোনাকালীন এই দুর্যোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এই মুহূর্তে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ করছে। যার মূল জ্বালানি ইন্টারনেট। বর্তমানে অনলাইন পাঠদান ছাড়া শিক্ষাদানের দ্বিতীয় কোনো উত্তম বিকল্পও নেই। এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হতে করোনার আরো ভয়ালতম রূপ বা করোনার দ্বিতীয় ওয়েব।

ঠিক এই মুহূর্তে যখন ইন্টারনেট আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শিক্ষার্থীদেরসহ জনসাধারণের জন্য অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তখন সদ্য পাস হওয়া দেশের জাতীয় বাজেটে ইন্টারনেট পরিষেবায় আরোপিত অতিরিক্ত খরচ কতখানি জনবান্ধব আচরণ হলো? ৩৯তম জাতীয় অর্থ বাজেটে ভ্যালু চেন সার্ভিসগুলোর ব্যবসায় ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আরোপের ফলে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবার খরচ অবশ্যই বেড়ে যাবে। এমন এক সময়ে ইন্টারনেটের ওপর বাড়তি ভ্যাট আরোপ করা হলো যখন করোনার মহামারীর কারণে অনলাইন শিক্ষাদান পদ্ধতি জরুরি চিকিৎসা সেবাসহ বিভিন্ন দাফতরিক, ব্যক্তিগত এবং সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা আগের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছে। ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তিশিল্প যত দ্রুত বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে সামগ্রিক উন্নয়ন ততই বেগবান হবে। সে জন্য ইন্টারনেট সেবার খরচ সর্বাধিক মানুষের আর্থিক সামর্থ্যরে কথা বিবেচনা করে হওয়া উচিত। করোনার এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসের জ্বালানিস্বরূপ ইন্টারনেটের খরচ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হতে যাচ্ছে। একদিকে সরকার অনলাইন পাঠদানে উদ্বুদ্ধ করছে, অন্যদিকে ইন্টারনেট খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নেই। গ্রাম অঞ্চলসহ দেশের সর্বত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল নেটওয়ার্ক তথা ইন্টারনেট সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিস্তৃত এবং শক্তিশালী করার প্রতি মনোযোগ না দিয়েই সরকার ভ্যালু চেন সার্ভিসগুলোর ব্যবসায় সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। যা সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের আগের তুলনায় খরচ বাড়াবে।

ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ইন্টারনেট পরিষেবায় খরচ ৫ শতাংশে রাখার দাবি জানানো হয়েছে। ইসপাব এর দাবি অনুযায়ী আরোপিত ভ্যাটের হার কমানো না হলে তারা ভোক্তা পর্যায়ে ইন্টারনেট সংযোগের দাম বাড়িয়ে দেবেন, আর সরকার তাতে বাধা দিলে সেবার মান অর্থাৎ ইন্টারনেট সেবার গতি কমিয়ে দেবে বাড়তি ব্যয় পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। এই দুইয়ের কোনোটাই সাধারণ ভোক্তা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের পক্ষে যাবে না এবং চূড়ান্ত বিচারে তা জাতির জন্যই প্রতিকূল প্রভাব ফেলবে।

পার্শ্ববর্তী বন্ধু রাষ্ট্র ভারতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সুবিধা নেয়ার ক্ষেত্রে দুনিয়ার সবচেয়ে কম খরচ করতে হয়। বিশ্বায়নের যুগে ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তিশিল্পে বিনিয়োগ সব থেকে সম্ভাবনাময়। চলমান বাজেটের ইন্টারনেট সেবার ওপর অতিরিক্ত ভ্যাট কমানো না হলে চলমান মহামারীর মধ্যেই ভোক্তা পর্যায়ে ইন্টারনেট পরিষেবার মাসিক মূল্য ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে ইসপাব। বর্তমান মহামারীতে দেশের অধিকাংশ মানুষের যোগাযোগের অন্যতম আবেগের সেতুবন্ধন সৃষ্টিকারী মিডিয়াম ইন্টারনেটের ওপর অতিরিক্ত ভ্যাট কখনোই জনগণের সঙ্গে যৌক্তিক আচারণ করা হয়নি। করোনাকালীন মহামারীতে নতুন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৭ লাখ ৩) ৩৮ হাজার (সূত্র: বিটিআরসি)।

ঠিক যখন মহামারীর দরুন সাধারণ মানু্ষরে দৈনন্দিন আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, মানুষ চাকরি হারানোর অনিশ্চয়তা ভুগছে, জনসাধারণ আর্থিক সংকটকাল পার করছে এবং ঠিক একই সময়ে যখন শিক্ষার্থীসহ জনসাধারণের ইন্টারনেটের ওপর আগের চেয়ে বহুলাংশে নির্ভরশীলতা বেড়েছে তখন ইন্টারনেট পরিষেবায় অতিরিক্ত ভ্যাট নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্পহীন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে আরো বেশি ব্যয়বহুল করে তুলবে তথা সব ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। চলতি অর্থবছরের ইন্টারনেট সেবায় অতিরিক্ত শুল্ক অযৌক্তিকভাবে ইন্টারনেটকে ব্যয়বহুল করে তুলবে যা ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরির পথে সহায়ক না হয়ে অন্তরায়স্বরূপ। প্রযুক্তির যুগে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশাল জনসাধারণকে বিশ্বমানের উপযোগী জনশক্তিতে রূপান্তর করতে ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তি খাতকে বিস্তৃত এবং সহজলভ্য করার বিকল্প নেই।

একটা দেশের বাজারে কোনো পণ্যের বা সেবার মূল্য আকাশ থেকে টুপ করে পড়ে নির্ধারিত হতেই পারে না, জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা এবং সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতির বাস্তবতা এর সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে যুক্ত। যেই দেশের মোট জনগণের অর্ধেক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সেই দেশের ইন্টারনেট পরিষেবার মূল্য তো নামমাত্র হওয়া উচিত। তাতেও লাভ বৈ ক্ষতি হবে না। একে তো ইন্টারনেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকারীদের চড়া দামে সেবা প্রদান তার ওপর সরকারের অতিরিক্ত ভ্যাটের চূড়ান্ত ভোগান্তি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদেরই। জাতীয় বাজেট প্রণয়ের সময় নীতিনির্ধারকদের ইন্টারনেট পরিষেবার গুরুত্বের বিষয়ের প্রতি অবশ্যই আরো বিশ্লেষণধর্মী এবং যৌক্তিক হওয়া উচিত ছিল। সর্বসাকল্যে বিবেচনা করে সরকারের প্রতি আহ্বান, ইন্টারনেট পরিষেবার গুরুত্ব পর্যালোচনা করে ইসপাব এর দাবি এবং বর্তমান পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করে ইন্টারনেটের ওপর ভ্যাট ৫ শতাংশে এনে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিন।

লেখক-মো. মহিউদ্দীন শুভ: শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে

 





ads






Loading...