চীন-ভারতের সীমান্ত সংকট ও ভূ-রাজনীতি


poisha bazar

  • মো. হাছিবুল বাসার মানিক
  • ১৫ জুলাই ২০২০, ১১:১৬

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে ভারতের অবস্থা এমনিতেই সংকটাপন্ন হয়ে আছে। তার ওপর প্রতিবেশীদের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা ভারতের জন্য বাড়তি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোভিড-১৯ ও সীমান্ত সমস্যা নিরসনে ভারত। নতুন কৌশল নির্ধারণ করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিশেষত প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীনের সঙ্গে লাদাখ সীমান্ত সমস্যা তৈরি হওয়ার পর ভারতকে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করতে দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া।

তবে এবারই প্রথম আঞ্চলিক সমস্যা মোকাবিলায় ভারতকে দীর্ঘদিনের বন্ধু রাশিয়ার সহায়তা নিতে দেখা যাচ্ছে না। যা ভারতীয় নাগরিকদের অবাক করে দিয়েছে। যদিও পুতিন প্রশাসন সমস্যা সমাধানে ক‚টনৈতিক পথে হাঁটার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল ভারতকে। কিন্তু ভারতের প্রশাসন পুতিনের আহ্বানে সাড়া দেয়নি।

জুনের প্রথমদিকে গালওয়ানে ভারত-চীন সেনা সংঘর্ষের পর থেকে বদলে গিয়েছে পুরো এশিয়া অঞ্চলের ভ‚-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বেশ প্রভাব পড়াটা লক্ষণীয়। আগে যে বিষয়গুলো পুরো বিশ্ববাসীর চোখে অসম্ভব বলে মনে হতো এখন সেগুলোকেই চোখের সামনে বাস্তব হতে দেখা যাচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে ভারতের সঙ্গে এশিয়ার কিছু দেশের সম্পর্কের রূপও। যেমন নেপাল ও বহু ক্ষেত্রে ভুটান সরকারের কিছু আচরণের মধ্যে শত্রুতার মনোভাব দেখা গিয়েছে।

অন্যদিকে জাপান বা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের আগের থেকে অনেক যোগাযোগ সংশ্লিষ্টতা বেড়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের নীতি বদলে ফেলতে একরকম বাধ্যই হয়েছে নয়াদিল্লি। নয়াদিল্লির নেয়া এই নতুন কৌশলে ভারত কতটা উপকৃত হবে? তা দেখতে বিশ্ববাসীর নজর ভারতেই থাকছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, জুনের ১৫ তারিখ হিমালয় অঞ্চলে ভারতের সৈন্যদের সঙ্গে চীনের সৈন্যদের হাতাহাতির ঘটনায় বেইজিংয়ের আগ্রাসী নীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে। পম্পেওকে চীনকে তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা বৃদ্ধি না করতেও হুঁশিয়ারি দিতে দেখা যায়।

হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গবেষক জেফ এম. স্মিথ বলেন, ভারতকে সীমান্ত সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই তথ্য বিনিময়ের ফলে ওই অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে পরিবর্তন আসবে। যদিও নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে বলেছে যে, তাদের কোনো সহায়তার দরকার নেই। কিন্তু চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার পর থেকে ভারতীয় কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের তুলনায় বেশি যোগাযোগ রক্ষা করছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, চীন কি মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে আগামী দিনগুলোতেও চলমান সীমান্ত সমস্যা ভারতের ওপর বজায় রাখবে? নাকি মার্কিন চাপের রোষানলে পড়ে সংকট নিরসনে এগিয়ে আসবে। বাস্তবতা বলছে, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্ক উপেক্ষাকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রথম ভারত-চীন যুদ্ধ ভারত ও চীনের মধ্যে ১৯৬২ সালে সংঘটিত একটি যুদ্ধ। সীমানা নিয়ে বিরোধ থেকে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। যুদ্ধে চীনের কাছে ভারত পরাজিত হয়। চীন তিব্বত দখল করার পর ভারতের বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চীনকে চীনের অন্তর্ভুক্ত এলাকা বলে দাবি করে, এভাবে যে সীমান্ত সমস্যার শুরু হয় তা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সূচনা করে।

যুদ্ধে চীনজয়ী হয়ে একতরফা যুদ্ধবিরতি জারি করে, আকসাই চীন দখলে রাখে কিন্তু অরুণাচল প্রদেশ ফিরিয়ে দেয়, যুদ্ধের পর ভারত সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ভারতের শান্তিবাদী বিদেশনীতিও কিছু পরিমাণে পরিবর্তিত হয়।

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য ভারতকে সমর্থন করে, অন্যদিকে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে মিত্রতা বাড়াতে সচেষ্ট হয়। বর্তমান সীমান্ত সমস্যায় পাকিস্তানকে জড়িয়ে ভারতেকে বিপদে ফেলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে বেইজিং। এর পেছনে অন্যতম কারণ, ভারতকে চাপে রাখতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলো চীনকে সমীহ করবে। এবং খেয়াল করলে দেখা যায়, বাস্তবে কিন্তু তাই হচ্ছে।

এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশই বিশ্বাস করে, তারা নিজেরা কতটা স্বাতন্ত্র্য তা নির্ভর করে চীন-ভারত সম্পর্কের ওপর। মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল একের পর এক রাষ্ট্র ভারতের ভূ-রাজনীতির বলয় থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। স¤প্রতি ভারতের সাথে বিতর্কিত ভ‚-খণ্ড লিমপিয়াধুরা, কালাপানি আর লিপুলেখকে নিজেদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করেছে নেপাল।

ফলে উপেক্ষিত হয়েছে ১৯৫০ সালের ইন্দো-নেপা শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি। ভারতকে নেপাল লেশমাত্র গুরুত্ব দিচ্ছে না। নেপালের মতে, নতুন মানচিত্রের ভিত্তি হচ্ছে ১৮১৬ সালের সুগাউলি চুক্তি। ভারত তাদের সেই দাবি নাকচ করলেও নেপাল তাদের সিদ্ধান্তে অটল। মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক যাচ্ছে না ভারতের।

অন্যদিকে চীন আত্মবিশ্বাসী। সামরিক শক্তিতেও এগিয়ে তারা। যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার ঠিক পরে, অর্থাৎ তিন ও চার নাম্বারে আছে যথাক্রমে চীন এবং ভারত। সম্প্রতি আকসাই চীনের কাছে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চীন ও ভারত সংঘর্ষে ভারতের কর্নেলসহ প্রায় দুই ডজন সেনা মারা যায়।

গত পাঁচ দশকে দেশ দুটির মধ্যে এটাই সীমান্ত সংঘাতে বড় প্রাণহানির ঘটনা। ১৯৯৬ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী প্রকৃত সীমান্ত রেখার দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো পক্ষই গোলাগুলি বা কোনো প্রকার বিস্ফোরক ব্যবহার করেনি।

এখন প্রশ্ন হলো, কোনো অস্ত্র বা বিস্ফোরক ব্যতীত চীন ভারতের এতগুলো সেনা মেরে ফেলল কিভাবে? দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মধ্যে একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এই ঘটনা। সীমান্তে দুই দেশের শক্তি পরীক্ষা মূলত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখার জন্যই। মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক কৌশল এবং যুদ্ধ এক নয়।

রাজনৈতিক কৌশলকে হাতিয়ার করে দুই দেশই সীমান্ত সংঘর্ষ ও তাদের মধ্যেকার উত্তেজনা বজায় রাখবে। নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্য প্রদর্শন করবে। চীন যুদ্ধে যাবে না। কারণ দুটি: এক চীনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মার্কেট জনবহুল ভারতে।

মহামারীর কবলে পড়ে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে চীন কোনোভাবেই এই মার্কেট হারাতে চাইবে না। দুই, চীনের শত্রু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো। আন্তর্জাতিকভাবে চীনের সেই অর্থে কোনো বন্ধু দেশ নেই। তাদের একটি বন্ধু দেশ পাকিস্তান। রাশিয়া চীনের নব্য বন্ধু, ভারতের পুরনো। তাই যুদ্ধ বাঁধলে রাশিয়া কোন পক্ষ নেবে বলা মুশকিল।

চীনের সঙ্গে জাপান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সম্পর্ক ভালো নয়। তাছাড়া ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ও সম্পর্ক গত কয়েক দশকে অনেক দৃঢ় হয়েছে। এরই মধ্যে বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ-মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের সঙ্গে সম্মিলিত নৌ-মহড়ায় অংশ নেয় ভারত।

ভারত বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বেশ কয়েকটি সামরিক জোটে অংশগ্রহণ করেছে। চীন যদি যুদ্ধে যায় তবে এই অঞ্চলে ইন্দো-মার্কিন জোট তৈরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পে বলেছেন, চীনের যুদ্ধাংদেহী মনোভাবের কারণে জার্মানি ও ইউরোপ থেকে সেনা কমিয়ে এশিয়ায় মোতায়েন করার চিন্তা করছে মার্কিন সরকার। অতএব, চীন ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপারে আরো সতর্কতা অবলম্বন করছে।

অন্যদিক ভারতও যুদ্ধে যাবে না। চীনের সঙ্গে যুদ্ধ করা মানে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া। বিশ্ব রাজনীতির বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে, অর্থনীতি এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। উল্টো নিহত সেনাদের কথা বলে ভারত চাইছে বিশ্বের কাছে চীনের আগ্রাসী মনোভাবের কথা তুলে ধরতে। যুদ্ধে না যাওয়ার আরো একটি কারণ হলো, সামরিক দিক থেকে চীনের চেয়ে ভারত বহু গুণে পিছিয়ে।

এই করোনা মহামারীর সময় ভারতের মিত্র রাষ্ট্রগুলো ভাইরাস সামলাতে ব্যস্ত। তারা কতটুকু সাহায্য করতে পারবে বলা যাচ্ছে না। চীনেরও কিন্তু একই অবস্থা। সুতরাং যুদ্ধ হবে না এটা বলা যায়। তবে তারা পরস্পরকে চাপে রাখবে এটা নিশ্চিত। তবে নয়াদিল্লির নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে চীনের চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে বঙ্গোপসাগরে নৌমহড়ায় অস্ট্রেলিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।

এই বছরের শেষ নাগাদ বঙ্গোপসাগরে এ যৌথ মহড়ায় অংশ নেবে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা থেকে এই তথ্য জানা গিয়েছে। মহড়ায় জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত অংশ নিলেও এই প্রথম আমন্ত্রণ পেল অস্ট্রেলিয়া।

চীনের সঙ্গে টানাপড়েনের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়াকে আমন্ত্রণ জানানো ইঙ্গিতপূর্ণ মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। ভারত আগে থেকেই জানে যে, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও চীনের প্রবল দ্ব›দ্ব রয়েছে। দ্ব›েদ্বর জের ধরে ভারত প্রতিশোধ নেয়ার প্রচেষ্টায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করছে।

এশিয়াজুড়ে চীনের আগ্রাসন রুখতে এক দশক আগেই আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ‘কোয়াড’ নামে একটি জোট গড়ে তুলেছে ভারত। ভারতের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি সপ্তাহেই এই আমন্ত্রণের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো বিশ্বকে জানাবে নয়াদিল্লি।

সামরিক বিশ্লেষক ডেরেক গ্রসম্যান বলেন, অস্ট্রেলিয়াকে আমন্ত্রণ জানাতে ভারত যে সময়টা বেছে নিয়েছে তা অবশ্যই লক্ষণীয়। এর আগে মালাবারে কখনোই অস্ট্রেলিয়া আমন্ত্রণ পায়নি। এটি এমন এক মহড়া যা চীনকে চিন্তিত করতে বাধ্য। বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে বড় স্টেক হোল্ডার বাংলাদেশকে কখনোই এই মহড়ায় না রাখার সমালোচনা করেন গ্রসম্যান।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাওয়া মানে বোকার স্বর্গে বাস করা। ডেরেকের উক্তির প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আগামীতে নয়াদিল্লি কি তাদের কৌশলে বাংলাদেশকে স্থান দিবে? নাকি বাংলাদেশকে উপেক্ষা করেই আঞ্চলিক ভ‚-রাজনীতির অবসান ঘটাতে চাইবে তা সময় বলে দিবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।





ads






Loading...