আলম তালুকদার : এক আপোষহীন যোদ্ধা

সুজন হাজং

মানবকণ্ঠ
আলম তালুকদার

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১২ জুলাই ২০২০, ১৬:১৯

আলম তালুকদার আমার প্রিয় ছড়াকারদের মধ্যে একজন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মৌখিক ছড়া তৈরীতে খুব পটু ছিলেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর মুখনিঃসৃত রসাত্মক ছড়া শ্রোতাদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। সমসাময়িক ছড়া সাহিত্যে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় তাঁর লেখা ছড়া নিয়মিত প্রকাশিত হত। নতুন নতুন শব্দ নির্মাণে অসাধারণ দক্ষতা ছিল আলম তালুকদারের। তাঁর ছড়ায় প্রকৃতি, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ একসূত্রে গাঁথা। কখনো প্রতিবাদ, কখনো অভিসম্পাত আবার কখনো প্রতিরোধ নানা অনুষঙ্গে রূপায়িত ছিল তাঁর রচনা শৈলী।

এক কথায় বলতে গেলে নানান রূপ, রস, উপমা, অলংকারে সমৃদ্ধ ছিল ছড়ার জগত। তাঁর বন্ধুসুলভ অমায়িক আচরণ মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারত। একজন আলম তালুকদার মনের অজান্তেই অনেক বড় জায়গা তৈরী করে নিয়েছেন তাঁর পাঠকমহলে।

যে কোন অনুষ্ঠানে তাঁর সরব উপস্থিতি শ্রোতাদের প্রাণবন্ত করে রাখত, হাস্যোজ্বল করে রাখত। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা তাঁর কাছে ঋণী। দেশের জন্য তাঁর অবদান আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে একাত্তরে আলম তালুকদার একবার অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। আবার পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে তিনি অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। দেশের প্রশ্নে, বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে, তিনি ছিলেন আপোষহীন। তিনি আজীবন মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র অনুভূতিকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন। তাঁর লড়াইটি ছিল স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে।

তাঁর কাছে রাজাকার শব্দটি সবচেয়ে ঘৃণার ছিল, সবচেয়ে অপাংক্তেয় ছিল। বক্তব্যের শেষে সে সবাইকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলতেন "ধন্যবাদ, সবাইকে না দিয়া বাদ, শুধু রাজাকার বাদ"। অর্থাৎ অনুষ্ঠানে সবাইকে ধন্যবাদ জানাতেন শুধু রাজাকার ছাড়া। কারণ, অনুষ্ঠানে যদি কোন রাজাকার থেকে থাকে সে যেন ধন্যবাদ গ্রহণ করতে না পারে। কথাটি সাধারণ হাস্যোরসে ভরপুর হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জায়গায় খুব শাণিত ছিল, আপোষহীন ছিল।

রাজাকারদের সাথে কোন সম্পর্ক নয়, কোন আত্মীয়তা নয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি সবসময় বলতেন, যারা এদেশের স্বাধীনতা চাইনি তাদের এদেশে থাকার কোন অধিকার নেই। রাজাকারদের সাথে এই রাষ্ট্র কোন বন্ধুত্ব করতে পারে না। তাদেরকে কোন জাতীয় রাজনীতিতে কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদার করতে পারে না। রাজাকারদের রাষ্ট্রীয় কোন সম্মান "পুরস্কারে" ভূষিত করতে পারে না। তাহলে এদেশের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এটি আত্মহত্যার শামিল হবে।

বীরমুক্তিযোদ্ধা আলম তালুকদার ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন। আলম তালুকদার সরকারের একজন প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। তাঁর পুরোনাম নূর হোসেন তালুকদার। তিনি সাহিত্যে আলম তালুকদার নামেই সমধিক পরিচিত।

শিশুসাহিত্যিক আলম তালুকদারের সব মিলিয়ে ১১৫টির অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। "পড়িলে বই আলোকিত হই, না পড়িলে বই অন্ধকারে রই" তাঁর জনপ্রিয় উক্তি। একজন ছড়াকার হিসেবে দুই বাংলায় তাঁর ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। তিনি গত ৮ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক: সুজন হাজং, গীতিকার।

মানবকণ্ঠ/এইচকে

 





ads






Loading...