আমরা কোন পথে যাচ্ছি?

সামসুজ্জামান

মানবকণ্ঠ
আমরা কোন পথে যাচ্ছি - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • ০৬ জুলাই ২০২০, ১৪:০৪

করোনা এখন বৈশ্বিক সমস্যা। চীনের উহান শহর থেকে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস সারা বিশ্বে বিস্তার করেছে। বিশ্বের পরিচালক খ্যাত আমেরিকায় এর করাল থাবা গ্রাস করেছে দেশটিকে। যা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। প্রতিদিন ৫০-৬০ হাজার করে রোগী শনাক্ত হচ্ছে। সে দেশের প্রেসিডেন্ট বিরক্ত হয়ে একে যেমন ‘ফ্লু’ আখ্যায়িত করেছেন পাশাপাশি চীনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে চীন তার গবেষণাগার থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভাইরাসটি বাতাসে ছেড়ে দিয়েছে। যার কোনো দলিল-প্রমাণ কিছুই নেই।

বিশ্ব আজ এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিশ্বের উন্নত দেশের বৈজ্ঞানিকরা এর প্রতিষেধক আবিষ্কারে এখনো কোনো সুফল আনতে পারেনি। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম প্রাণঘাতী করেনা ভাইরাসের অস্তিত্ব মিললেও সরকারের একের পর এক পদক্ষেপ ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। পুরো ছেষট্টি দিন গোটা দেশ পুরো লকডাউনের আওতায় আনলেও লকডাউনের কার্যকারিতা নিয়ে অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে এর তদারকিতে। কিন্তু পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি লকডাউনের কার্যকারিতা।

আমাদের দেশে অশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেশি নিঃসন্দেহে। সেখানে মাস্ক ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং ঘনঘন সাবান অথবা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারটি এসব মানুষ আমলেই নেয় না। কারণ করোনা রোগটি যে কত স্পর্শকাতর তা তারা বোঝেই না। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম উচিত ছিল লকডাউনে কঠোরতা অবলম্বন করা। দ্বিতীয়ত কেবল বিবৃতি দিয়েই নয়, গ্রামেগঞ্জে মোবাইল সিনেমার মাধ্যমে এর ভয়াবহ সম্পর্কে ন্যূনতম একটা ধারণার সৃষ্টি করা। হঠাৎ গার্মেন্টস কারখানাগুলো খুলে দিয়ে গ্রামে ফিরে আসা মানুষকে আবার শহরে নিয়ে কারখানাগুলোতে কাজে যোগদান করানো। এ ক্ষেত্রে দুটি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে আবার শহরে যাওয়া মানুষের শরীরে বহন করা এই প্রাণঘাতী ভাইরাস গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের ধারণা ছিল যেহেতু বিদেশ থেকে আসা মানুষের শরীরেই এই রোগের অস্তিত্ব মিলছে তাই হয়তো এটি ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এ ছাড়া মারাত্মক আরেকটি ভুলের কথা সরকারকে স্বীকার করতেই হবে। বিমানবন্দর থেকে বিদেশ থেকে আসা লোকগুলোকে কোয়ারেন্টাইনে না রেখে ছেড়ে দেয়া। এতে করোনার বিস্তৃতি দ্রুত ছড়িয়েছে।

মাত্র আঠারো কোটি মানুষের বসবাস এদেশে। কিন্তু সমস্যা অনেক। বিশেষত করোনার প্রাদুর্ভাবে আমাদের স্বাস্থ্য দফতরের ভঙ্গুর অবস্থা দিবালোকের মতো ফুটে উঠেছে আমাদের সামনে। শুধু তাই নয় এই সুযোগে মধ্যস্বত্ব ভোগীরাও তাদের ফায়দা লোটার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, করোনা কাজে নিয়োজিত ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার এবং নার্সদের খাবার জন্যে বিশ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। পিপিই, মাস্ক কেনায় কেলেঙ্কারি। আরো অসংখ্য ঘাপলার খবর উঠে আসছে এখন। সরকারি-বেসরকারি জরুরি বিভাগগুলোয় জরুরি চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদের কারোনা আতঙ্কে ফিরিয়ে দিচ্ছেন ডাক্তাররা। অধিকাংশ ডাক্তার সপ্তাহের অর্ধেক দিনও অফিস করছেন না। এ যদি হয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র তাহলে করোনা রোগী পড়ে মরুক সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? সরকারকে এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্সে যেতেই হবে। নামকাওয়াস্তে লকডাউন এবং সেনা টহল দিয়ে সমস্যার সমাধান আদৌ সম্ভব নয়।

প্রতিদিন গাণিতিকহারে আমাদের শনাক্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এ বিষয়টি সরকারকে ভাবায় কিনা জানি না। তবে আমরা যারা দেশ নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করি তারা উদ্বিগ্ন। যখন দেখি আমেরিকা, ইতালিতে লম্বা লম্বা ক্যানেল করে তার মধ্যে সারিবদ্ধভাবে কফিন রেখে ড্রেজার দিয়ে মাটিচাপা দেয়া হচ্ছে তখন মনে হয় আমরাও কী তাহলে সমাধি ক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের পরামর্শক কমিটি এবং বিশেষজ্ঞ কমিটি রয়েছে। সরকারের উচিত তাদের পরামর্শ আমলে নেয়া। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা যখন বলছেন সামনে মহাবিপদ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য সরকার তখন লকডাউন তুলে, যানবাহন চলাচল শপিংমলসহ বড় বড় মার্কেটগুলো খুলে দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন করোনা সংক্রমণের ব্যাপকতা বাড়ছে তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিতরাও হতাশ হয়ে পড়ছেন।

আমাদের পরীক্ষাগারের সংখ্যা মাত্র ৭১টি। যেখানে প্রতিদিন গড় ১২-১৩ হাজারের বেশি পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। নেই কিট, অভিজ্ঞ ডাক্তার, ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা। আঠারো কোটি মানুষের দেশে যা অপ্রতুল। আমেরিকা, জার্মানি, ইটালি প্রতিদিন লক্ষাধিক লোকের নমুনা পরীক্ষা করেও এগুতে পারছে না। তাহলে আমাদের দেশের মানুষের পরীক্ষা সমাপ্ত হতে কত মাস লাগবে ভাবতে হবে সরকারকে। সম্প্রতি চীন থেকে ১৪ সদস্যের একটি দল বাংলাদেশ সফর করে হতাশ প্রকাশ করেছেন পরীক্ষা নিয়ে। তাদের ভাষায় বাংলাদেশে এই ভাইরাস রোধ করতে আরো গবেষণাগার বাড়াতে হবে। না হলে বাংলাদেশে মহাবিপদের সম্ভাবনা রয়েছে।

যেহেতু আমাদের দেশের মানুষ অসচেতন। তাদের সচেতন করতে সেনাবাহিনীর সাথে সাথে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করতে হবে। কারণ এটি দেশের মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা।

করোনা ভাইরাস আজ বৈশ্বিক সমস্যা। প্রতিটি দেশে এ ভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে। কিন্তু এই মহামারী রোধে সব দেশকেই এই ক্ষতি মেনে নিতে হবে মানুষের প্রাণ রক্ষার্থে। আমাদেরও মানতে হবে। আমরা যদি মরণব্যধি এই ভাইরাস প্রতিরোধ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রেখে সবকিছু স্বাভাবিক করতে চাই তাহলে তা হবে বোকামি। মরণব্যাধি এই ভাইরাস রোধে ব্রিটেনের মতো দেশ আজ লকডাউন তুলতে সাহস পাচ্ছে না। অথচ আমরা লাল, সবুজ, নীল জোন করে আমাদের সবকিছু ঠিক রাখতে চাইছি। এর ফলাফল সারশূন্য হবে নিঃসন্দেহে। চীনা বিশেষজ্ঞদের মতে আমাদের দেশে দ্রুত এই প্রাণঘাতী মহামারী থেকে রক্ষা পেতে পরীক্ষাগারের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় এর বিস্তার রোধ সম্ভব নয়। এ ছাড়া হাসপাতালে বেড সংখ্যা এবং আইসিইউরও সংখ্যা বাড়াতে হবে। যাতে করোনার লক্ষণ নিয়ে আসা রোগীরা দ্রুত সেবা পেতে পারে। পাশাপাশি ডাক্তারদের অমানবিক আচরণ বন্ধ করে তাদের সার্বক্ষণিক সেবায় নিয়োজিত রাখার পরামর্শও দিয়েছেন এই বিশেজ্ঞ দল। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায় ১১৭ দিনে নমুনা পরীক্ষায় আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে দেড়লাখ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসেবে মৃতের সংখ্যা দু’হাজার। এই অবস্থায় ১৮ কোটি মানুষের নমুনা পরীক্ষায় কত সময় প্রয়োজন এ কথা স্বাস্থ্য বিভাগের মাথায় আছে কিনা জানি না। এদিকে আগত কোরবানি ঈদে পশুহাট চালু রাখার সিদ্ধান্তে সংশয় আরো একধাপ বেড়েছে।

করোনা ভাইরাসের ক‚ল-কিনারা খুঁজতে গিয়ে পৃথিবীর বিখ্যাত সব বিজ্ঞানী, গবেষক, চিন্তক এক গভীর অন্ধকারে ডুবে গেছেন। কবে, কিভাবে থামবে করোনা সংক্রমণ? এখনো এর কোনো সদুত্তর নেই কারো কাছে। তবে বাস্তবতা বলছে- চিত্র ভিন্ন হবে। এই সংকট কিভাবে মোকাবিলা করতে পারি তার পথ বের করতে না পারলে সংকট দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads






Loading...