চীন-ভারত দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?

মো. রাশেদ আহমেদ

মানবকণ্ঠ
প্রতীকী ছবি

poisha bazar

  • ০৩ জুলাই ২০২০, ১২:২০

বিশ্বের অন্যতম দুই পারমাণবিক পরাক্রমশালী দেশ চীন-ভারতের সীমান্তে চরম উত্তেজনা এবং যুদ্ধবাজ পরিস্থিতি বর্তমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হট ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া উদার গণতান্ত্রিক এবং জনবহুল দেশ ভারতে বর্তমান বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ ভাইরাস মোকাবিলার মধ্যেই নেপাল সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা, অর্থনৈতিক সংকট, নতুন বেকারত্ব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ (আমফান) বন্যা, ঝড় এবং পঙ্গপালের মতো নতুনত্ব সমস্যা মোকাবিলা করতে হিমশিম পোহাতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, জাতিগত বিদ্বেষ, কাশ্মীর ইস্যু, মুসলিম বিদ্বেষ, নির্যাতন এবং নাগরিকত্ব আইন (এনআরসি) বাতিলের মতো বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে বেশ বিপাকে রয়েছে ২০১৪ সাল থেকে টানা দ্বিতীয় মেয়াদ ক্ষমতায় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপি) নেতৃত্বাধীন মোদি প্রশাসন।

সন্দেহ নেই, বর্তমান নরেন্দ্র মোদি সরকার সীমান্তে যুদ্ধকর পরিস্থিতিসহ অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক ইস্যু নিয়ে অত্যন্ত সংকটলগ্ন সময় অতিক্রম করছে। মূলত, ভারতের সাথে সীমান্তঘেঁষা দেশ চীন-পাকিস্তানের দ্ব›দ্ব উত্তেজনা, সাময়িক মহড়া অথবা ক‚টকৌশলে একে-অপরকে পরাজিত করার ছক অঙ্কন করা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বর্তমানে চীন-ভারত সীমান্তে চরম উত্তেজনা পরিস্থিতি অতীতের যে কোনো অবস্থাকে হার মানিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সাথে নেপালের গভীর উষ্ণ সম্পর্কের টানাপড়েন সীমান্তে ভারতীয় হত্যা এবং চীনের সাথে নেপালের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন ভারতের জন্য নতুন করে বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ। উল্লেখ্য, নেপালের সাথে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ফাটল ধরতে শুরু করে ২০১৫ সালের নতুন করে সংবিধান প্রণয়নে ভারতের কৌশল অগ্রাহ্য করায়। এতে ভারত ক্ষুব্ধ হয়ে হঠাৎ তেল অবরোধ করলে চরম বিপাকে পড়ে নেপাল। সেই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুত্বের হাত চওড়া করে দেয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ দেশ চীন। নেপাল অনেকটা বাধ্য হয়ে চীনের সাথে তেল চুক্তি সম্পন্ন করে। বর্তমান চীন-নেপাল সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় আসীন। অপরদিকে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সাথে ঐতিহাসিক বিবদমান তিন এলাকা কালাপানি, লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ নিজেদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন জোট। ইতোমধ্যে তা পার্লামেন্ট পাস করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে নেপাল। এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারত এবং এর পেছনে অন্য দেশের ইন্ধন আছে বলেও উল্লেখ করে। চীন ইতোমধ্যে নেপালে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রধান দেশে পরিণত হয়েছে। স্থলবন্দি রাষ্ট্র নেপাল ২০১৬ সালের এক চুক্তির ফলে চীনের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারছে, যা তাদের ভারত নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই কমিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া নেপালে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ইজও প্রকল্পের আওতায় নেপালের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে তারা। ফলে ভারতের ওপর থেকে পুরনো বন্ধুত্ব এবং নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিন দিন চীনের ওপর আঞ্চলিক নির্ভরতা প্রতীক হচ্ছে নেপাল।

উল্লেখ্য, এশিয়া মহাদেশের ভ‚-রাজনীতির কৌশল হিসেবে নেপাল দেশ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের দুই অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত-চীন যুদ্ধ, দ্ব›দ্ব এবং সাময়িক উত্তেজনা অনেক পুরনো। ১৯৬২ সালে সীমান্তকে কেন্দ্র করে চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। চীন দখল করে তিব্বত, অরুণাচল এবং আসসাই অঞ্চল। পরে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে চীন অরুণাচল ফিরিয়ে দিলেও বিবাদ নিষ্পত্তি হয়নি। চীন আজও অরুণাচল তাদের নিজেদের অঞ্চল হিসেবে দাবি করে। অপরদিকে ভারত দাবি করে আকসাই তাদের নিজ এলাকা। যা এখনো উভয় দেশের অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে পরিচিতি। ভারত-চীন দীর্ঘ লাদাখ সীমান্তে গত চার দশকের অধিক সময়ে রক্তক্ষয়ী কোনো সংঘর্ষ না ঘটলেও ১৫ জুন সীমান্ত এলাকায় গালওয়ান উপত্যকায় উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীদের ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় এবং সংখ্যা না জানা চীন সেনা সদস্য নিহতের ঘটনা নিঃসন্দেহে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। লাদাখ সীমান্ত উভয় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। যদিও চীন-ভারত পররাষ্ট্র পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বর্তমান উত্তেজনা কমানোর জন্য উভয় দেশ একমত হয়েছে। আশার আলো হচ্ছে- উভয় দেশ সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। দুঃখজনক বিষয়- শর্ত ভঙ্গের অজুহাতে ফের উভয় দেশ সীমান্তে সেনাবাহিনী টহল এবং মহড়া জোরদার করেছে। শুরু হয়েছে নতুন করে বাকযুদ্ধ। যার ফলে, চীন-ভারত সীমান্ত এলাকায় বাজছে যুদ্ধের দামামা। উল্লেখ্য, বিশ্বে সাময়িক ব্যয়ে চীনের অবস্থান দ্বিতীয় এবং ভারত তৃতীয়। সীমান্তে ভারতীয় সেনা প্রাণহানির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ জানিয়েছে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলসহ গোটা ভারতবাসী। এমনি চীনাপণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে ভারতীয়রা। বলে রাখা ভালো, ভারতে আমদানির ১৪ শতাংশ আসে চীন থেকে। এর পরিমাণ প্রায় ৬০-৬৫ বিলিয়ন ডলার। এমনকি ভারতের ওষুধ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আসে চীন থেকে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের সংকটকালে চীনাপণ্য বর্জন হবে ভারতীয়দের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। নিঃসন্দেহে বাণিজ্যিক এবং বিদেশি বিনিয়োগের দিক হতে ভারত অনেক পিছিয়ে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে চীনের বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। চীনের কর্মযজ্ঞ ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির আওতায় আগামীর বিশ্ববাণিজ্য যে চীনকেন্দ্রিক গড়ে উঠবে সে কথা সন্দেহাতীত। বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতি অঙ্গনে বেইজিং নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। অর্থনীতি সমৃদ্ধি দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পরই চীনের অবস্থান।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের ইরানকে সমর্থন দান এবং রাশিয়া সাথে অলিখিত জোট তৈরি করে বিশ্বে যুদ্ধ বিগ্রহ এবং বিবদমান দ্ব›দ্ব নিরসনে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। যার উদাহরণ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানে চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা। করোনা ভাইরাসে এই সংকটকাল মুহূর্তে বিশ্বে চীন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। যা তাদের সক্ষমতার প্রমাণ বহন করে। অপরদিকে ভারত স্বাধীনতার দীর্ঘসময় অতিক্রম করলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ। বরং কাশ্মীর ইস্যু, পাক-ভারত দ্ব›দ্ব, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস, জঙ্গি দমন, মুসলিম বিদ্বেষসহ বিবদমান বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বিশ্বের পরাশক্তির দেশগুলোর সাথে দূরত্ব বেড়েছে। সীমান্তঘেঁষা দেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক এখন শীতল। এমনকি নিজ দেশে বেড়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্ব›দ্ব। দিন দিন সংকীর্ণ হচ্ছে উদার গণতান্ত্রিক চর্চা। কঠোর হিন্দুত্ববাদ মোদি সরকারে সময়ে বেড়েছে মুসলিম নির্যাতন ও বিদ্বেষ।

সরকারি হিসাব মতে, ভারতের মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশ মুসলমান কিন্তু সরকারি চাকরিতে মুসলমানের সংখ্যা মাত্র ২ শতাংশ। দিন দিন বাড়ছে বেকারত্ব হার অবনতি ঘটছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারে। এমনকি সীমান্তে ভারতীয় সেনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোদি সরকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল কংগ্রেস। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং পশ্চিমা মডেলের সাথে সুসম্পর্ক আগামীতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কিছুটা সুবিধা পেতে সাহায্য করবে ভারতকে।

মোটকথা, বর্তমান চীন-ভারতে সীমান্তে উত্তেজনা ঘরোয়া রাজনীতি এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে সংকটকাল সময় অতিক্রম করছে ভারত। এশিয়া মহাদেশে প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি চীনের সাথে যুদ্ধকর পরিস্থিতি টানাপড়েন সম্পর্ক এবং নেপাল-পাকিস্তানের সাথে শীতল সম্পর্ক আঞ্চলিক তথা বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে ভারত যে কৌশলগতভাবে পিছিয়ে পড়লে সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সুতরাং বর্তমান মোদি সরকার এবং কমিউনিস্ট শাসিত চীন দেশের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে যে কোনো মূল্যে সীমান্ত এলাকায় চরম উত্তেজনা প্রশমিত করে শান্তির পতাকা প্রতিষ্ঠা করা। অন্যথায়, এর ব্যত্যয় ঘটলে উভয় দেশের পরিস্থিতি হতে পারে ভয়ংকর। সেই সাথে মোদি সরকারের আগামী দিনে প্রতিবেশী দেশেগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা কূটনীতিক কর্মকৌশলের অংশ হতে পারে।

লেখক-মো. রাশেদ আহমেদ : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

মানবকণ্ঠ/এইচকে

 





ads






Loading...