কে শহীদ, কে সন্ত্রাসী- সিদ্ধান্ত আমেরিকার!

আনসার আব্বাসি। অনুবাদ: বেলায়েত হুসাইন

মানবকণ্ঠ
- ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৩ জুলাই ২০২০, ১০:৪৩

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ওসামা বিন লাদেনকে 'শহীদ' বলে অভিহিত করায় কঠিন এক বিতর্কের সূচনা হয়েছে। দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল- বিশেষত পিপলসপার্টি ও নুন লীগের কতক নেতাকর্মী এবং এদের সঙ্গে কিছু মিডিয়াকর্মীর গায়ে যেন এই ঘটনা আগুনের উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে।

খোদ ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দল তাহরিকে ইনসাফেরও কিছু নেতাকর্মীকে তাদের দলনেতার এমন মন্তব্যে বিব্রত দেখা যাচ্ছে। যেন তারা এই বলে সাফাই গাইতে চাচ্ছেন যে, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুখ থেকে 'শহীদ' শব্দটি অনিচ্ছাকৃত বের হয়ে গেছে- যদিও তাদের কেউ এখন পর্যন্ত এমন কথা বলেননি, তবে তাদের দেখে মনে হচ্ছে, তারা চিৎকার করে বলতে চাইছেন- ইমরান খানের কতো বড় কলিজা! তিনি এমন ব্যক্তিকে 'শহীদ' ভূষিত করলেন যাকে কি না আমেরিকা 'সন্ত্রাসী' ঘোষণা করেছে।

বিন লাদেনকে 'শহীদ' আখ্যায়িতকারী এবং এরকম দুঃসাহসিক মন্তব্যকারী ব্যক্তি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কীভাবে হতে পারেন? আমাদের রাজনীতি এবং আমাদের গণমাধ্যমের মানষিকতা তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, কে 'শহীদ' আর কে সন্ত্রাসী- এটি তো নির্ধারণ করার ঠিকাদারি স্রেফ আমেরিকার, যাদের হাত আজও লাখ লাখ মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত এবং তারাই একেককরে মুসলিম দেশগুলিকে অস্থিতিশীল ও পরিকল্পিত রক্তপাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

নাইন-ইলেভেনের পর থেকে আমরা এটি প্রমাণ করতে পেরেছি যে, আমরা তাই বলবো যা আমেরিকা বলবে, আমরা সেটাই করবো যা তারা আমাদের করতে বলবে- এমনকি আমাদের শ্বাশত ধর্ম ইসলামকেও আমরা তাদের চোখে দেখার মানসিকতায় উপনীত হয়েছি।

আমেরিকার চোখে জিহাদের কোন সুযোগই নেই- আর এজন্যই আমরা জিহাদের আলোচনাও পরিত্যাগ করেছি। আমরা কথা বলবো খেয়ালখুশির, মডারেট ইসলামের- মার্কিনিরা আমাদের থেকে এমনটিই শুনতে চায়।

অগণিত ইখতিলাফ ও বিতর্ক ইমরান খানকে নিয়ে, কিন্তু তার বড় একটি গুণ হল, ইসলামের ব্যাপারে তিনি যেটাকে সঠিক মনে করেন খোলামেলা ও স্পষ্ট করে সেই বিষয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করেন।

তিনি ওসামা বিন লাদেনকে 'শহীদ' আখ্যায়িত করে একপ্রকার আমেরিকার ঘোষণার বিরোধিতা করেছেন- এটি মারাত্মক 'অপরাধ'। আর তার এই অপরাধে হাততালি বাজানো লোকেরা পাকিস্তানে বিন লাদেনের সন্ত্রাস এবং এই সন্ত্রাসের ফলে অসংখ্য নাগরিকের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করতে প্রয়াসী হচ্ছেন।

বাতাসে এও চাউর হচ্ছে, ওসামা বিন লাদেন এবং তাহরিকে তালেবান পাকিস্তান একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, বাস্তবে উভয়ের মধ্যে কোন তফাৎ নেই।

আমাদের মূল সমস্যা হল, আমরা মার্কিনিদের কথা কিংবা প্রপাগাণ্ডা তো ঠিকই মেনে নিচ্ছি, পক্ষান্তরে তাদের তরফ থেকেই যদি ওই প্রপাগান্ডার বিপরীত কোন কথা সামনে আসে তাহলে সেটিকে আমরা গুরুত্বজ্ঞান করি না। অ্যাবোটাবাদ ঘটনার কিছুদিন পরে ২০১২ সালের ৩ মে ডনের একটি খবর প্রকাশিত হয়- যার শিরোনাম ছিল, Qaeda's relations with Pakistan were fraught with difficulties।

ডনের এই প্রতিবেদনটি করেছিলেন পত্রিকার ওয়াশিংটন-সিনিয়র রিপোর্টার আনওয়ার ইকবাল। প্রতিবেদনে অ্যাবটাবাদ অভিযান ও বিন লাদেন প্রসঙ্গে কিছু তথ্য ছিল। সূত্রমতে এসব তথ্য দিয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনী।

তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডন উল্লেখ করেছিল, আল কায়েদার সঙ্গে তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান ( টিটিপি) এর গুরুতর মতবিরোধ ছিল, আর এই মতবিরোধের মূলে ছিল পাকিস্তানে একাধিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে টিটিপির জড়িয়ে পড়া। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, টিটিপির সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ফলে আল কায়েদার দুই নেতা সেই সময়ের টিটিপি- নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদকে চিঠি পাঠান- চিঠিতে তারা টিটিপির আদর্শ, পদ্ধতি ও আচরণ সম্পর্কে তাদের হতাশা ও অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন।

চিঠিতে আল কায়েদা টিটিপিকে এই মর্মে সতর্কও করে যে, যদি তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান তার ওইসব দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করে-যা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী, তাহলে আল কায়েদা তাদের বিরুদ্ধে যে কোনও প্রকাশ্য পদক্ষেপ নেবে।

প্রকাশিত ওই তথ্য অনুযায়ী এ কথাও স্পষ্ট হতে শুরু করে- ২০১০ সালে নিউইয়র্ক স্কয়ারে টিটিপির ফয়সাল শেহজাদের ব্যর্থ হামলার বিষয়ে ওসামা বিন লাদেনের কোন পূর্বজ্ঞান ছিল না, ফয়সালের এই কান্ডে বিন লাদেন যারপরনাই হতাশ হন এবং বলেন, তিনি ওয়াদা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন এবং জিহাদের ধারণাটিই সে নষ্ট করে দিয়েছে।

স্পষ্টতই ওসামা বিন লাদেন কিংবা অন্য কোনও আল-কায়েদা-নেতার লেখা অন্য একটি চিঠির কথা উল্লেখ করে ডনের ওই খবরে পাকিস্তানি তালেবান সম্পর্কে 'Black Reputation of Pakistani Taliban' শব্দগুলি লিখেছিল।

চিঠিতে আরো লিখা হয়েছিল যে, টিটিপি ধর্মীয় ও জাতিগত নেতাকর্মীদের পাশাপাশি মসজিদ এবং জনসমাগমপূর্ণ জায়গাগুলিতেও হামলা করে- যেখানে নারী শিশু ও সাধারণ নিরীহ মানুষকে নিশানা করা হয়। আর মসজিদ ও নিরীহদের ওপর হামলা পরিচালনাকারীরা কখনোই ভাল মানুষ হতে পারে না।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান প্রসঙ্গে লিখা হয়, 'I have no doubt that what is happening to the Jihandi movement in these countries is not misfortune, but punishment by God on us because of our sins and injustices and because some of us are silent over these sins.'

অর্থ: আমার কোন সন্দেহ নেই যে, যেসব দেশে কথিত জিহাদি সংগঠনগুলির মাধ্যমে যা হচ্ছে- তা দূর্ভাগ্য নয়; বরং এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের পাপাচার ও বেইনসাফীর শাস্তি। কারণ, আমাদের কেউ আমাদের পাপকর্মের বিষয়ে কথা বলে না।

এরপর চিঠিতে আরো লিখা হয়- একজন মুজাহিদ ওই আমিরের অনুসরণ করতে পারে না যখন তার অনুসরণ মুজাহিদকে আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। যদি কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে শাহাদাত বরণ করে তাহলে তার ঋণ পরিশোধের আগে সে মাফ পাবে না।

তাহলে এই পরিস্থিতিতে ওই ব্যক্তি কিভাবে ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে যে বেশুমার নিরীহ মানুষের হত্যাকারী- এমনকি অসংখ্য মুসলমানের রক্তও সে ঝরিয়েছে?

সবশেষে চিঠিতে পাকিস্তানি ও আফগানিস্তানি তালেবান-নেতাদের উল্লেখিত বিষয়ের ওপর চিন্তা করার আহবান জানিয়ে হত্যা ও হানাহানি বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়।

(২৯ জুন জিয়ো নিউজ, ডেইলি জং উর্দু সহ পাকিস্তানের একাধিক প্রভাবশালী গণমাধ্যমে প্রকাশিত দেশটির বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট আনসার আব্বাসির কলামটি অনুবাদ করেছেন বেলায়েত হুসাইন।)

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads






Loading...