বিসিএস ও 'ব্যাড প্যারেন্টিং'

পারমিতা জয়িতা

বিসিএস ও 'ব্যাড প্যারেন্টিং'
পারমিতা জয়িতা - -লেখিকার ফেসবুক থেকে নেয়া

poisha bazar

  • ০২ জুলাই ২০২০, ২০:৫৫,  আপডেট: ০২ জুলাই ২০২০, ২০:২১

নিজের পেশা বাছাই করার অধিকার মানুষের থাকা উচিত। কিন্তু যখন সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়ার জন্য ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার নির্বিশেষে সবাই ব্যস্ত হয়ে যায়, তখন আমাদের কিছু সাধারণ বিশ্লেষণ দরকার আছে। আসেন চেষ্টা করি। বিসিএসে টিকা কি একটা অর্জন?- বাংলা ইংরেজি সাধারণ পড়ে সিভিল সার্ভিসে ঢোকা ব্যক্তির অর্জন। কিন্তু তার ভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট, পাড়া-প্রতিবেশি সবাই এটা নিয়ে গর্বিত হওয়ার মতো কোনো "সামাজিক" অর্জন এটা না।

সিভিল সার্ভিস কাদের জন্য? -যেকোনো মানুষ যে তার রাষ্ট্রকে সার্ভ করার ইচ্ছা পোষণ করেন বা মানসিকতা রাখেন, বিসিএস পরিক্ষায় অংশ নিতে পারেন। কিন্তু কতজন মানুষ এই মানসিকতা নিয়ে সিভিল সার্ভিসে ঢুকতে চান? বিসিএস বেশির ভাগ মানুষের চোখে একটা বিনিয়োগের মতো।

অনার্স শেষ করে, কিছু সময় বাংলা ইংরেজি পড়ে যদি একটা ভালো চাকরি, বাসস্থান, গাড়ী, সুন্দরী বৌ, সম্মান (কথিত) পাওয়া যায়, তবে ক্ষতি কী? এই মানসিকতা নিয়ে যখন একজন মানুষ সিভিল সার্ভিসে যান, যার চিন্তার গোঁড়ায় গলদ, সে একটু একটু করে দেশ বিক্রি করে পকেট ভারী করবে না তো কে করবে?

একটু খোলামেলা বলা যাক, সরকারি বহু কাজে যেসব দুর্নীতি হয়, অনুমোদনে গিয়ে দেখা যায় তাতে কোন ক্যাডারের যোগসাজস আছে! আমার ট্যাক্সের টাকায় রাস্তা তৈরি হয়, ক্যাডারদের ঘরে এসি টিভি চলে, আমি কেনো জবাব চাইবো না!

ক্যাডারদের নিয়ে আমারা পরে কখনও আলোচনা করবো। আজ বিষয়ে থাকি।

বিসিএস এর সাথে বাজে অভিভাবকত্ব বা  'ব্যাড প্যারেন্টিং' কি করে সম্পর্কযুক্ত?- আমাদের জেনারেশানে বিসিএসের এই বিশাল ক্রেজের পিছে "বাজে অভিভাবকত্ব" যার মূলত দায়ী। আমাদের বাবা মা তাদের সাফল্য আর ব্যর্থতা সব আমাদের ওপর চাপাতে চান। পরিবার থেকে কোনো ক্যাডার নাই, তুমি বিসিএস দাও। তোমার বাবা ক্যাডার, অতএব, তোমারও ক্যাডার হওয়া উচিত।

ছোট থেকে আমাদের বাবা মা (খুব সম্ভবত শেষ অশিক্ষিত জেনারেশান) অন্যদের সাথে আমাদের তুলনা করে আমাদের ইনসিকিউর আর ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগা মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। যেহেতু বিসিএস হচ্ছে সর্বোচ্চ সম্মানসূচক চাকরি (যদিও সম্মান টাকার অংকের না, রাষ্ট্রকে সেবা দেওয়ার) আর বাবা মা ছোটো থেকে তাদের বাচ্চাদের একটা ট্রফির মতো করে বড় করে, তারা চায় বাচ্চা বিসিএস ক্যাডার হোক।

এখন অন্তত, "বাবা-মা যা করে বাচ্চার ভালোর জন্যই করে"- এরকম কিছু আমাকে বলতে আসবেন না। এটা ২০২০, ঘুম থেকে ওঠেন। বাবা মা নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে প্রথমে আমাদের বুয়েট-ঢাবি-মেডিকেলে টিকার বিষয়টা সূক্ষ্মভাবে আমাদের মাথায় ঢুকায়ে দেন। আর অবশেষে বিসিএস।যেহেতু, সন্তান হিসেবে আমরা সবসময়ই অপরাধবোধে ভুগি, বাবা-মাকে গর্ববোধ করানোর জন্য আমরা বিসিএসকে বাছাই করি।

এখন শেষ প্রশ্ন, ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে বিসিএস দেওয়াটা কতটা যুক্তিযুক্ত? -এর পিছেও সূক্ষ্মভাবে বাজে অভিভাবকত্ব যুক্ত। আমরা যারা পাবলিক ভার্সিটিতে পড়ি, মোটামুটি একটা ভালো সরকারী কলেজ আর স্কুলে পড়েই আসি। এসব জায়গায় টিকার জন্য অনেক পরিশ্রম করে পড়াশোনা করে, অনেক ক্যান্ডিডেটকে পিছে ফেলে দিতে হয়। তো আমরা ভাবি, মন্দার বাজারে বিনামূল্যে শিক্ষা পাওয়াটাই আমাদের অধিকার। (এজন্য আমরা প্রাইভেটে পড়া শিক্ষার্থীদের ছোটো করতেও পিছপা হই না) আমাদেরকে এভাবেই বড় করা হয়।

আমরা কখনও ভাবি না, কতগুলো মানুষের কষ্টের টাকায় আমাদের পড়াশোনা চলে। কত টাকা দিয়ে একটা অহংকারী 'চামারকে' চার বছর পড়িয়ে সার্টিফিকেট দিয়ে উচ্চশিক্ষিত করা হয়। যেহেতু এসব নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নাই, কৃতজ্ঞতাও নাই। আর ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার হতে যত টাকা খরচ হলো, সব জলে ফেলে ক্যাডার হয়ে গরীবের ট্যাক্সের টাকায় গাড়িতে চড়তেও কারোর লজ্জা হবেনা, এটা খুবই স্বাভাবিক।

পরিশেষে একটা কথা, হ্যাঁ, সবার নিজের প্রফেশন বাঁছাই করার অধিকার থাকা উচিত। তবে গরীবের ট্যাক্সের টাকায় পড়ে সিভিল সার্ভিসে ঢুকে রাস্তায় গর্ত তৈরি করা আর আপনাকে মাত্র একটা ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী দিয়ে গবেষণা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ করতে না পারায় দেশকে গালিগালাজ করে বিদেশে চলে যাওয়ার যে লুপ, এখানে থেকে আমাদের বের হয়ে আসা উচিত।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/আরএস





ads






Loading...