চিনতে হবে চীনকে

আনন্দ কুটুম

চিনতে হবে চীনকে আনন্দ কুটুম

poisha bazar

  • ২৫ জুন ২০২০, ০০:০০

চিনের খেলাটা দারুণ লাগছে। এই মাত্র সংবাদ পেলাম, পাকিস্তানের সাথে চীনের বাণিজ্য চুক্তি আরও সম্প্রসারণ হচ্ছে। উইঘুর-ফুইঘুর নিয়ে এদেশের যে সব মুসলিমরা চিন্তিত তারা হয়ত জানেনই না যে চীনের সবচে কাছের বন্ধু হল পাকিস্তান।

চীন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সমর্থন করেছিলো- কারণ, পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলে ভারত শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ঠিক একই কারণে আমেরিকা ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছিলো। যেহেতু আমেরিকা পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছিলো, তাই রাশিয়া সাপোর্ট দিয়েছিলো ভারত তথা বাংলাদেশকে।

পাকিস্তান যেহেতু OIC সদস্য সুতরাং দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড় মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে দিতে পারলে ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটু শক্তিশালী হতে পারবে। সেই স্বার্থে ইজরায়েল সমর্থন দিয়েছিলো বাংলাদেশকে। যদিও ইজরায়েলের বড় বন্ধু আমেরিকা ছিলো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। অন্য বিষয়ে ইজরায়েল আর আমেরিকা সহমত হলেও বাংলাদেশ বিষয়ে সহমত হতে পারল না।

বাংলাদেশ যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম বাজারে নিজের শ্রম বিক্রি করতে চায় সুতরাং বাংলাদেশ ইজরায়েলকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে গেলো Organization of Islamic cooperation টিমে। যার ফল স্বরূপ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম বাজার থেকে বাংলাদেশ আজ অব্দি আয় করে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি ডলারের রেমিট্যান্স।

ঘটনা যেমনই হোক, যে রাজনৈতিক দলই এদেশে ক্ষমতায় আসুক না কেন, কেউই কখনো পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারবে না। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও নিষিদ্ধ করতে পারবে না। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেই OIC'র চাপের মুখে পড়তে হবে, যা সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত রেমিট্যান্সের উপরে আঘাত হানবে।

ইটা বহু পুরাতন রাজনীতি। শুরু হয়েছিলো আরও ১০০ বছর পূর্বে। মজার ব্যাপার হলো, এই রাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশ একটা দাবার গুটি ব্যতীত কিছুই না। তবে যতক্ষণ বুদ্ধি করে কোটে টিকে থাকতে পারবে ততোক্ষণই বাংলাদেশের লাভ।

পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার পর ভারত অটোমেটিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। চিন্তায় পরে যায় চীন। চীন যেহেতু রাজনৈতিক ভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছিলো সুতরাং বাংলাদেশের সাথে রাজনৈতিক সক্ষতা তৈরিতে টাইম লেগে গেছে ৫০ বছর। তবে এর মধ্যে দিয়েই চীন নানা কৌশলে বাংলাদেশের বাজার দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের বাজার যখন পুরপুরিই চীনের কব্জায় তখন চীন বাংলাদেশকে দিলো নতুন টোপ- ৯৭% পণ্যে ডিউটি ফ্রী, করোনা ভ্যাক্সিন, ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো- ডিউটি ফ্রী দিক আর নাই দিক, বাংলাদেশ চায়নার কাছে বিক্রি করবেটা কী? কী আছে বাংলাদেশের বিক্রি করার মত? আর চায়নারা যেখানে নিজেরাই নিজেদের পণ্য উৎপাদন করে বিক্রি করে সে কেন বিদেশি পণ্য ক্রয় করবে? সুতরাং 'ইটস কাইন্ড এ ব্লাফ'!!

এই গেইমের রেসে ভারত সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে। ভারত গত ৫০ বছর বাংলাদেশকে টেকিং ফর গ্রান্টেড নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হয়েছে। চায়না এখন সেই সুযোগটাই নেওয়ার চেষ্টা করছে।

দক্ষিণ এশিয়াকে কব্জায় রাখতে হলে, (বিশেষ করে ভারত ও চায়নাকে) আমেরিকার চাই দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী এক টুকরো জমিন বা স্ট্রং ফ্রেন্ডশিপ। ভারত এবং চায়না তো সেটা কোন মতেই হতে দেবে না। সুতরাং আমেরিকার প্রথম দাবার গুটি পাকিস্তান থাকলেও, পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার পরে আমেরিকা তার ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে ভারতের সাথে বন্ধুত্ব উন্নয়নে মনোযোগ দেয়। কিন্তু তাও বেশিদূর এগোয়নি। সুতরাং আমেরিকার জন্য বাংলাদেশও অন্যতম একটি হটস্পট।

এদিকে চায়নার মদদে, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মায়ানমার, ভূটান, নেপাল ধীরে ধীরে সরে গেছে ভারতের কাছ থেকে। ভারতের সেভেন সিস্টারের ৭ রাজ্য, সাথে কাশ্মীর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে স্বাধীনতার জন্য। মদদ দিচ্ছে চায়না এবং পাকিস্তান। ভারতে অন্ততপক্ষে একটি রাজ্য স্বাধীন হতে পারলেই খেলা আরও জমে যাবে। চায়নার তিব্বত আর পাকিস্তানের বেলুচিস্তানকে স্বাধীন করতে উঠেপড়ে লেগেছে ভারত। ওদিকে চায়নার হংকং এবং তাইওয়ান স্বাধীন হবার জন্য একেবারে বউ সেজে বিয়ের পিঁড়িতে বসে আছে। কেবল উলুধ্বনি দিলেই হয়!!

অন্যদিকে আমেরিকাকে ঠেকাতে রাশিয়া এবং জাপান সব সময় বাংলাদেশের উপর নিরবিচ্ছিন্ন বিনিয়োগ করে যাছে। কারণ, আমেরিকা বাংলাদেশের দখল নিলেই রাশিয়া এবং জাপান বিপাকে পড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। যুদ্ধ না করেও, বাণিজ্য না করেও কেবল রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়েই পরাশক্তিগুলোর রাজমুকুটের কোহিনূর হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করা যায়। স্রেফ দুটো পলিসি মেইনটেইন করতে হবে।

এক. অভ্যন্তরীণ নোংরা রাজনীতি বন্ধ করে সকল দল মিলে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। (অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল থাকলেই বাইরের শক্তিগুলো গেইম খেলার সুযোগ পাবে)।
দুই. দেশের জনগণকে শিক্ষিত করতে হবে। হাই বাম্পার ফলনশীল জনগণের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হতেই থাকবে। এটা বন্ধ করা যাবে না। সুতরাং সেই জনগণকে বোঝা না বানিয়ে শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করে ফেলতে হবে। (*শিক্ষা মানে শুধু ইউনিভার্সিটির উত্তীর্ণ শিক্ষা নয় আবার, যা আসলেই কোন কাজে লাগে না জীবনে)। শিক্ষা মানে হল অন্তত কমপক্ষে চায়নার সমকক্ষ শিক্ষা। এরপর এই বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের কন্ট্রিবিউশান রাখতে হবে। ব্যাস!! জীবন সুন্দর...।

লেখক-আনন্দ কুটুম : চলচ্চিত্রকর্মী, সমালোচক ও উদ্যোক্তা।

মানবকণ্ঠ/এইচকে 





ads







Loading...