জর্জ ফ্লয়েড হত্যা : 'বর্ণবাদ' শব্দটি মুছে যাক 

সুজন হাজং

মানবকণ্ঠ
- সংগৃহীত

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৩ জুন ২০২০, ১৪:২৯

১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট। দিনটি আমেরিকার ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন। এদিন ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণটি I have a dream শিরোনামে পরিচিত। সেদিন সেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে অন্যতম I have a dream

এই ভাষণে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। এই ভাষণে তিনি একটি শোষণহীন, বঞ্চনাহীন সমাজ ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন। যেখানে একজন মানুষ মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করবে, মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করবে। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ, কোনো বৈষম্য থাকবে না। একজন মানুষ মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সুবিধা পাবে। সমান অধিকার পাবে।

আজকে এই ভাষণটি আবার আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে সেদিনের কথা। যখন একজন কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকের উপর অত্যাচার করা হয়। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা প্রদেশে জর্জ ফ্লয়েড নামে একজন ৪৬ বছর বয়স্ক কৃষ্ণাঙ্গকে প্রকাশ্যে রাস্তায় গলায় হাঁটু দিয়ে চাপা দিয়ে হত্যা করেন একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্য। মৃত্যুর আগে ফ্রয়েড বারবার অনুরোধ করেছিলেন, 'প্লিজ প্লিজ, আই কান্ট ব্রিদ', 'আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না'। ফ্রয়েডের সেই হৃদয়স্পর্শী আকুতির ভাষা বুঝতে চাননি সেই অমানবিক, নিষ্ঠুর পুলিশ অফিসারটি। এরকম জঘন্য নিষ্ঠুরতার দৃশ্য হতবাক করে দিয়েছে বিশ্বকে।

হত্যাকাণ্ডের সেই ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই গোটা পৃথিবী জুড়ে তীব্র নিন্দা এবং সমালোচনার ঝড় উঠেছে। জর্জ ফ্লয়েড ছিলেন একজন আফ্রিকান-আমেরিকান। তাকে হত্যার বিচারের দাবিতে ওয়াশিংটন ডিসিসহ নিউজিল্যান্ড, কানাডার টরেন্টো, জার্মানির বার্লিন, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, ব্রিসবেন, মেলবোর্নে পোষ্টার এবং প্লেকার্ড হাতে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। নিউইয়র্ক এবং আটলান্টায় বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ এবং সংঘর্ষ দমন করতে কারফিউ জারি করেছে মার্কিন প্রশাসন।

অন্যদিকে জর্জ ফ্লয়েডের বোন বলছেন, আমার ভাইয়ের হত্যার শেষ মুহূর্তের দৃশ্যটি নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছি না। শুধুমাত্র সন্দেহের বসে কাউকে এভাবে মেরে ফেলা যায়?

প্রশ্ন উঠেছে, জর্জ ফ্লয়েড কৃষ্ণাঙ্গ না হয়ে শ্বেতাঙ্গ হলেও কি তার সাথে একি আচরণ করতেন? তুমুল সমালোচনার মুখে সেখানে দায়িত্বে থাকা চারজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জর্জ ফ্লয়েডের বোন দাবি করছেন তাদের বহিষ্কারই যথেষ্ট নয়। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্য মার্কিন প্রশাসন কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছে।

আমেরিকায় বর্ণবৈষম্য দূর করার পেছনে মার্টিন লুথার কিং যেমন একজন অগ্রদূত ছিলেন। তেমনি বারাক ওবামাও একজন শান্তির দূত ছিলেন। তাঁদের মতো বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন কেন আমরা দেখতে পারবো না? এই প্রশ্ন এখন জনে জনে।

শান্তিতে নোবেলজয়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০০৪ সালে ডেমোক্রেটিক দলের কনভেনশনে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, "There’s not a black America and white America and Latino America and Asian America; there’s the United States of America.”

বারাক ওবামা বর্ণবাদে কখনো বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি আমেরিকাকে কখনো সাদা কালো বর্ণের ভেতর দিয়ে দেখেননি। তিনি গোটা আমেরিকাকে দেখেছেন তাঁর সাম্যের চোখ দিয়ে। তাঁর পরিবর্তনের দৃষ্টি দিয়ে।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। এই লড়াই করতে গিয়ে তিনি ২৭ বছর জেল খেটেছেন। বর্ণবাদ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমি বর্ণবাদকে ঘৃণা করি কারণ এটা একটা বর্বর বিষয়, তা সে কালো বা সাদা যে কোনো মানুষের কাছ থেকে আসুক না কেন”। শান্তিতে নোবেলজয়ী ম্যান্ডেলা বিশ্বাস করতেন, কালো মানুষরাও বর্ণবাদহীন একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে। মাথায় উপর একটি রংধনুর আকাশ দেখে।

জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যার মধ্য দিয়ে 'বর্ণবাদ' শব্দটি আবারও পাথর হয়ে চেপে বসেছে গোটা পৃথিবীর মানবিক মানুষের বুকে। তারা বলছেন, বর্ণবাদের হিংসা ও ঘৃণার বিস্তার রোধ করতে না পারলে গোটা পৃথিবীতে নেমে আসবে ভয়ংকর পরিণতি। সকলেই চান বর্ণবাদ শব্দটি ভবিষ্যতের মানবিক পৃথিবী থেকে মুছে যাক। মানব সভ্যতায় যেন বর্ণবাদের নতুন মেরুকরণ আর না হয়।

লেখক: সুজন হাজং, গীতিকার।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...