প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যাকাণ্ড : একটি যৌক্তিক পর্যালোচনা

এম এল গনি

মানবকণ্ঠ
এম এল গনি - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৯ মে ২০২০, ১৫:৪৬

আমি নিজেও দেশে থাকতে সরকারি অফিসে প্রকৌশলী হিসেবে কয়েক বছর কাজ করেছি। সে অভিজ্ঞতা থেকে এ কথাগুলো বলছি। পত্রপত্রিকায় খবর এসেছে, 'প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে, সহকর্মীর সাথে অন্তর্দ্বন্দ্বে এ হত্যাকাণ্ড।' আমি এ তথ্যের সাথে একমত হতে পারছি না। কেননা, এ বক্তব্য যুক্তিতে টেকে না।

কিছু কথা বলা হয়তো সমীচীন হচ্ছে না। তারপরও না বলে পারছি না। কারণ, এ হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বুঝতে ভেতরের কিছু বিষয় আমাদের জানতেই হবে। সাধারণভাবে, বাংলাদেশে অন্য যেকোনো ব্যবসার মতো ঠিকাদারি ব্যবসাও দুর্নীতির ক্যান্সারে আক্রান্ত। একটা উদাহরণ দেই। দশ কোটি টাকার একটা কাজ পেতে ঠিকাদার কাজটির কার্যাদেশ বা ওয়ার্ক অর্ডার পাবার আগেই দশ-পনেরো পার্সেন্ট খরচ করে ফেলেন। কার্যাদেশ পাবার পর আরেক দফা খরচ থাকে ঠিকাদারের। আবার কাজ চলাকালীন থাকে বিভিন্নজনের পার্সেন্টেজ। প্রতিটি অফিসে নির্দিষ্ট থাকে কার পার্সেন্ট কতো? এখানে কেবল ইঞ্জিনিয়াররা নন, একাউন্টস, এডমিন, অডিট হতে কেউ বাদ যান না; ধরা পড়লে যদিও ইঞ্জিনিয়ারের উপর সব দায় বর্তায়। কারণ, নন-ইঞ্জিনিয়াররা তখন কাজের কোয়ালিটি বা মেজারমেন্ট বুঝেন না যুক্তিতে সহজেই পার পেয়ে যান।

নির্ধারিত পার্সেন্টের বাইরেও আবার কিছু আইটেম থাকে। সেগুলোর অর্থ ঠিকাদারের সাথে আধাআধি ভাগ হয়। এ ধরনের একটা পপুলার আইটেম হলো, কোথাও মাটি ভরাটের আগে ঘাস, ময়লা-কাদা, ইত্যাদি তুলে ফেলে দেবার আইটেম। সাধারণত এই আইটেমের কাজ না করেই ঠিকাদারকে বিল দেয়া হয়। এরকম আরো অনেক চুরির আইটেম থাকে, যা লিখলে এ লেখা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। একেবারে কাজ না করে বিল দেয়া আইটেমগুলোতে ডিপার্টমেন্টের সাথে অর্ধেক টাকার ভাগাভাগিটা কিছু ক্ষেত্রে বিল করার আগেই হয়ে যায়। এ নির্ভর করে ঠিকাদার কতটা নির্ভরযোগ্য তার উপর। এভাবে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি হিসেবে নিলে দেখা যাবে, দশ কোটি টাকার কাজে দুই কোটির কাজও হয়তো হয়নি।

এছাড়া একই কাজের বিল বারবার করার মতো পুকুর চুরিও অনেকসময় হয়ে থাকে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের যে তিনটি কাজের বিল প্রকৌশলী দেলোয়ার আটকে রেখেছিলেন বলে আলোচনা চলছে সেক্ষেত্রেও একই কাজের বিল বারবার (এক্ষেত্রে তিনবার) করার মতো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিলো। তারমানে, কেবল একটি কাজের তেত্রিশ কোটি টাকার বিল করা হচ্ছিলো নিরানব্বই কোটি টাকায়। তাছাড়া এই তেত্রিশ কোটি টাকার মূল কাজ, যার তদন্ত করলে হয়তো দেখা যাবে প্রকৃত কাজ দশ কোটি টাকারও হয়নি। মোটকথা, দশ কোটি টাকার কাজের বিল হতে যাচ্ছিলো প্রায় শত কোটি টাকায়। বুঝুন এবার, বাংলাদেশে দুর্নীতি কোন পর্যায়ে!

উন্নয়ন প্রকল্পের উন্নয়ন হিসাব করা হয় অর্থ খরচের হিসেবের ভিত্তিতে। অর্থাৎ, প্রয়াত প্রকৌশলী দেলোয়ার ম্যানেজড হয়ে বিল স্বাক্ষর করে দিলে টাকার অংকে আরো নিরানব্বই কোটি টাকার উন্নয়ন হয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশে, যেখানে প্রকৃত উন্নয়ন হয়তো কেবল দশ কোটি টাকার। এই তালে যদি সারাদেশের উন্নয়ন হয়ে থাকে তবে একথা মেনে নেয়াই যুক্তিসঙ্গত যে আমরা সাধারণভাবে উন্নয়নের যে গল্প শুনি তার প্রকৃত সত্য হয়তোবা এক-দশমাংশ, বাকিটা চুরি।

যাক, এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। প্রশ্ন হলো, স্রেফ অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে সহকারী প্রকৌশলী সেলিম তাঁর বস নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ারকে আসলেই হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটাতে পারেন কি না? বাংলাদেশের ঠিকাদারি কাজে পার্সেন্টেজ ভাগাভাগির যে চিত্র অতি সংক্ষেপে উপরে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি তা আরেকটু ব্যাখ্যা করা দরকার। ডিপার্টমেন্ট, এক্ষেত্রে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, এর অভ্যন্তরে ঠিকাদারের বিল হতে আনঅফিসিয়ালি সংগৃহীত পার্সেন্টেজের টাকা কে কত শতাংশ ভোগ করবেন তার একটা গোপন হিসাব থাকে। উপর হতে নিচ সব লেবেলই এই টাকার ভাগ যাবার কথা। সঙ্গতকারণেই, সেখানে সহকারী প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীরও আলাদা ভাগ নির্দিষ্ট থাকে। দায়িত্বরত নির্বাহী প্রকৌশলীকে মেরে ফেললে মৃতের চার্জ নেবেন আরেক নির্বাহী প্রকৌশলী। সেক্ষেত্রে মরহুমের ভাগের অর্থ নতুন নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছেই যাবে। এই টাকার মালিক কোনভাবেই সহকারী প্রকৌশলীর হতে পারে না। কেননা, আগের নির্বাহী প্রকৌশলী মারা গেছেন বলে সহকারী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরে তো আর বিল ছাড় হবে না!

আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ারকে হত্যা করে সহকারী প্রকৌশলী সেলিম বেশি লাভবান হবার সম্ভাবনা যেহেতু নেই, তিনি কেন ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করে তাঁর বসকে হত্যা করতে যাবার মতো বড়ো ঝুঁকি নেবেন? বাংলাদেশে ঠিকাদারি কাজের বিলের অর্থের লেনদেন কীভাবে হয় তা যাঁরা বুঝেন, অন্ততঃ তাঁরা 'কলিগদের অন্তর্দ্বন্দ্বের' এ থিওরি মেনে নিতে পারেন বলে আমার মনে হয় না। এমন ধারণা যুক্তিতে টেকেনা। এটা অবশ্যই হত্যাকাণ্ডের ডাইরেক্ট বেনিফিশিয়ারি, অর্থাৎ ঠিকাদার এবং তাঁদের প্রশ্রয়দাতাদের কাজ। তারা বড় ধরনের কোনো টোপ বা চাপ দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী সেলিমকে এ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করেছেন বলেই যৌক্তিক মনে হয়।

প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে দেশ দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। উন্নয়ন কাজের নামে অর্থের অপচয় আরো অনেকগুণে বেড়ে যাবে। তাই দেশপ্রেমিক নাগরিকদের উচিত হবে যার যার অবস্থান হতে প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যার ন্যায় বিচার দাবি করা। প্রকৌশলীদের সংগঠন আইইবি এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। এটি শুধু নিহত দেলোয়ারের পরিবারের স্বার্থে নয়, দেশের স্বার্থেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের কাছে একটি স্বাধীন দেশ এভাবে জিম্মি থাকতে পারে না। তাছাড়া সততার মূল্যায়ন না করা অসততাকে প্রশয় দেয়ারই নামান্তর। অধিকন্তু, হত্যাকারী সেলিম এবং অন্য দুজন, যাঁরা মাঠ পর্যায়ে এ হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছেন, তাঁদের যেন কোনভাবেই ক্রসফায়ারে দেয়া না হয়। তেমন কিছু ঘটলে চাঞ্চল্যকর প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যা তদন্তের অপমৃত্যু ঘটবে।

(লেখকের মতামত একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত। এর সঙ্গে মানবকণ্ঠের সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো যোগ নেই।)

লেখক- এম এল গনি : কানাডা প্রবাসী লেখক, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট ও প্রকৌশলী।
[email protected]





ads







Loading...