একটি অবহেলিত জনপদের স্বাস্থ্য বিভাগ ও একজন মকছেদুল মোমিন…

একটি অবহেলিত জনপদের স্বাস্থ্য বিভাগ ও একজন মকছেদুল মোমিন
একটি অবহেলিত জনপদের স্বাস্থ্য বিভাগ ও একজন মকছেদুল মোমিন - ছবি: প্রতিনিধি

poisha bazar

  • শাহিদুল হাসান খোকন
  • ১৪ মে ২০২০, ১২:৫৬,  আপডেট: ১৪ মে ২০২০, ১৩:৩৭

ভীষণ একটা যুদ্ধ চলছে বিশ্বজুড়ে। হ্যাঁ, করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথাই বলছি। আর এই যুদ্ধে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা হলেন ডাক্তার। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ডাক্তারদের মাঝেও আতঙ্কটা কম নয়। ডাক্তাররা অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

এসব আতঙ্ক নিয়েই নিজেদের জীবন বিপন্ন করে মানুষের জন্য লড়াই করে চলেছেন দেশের চিকিৎসকরা। করোনাকালে পরিচয় ঘটল একজন মানবিক ও দেশ প্রেমিক চিকিৎসকের সাথে। তিনি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মকছেদুল মোমিন।

সম্প্রতি দীর্ঘদিন পর ব্যক্তিগত কাজে ২ দিন যেতে হয়েছে আমার নিজের উপজেলা মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ১৭ এপ্রিল গিয়েছিলাম অনেক রাতে। সেদিনই মূলত: প্রথম পরিচয় ঘটেছিল ডা. মকছেদুল মোমিনের সাথে। কিন্তু রাতের কারণে ওখানে অবস্থান ও আলাপটা ছিল ক্ষণিকের।

দ্বিতীয় দফায় যাই ২ মে সকালে। দিনের বেলায় হাসপাতাল কমপ্লেক্সে যাওয়া প্রায় ২০ বছর পরে। এই ২০ বছরের বিভিন্ন সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের কল্যাণে গণমাধ্যমে পড়েছি একটা জরাজীর্ণ হাসপাতালের খবর। তাই চোখের সামনেও ভেসেছে একটা জরাজীর্ণ চিত্রই। কিন্তু এবার হাসপাতালে যেয়ে চোখের দেখাটা একেবারেই ভিন্ন। বদলে গেছে পুরো হাসপাতাল কমপ্লেক্স।

হাসপাতাল কমপ্লেক্সে অবস্থানরতদের সাথে কথা বলে জানলাম এর কারিগর বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মকছেদুল মোমিন। তিনি এখানে এই পদে যোগদানের পরই মূলত বদলে গেছে জরাজীর্ণ হাসপাতালের চিত্র। গণমাধ্যমে ভাষায় গোচারণ ভূমিতে আর গরু চড়ে না এখন। নিরাপত্তা বাউন্ডারি সংস্কার করায় সেখানে গরু-ছাগলের প্রবেশের সুযোগ নেই। যারা গরু-ছাগল চড়াতেন তাদের কথা বিবেচনা করে ভেতরে ব্যবস্থা হয়েছে ঘাস আবাদের।

সময় ধরে সেটা কেটে নিয়ে যাচ্ছেন গরু-ছাগল মালিকরা। হাসপাতালের মূলভবনের সামনে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল ফুলের বাগান। বাহারী পদের ফুল গাছে ভরে ফেলা হয়েছে বাগান। হাসপাতালের নোংড়া গন্ধের পরিবর্তে সেখান থেকে ছড়াচ্ছে ফলের সুগন্ধ। আগে কমপ্লেক্স ভবনে থাকতেন না আবাসিক ডাক্তাররা। আবাসিক এলাকাটাকে সমৃদ্ধ করতে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে মিনি পার্কসহ ছোট ছোট স্থাপনা।

আবাসিক কর্মকর্তারা সেখানে সুযোগ পাচ্ছেন শাক-সবজি উৎপাদনের। গ্রামের মানুষ দূরদুরান্ত থেকে বাইসাইকেল চালিয়ে আসেন স্বাস্থ্য সেবা নিতে। এসব সাইকেল চুরি ঠেকাতে গড়ে তোলা হয়েছে সাইকেল স্ট্যান্ড। আবাসিক/অনাবাসিক রোগী, কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে মসজিদ। অনাবাসিক রোগীদের জন্য করা হয়েছে ওয়েটিং জোন।

ডা. সাহেবের পরিকল্পনা থেকে বাদ যায়নি বিষ খাওয়া রোগী আর মৃত মানুষের গোসলের চিন্তাও। গ্রামাঞ্চলে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা নিত্যদিনের ঘটনা। এসব রোগীদের খোলা জায়গায় শুইয়ে চিকিৎসা করা হত। এখন এসব রোগীদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে আলাদা স্থান। পাশেই মৃত মানুষের গোসলের ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য সেবাতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। বিস্তিৃর্ণ ফাঁকা জায়গায় সারি সারি লাগানো হয়েছে কমলার গাছ।

হাসপাতাল কমপ্লেক্স স্থাপনের পর কয়েক ডজন কর্তা এসেছেন এখানে। এতদিনে এসব কেন হলো না? তিনিই বা কেন পারলেন এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হলো ডা. মোমিনের সঙ্গে। বড় দা সুব্রত সরকারকে (দৈনিক সংবাদের স্থানীয় প্রতিনিধি) সাথে নিয়ে গেলাম ভদ্র লোকের কক্ষে। করোনাকালেও বেশ কিছু রোগী লাইনে দাঁড়িয়ে রুমের সামনে।

স্থানীয় সাংবাদিকদের যে কত ক্ষমতা সেটা তৃণমূলে না গেলে আসলে বোঝা যায় না। সুব্রত সরকারকে দেখতেই তিনি মনোযোগী হলেন আমাদের দিকে। লাইনে তখনো ৭/৮ জন রোগী। বললাম- আমরা ব্যস্ত নই, আপনি রোগী দেখেন তারপর কথা বলি। তিনি রোগী দেখা শেষ করলেন। বললাম- হাসপাতালে এতো ডাক্তার এখন পোস্টিং আপনার এখানে এত ভীড় কেন? বললেল- সরকারি চাকরি জীবনের শুরুটা হয়েছিল এখানেই।

তাই অনেকেরই সাথে ব্যক্তিগত চেনা-জানা। সে কারনেই বেশি মানুষ ছুটে আসেন। নতুন ডাক্তাররা আবার অনেকেই আন্তরিকও নয়। এজন্যও তাদের প্রতি আগ্রহও কম। এবার আমার মূল আলোচনার বিষয়ে ফিরতেই উঠে দাঁড়ালেন। বললেন- চলেন দেখে আসি। উনার সঙ্গে বের হলাম। ঘুরে দেখলাম পুরো হাসপাতাল কমপ্লেক্স। চলার মাঝে মাঝে বললেন বদলে দেবার গল্প।

তিনি জানালেন, এর আগে যে সব পরিবর্তনের কথা লিখেছি, এর জন্য আসলে স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো বরাদ্দ নেই। তিনি এখানে এই পদে যোগদানের পর উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সেক্টর থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে অনুদান সংগ্রহ করে এসব করেছেন। আপনার পূর্বসূরীরা তো উদ্যোগী হননি! আপনার কেন মনে হলো এসব করা দরকার? বললেন- সরকারি চাকরি জীবন শুরু করেছিলাম এই হাসপাতালেই। সেখান থেকেই এখানকার মানুষের সঙ্গে হৃদ্রতা। এখানকার সাধারণ মানুষ খুবই আন্তরিক। তবে নিজেদের অধিকারে ব্যাপারে সচেতনতা কম।

আগের পোস্টিং এর সময়ই হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা ও সে ব্যাপারে উদ্যোগ না নেয়ার বিষয় নিয়ে ভেবেছি। কিন্তু তখন ত কোনো ক্ষমতা ছিল না আমার হাতে।তাই এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত হবার পরই একটা পরিকল্পনা নেই একটা কিছু করার। স্বাস্থ্য সেবা নিতে এসে একটা মানুষ যাতে স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ পায় চেষ্টা করেছি সেটা নিশ্চিত করতে। এরপর আস্তে আস্তে ফান্ড সংগ্রহ করেছি আর নিজের মত করে কিছু করার চেষ্টা করেছি। জানিনা কতটা করতে পেরেছি!

বললাম- অনেকটা করেছেন। এই অবহেলিত জনপদের মানুষের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তার এই আন্তরিকতা আমাদের অনেক প্রাপ্তি। হয়ত অনেকই এসব চোখে দেখবে না। কিন্তু একজন অবশ্যই দেখবেন, সেই দেখাটাই মানব জীবনের সেরা প্রাপ্তি।

কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে খাবার টেবিলে হাসপাতালের বদলে যাবার গল্প বলছিলাম। মা বললেন- ডা. মকছেদুল মোমিন আমার নিয়মিত ডাক্তার। পরিবারের অন্য সদস্যরাও চিকিৎসা নেন উনার কাছেই। খুবই আন্তরিক মানুষ। মন দিয়ে অনেকক্ষণ রোগের কথা শোনেন। সবাই তার চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। মায়ের এই সার্টিফিকেট এর পর ইচ্ছে হলো একজন ভালো মানুষকে নিয়ে কিছু লিখতে। তাই এই প্যাচালি।

ডা. মকছেদুল মোমিনদের এসব দেশপ্রেমের কথা হয় তো আমাদের সবার চোখে পড়ে না! মানুষের নেতিবাচক দিকটাই আমরা এখন বড় করে দেখতে অভ্যস্ত। স্বাভাবিক কারণেই কাজের মূল্যায়নটা হয় তো কম। তবে যারা এসব করেন, তারা মূল্যায়িত হবার জন্য করেন না। করেন দেশপ্রেম থেকে। তবে মূল্যায়ন হলে নতুনদের কাজের আগ্রহ বাড়ে।

যখন ডা. মকছেদুল মোমিনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তখন আমাদের উপজেলা ছিল করোনা মুক্ত। গতকালই একজনের আক্রান্তের খবর এসেছে। প্রথম আঘাতটাও এসেছে স্বাস্থ্য বিভাগের উপরেই। এ খবরের সাথে বেড়েছে সারাধণ মানুষের উদ্বেগ। সংগত কারনেই উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বেড়েছে দায়িত্ব। উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের জন্য অল্পকিছু স্বাস্থ্যকর্মী আর অপ্রতুল চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে হয় তো মাঠে নামতে হচ্ছে ডা. মকছেদুল মোমিনকে।

এই সময়ে এই যুদ্ধে জয়ী হতে মহম্মদপুর উপজেলার মানুষকে তার পাশে থাকতে হবে। বাড়াতে হবে সচেতনতা। একজন দেশপ্রেমিক মানুষের নেতৃত্বে এ যুদ্ধ জয় করবে মহম্মদপুর উপজেলাবাসী এটাই এখন প্রত্যাশা। পরিশেষে প্রাচীন রোমান কবি ভার্জিলের ভাষায় বলি, ‘সে-ই সবচেয়ে সুখী, যে নিজের দেশকে স্বর্গের মতো ভালোবাসে। আপনার মধ্যে দেশকে ভালোবাসার সে নমুনা দেখেছি। আপনি ভালো থাকুন ডা. মকছেদুল মোমিন।

লেখক: শাহিদুল হাসান খোকন- সাংবাদিক।






ads