খেয়ে তো বাঁচি আগে, তারপর করোনার ভয়

যুবরাজ শামীম

মানবকণ্ঠ
টঙ্গীতে করোনা সচেতনতা কার্যক্রম - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৭ এপ্রিল ২০২০, ১৬:১৫,  আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২০, ১৭:০৪

ঝগড়ার শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙে। মানুষে গিজগিজ করে পুরো এলাকা। শিল্পনগরী গাজীপুরের টঙ্গীর কথা বলছি। এখানে শ্রমিকদের বসবাস। এইতো কিছুদিন আগে আমাদের দেশে সবেমাত্র করোনার আগমন ঘটার পর সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে বাসিন্দারা সব হুড়মুড়িয়ে গ্রামে পাড়ি দেয়। তখন পুরো এলাকা ফাঁকা। কল-কারখানার শব্দের বদলে পাখির চিউচিউ ডাক শুরু হয়। বহুদিন পর শৈশবের কথা মনে পড়ে, শৈশবে এই মফস্বল শহরে মাটির ঘ্রাণ বাতাসে উড়ে বেড়াতো। যাইহোক, সরকার পক্ষ আবার হঠাৎ ঘোষণা করলেন কল-কারখানা চলবে। তারপরের ঘটনা আমাদের পরিচিত, রাস্তায় গাড়ি নেই, মানুষ চাকরী বাঁচাতে পায়ে হেঁটে ফিরে আসে।

কিন্তু তারপর! কল-কারখানা পুনরায় বন্ধ। আর এখন গাজীপুর করোনার হটস্পট। যেখানে প্রায় প্রতিটি ঘরেই চার থেকে ছয়জন মানুষ একত্রে থাকতে বাধ্য হয় সেখানে আমাদের এলাকায় লকডাউনের তুমুল তোড়জোড় চলছে। এখন সকল দোষ গিয়ে পড়েছে এই সাধারণ মানুষগুলোর উপর। তাঁরা নাকি ভীষণ খামখেয়ালী। সত্যিই তাঁরা খামখেয়ালী! যেখানে সচেতন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা তাঁদের সাথে খামখেয়ালী আচরণ করতে পারে, সেখানে তাঁদের নিজেদের খামখেয়ালী আচরণ খুব বেশি অস্বাভাবিক? আর তাদের এই খামখেয়ালী আচরণের জের ধরেই ভলেন্টিয়ারের নামে বেশ কয়েকজন উঠতি বয়সী উচ্ছৃঙ্খল ছেলেরা নিরীহ মানুষদের মারধর শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে আমাদের এলাকায় কয়েকটি আপত্তিকর ঘটনাও ঘটে। আমি এ নিয়ে ফেসবুকে পোষ্ট দেয়ায় অনেকেই বিব্রত হয়েছেন, কারো কারো সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও ভাটার ইঙ্গিত দেখা দিয়েছে।

আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি ভালো নেই। করোনার হটস্পট হওয়া সত্ত্বেও কাঁচাবাজারে মানুষেরা ভয়াবহ জট বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফার্মেসী এবং মুদি দোকান ছাড়া অন্যান্য সকল দোকান বন্ধ থাকার কথা থাকলেও মানুষ তা মানছে না। সেই সাথে দুপুর বারোটার পর লুকিয়ে অনেকেই চুপচাপ দোকান খুলে বসে থাকেন। কিন্তু কেন?

তাঁদের প্রত্যেকেরই পরিবার রয়েছে। আমরা শুধুমাত্র নিম্নবিত্ত মানুষগুলোর কথা চিন্তা করছি। নিম্ন মধ্যবিত্ত এই মানুষগুলোর কী হবে? যারা লজ্জায় সচারাচর কারো কাছে নিজেদের অভাবের কথা বলে সাহায্য চাইতে পারেন না। যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন কিন্তু সেই সুখবর কি কোন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নিজ দায়িত্বে এই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন?

এছাড়া বিজিএমইএ’র আওতাভুক্ত গার্মেন্টস্ শ্রমিকেরা বেতন পেলেও এর বাইরে টঙ্গীতে বহু ছোট ছোট গার্মেন্টস্ রয়েছে যেখানে শ্রমিকেরা এখনো বেতন পাননি। এই মানুষগুলোর ভাতের নিশ্চয়তা কে দিবে? আগে তো খেয়ে বাঁচতে হবে, তারপর করোনায় মরবার ভয়। ঘরে আটকে থেকে এই মানুষগুলো আরো হতাশায় ভোগে, তাই হয়তো একটু মানসিক স্বস্তির জন্য বাইরে বের হয়। সেই সাথে কোথাও ত্রাণ দিচ্ছে কি না সেই খোঁজ নিতেও আমি তাঁদেরকে দেখেছি। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি কথা আমার বেশ মনে ধরেছে- ভোটের সময় তো মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চেয়েছেন, এখন মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে ত্রাণ দিয়ে আসুন। জনপ্রতিনিধিগণ এই কথা অনুসরণ করলেই হয়।

তবে এখন পর্যন্ত আমাদের এলাকায় প্রশাসন কিংবা জনপ্রতিনিধিদের কার্যক্রম সেই অর্থে আমার চোখে পড়েনি। মাঝে ত্রাণ দেয়ার কার্যক্রম শুরু হলেও তা শুধুমাত্র এখানকার স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যদিও স্থানীয় ভোটাদের অনেকেই এই ত্রাণের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হননি। এর চেয়েও চিন্তার বিষয় গৃহবন্দী এ সকল মানুষেরা বেশিরভাগই এই এলাকার ভোটার নন। তাদের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোন পদক্ষেপ খেয়াল করিনি। ভালো লাগার কথা হলো এই অবস্থায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই সংগঠিত হয়ে এই সকল মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের সকলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা।

কিন্তু এই মানুষগুলোর নিজেদের যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। স্বভাবতই প্রতিদিন তাঁরা নিজেরাই করোনায় আক্রান্ত হবার আশাঙ্কা নিয়ে ঘর থেকে বের হন। এমন বেশ কিছু সংগঠনের মধ্যে ‘আমি নই আমরা’ অন্যতম। এই পরিস্থিতিতে শ্রমজীবীদের রাতের স্বেচ্ছাসেবী স্কুল ‘আমাদের নৈশ বিদ্যালয়’ কর্তৃপক্ষ সার্জিক্যাল মাস্ক, টুপি, গ্লাভস এবং হেক্সোসেল সরবারহ করে এই মানুষগুলোর পাশে থাকার চেষ্টা করেন। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা যথেষ্ঠ নয়। তাই পর্যাপ্ত পিপিই’র জন্য আমদের নৈশ বিদ্যালয়’র অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয় এবং আশার কথা ইতোমধ্যে এই আহ্বানে বেশ কয়েকজন মানুষ সাড়া দিয়েছেন

আমরা একা নই, পুরো পৃথিবী করোনা মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। আর বর্তমান পরিস্থিতি পৃথিবীর জন্য নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর মানুষ বহুবার এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা সম্মিলিতভাবে সেই পরিস্থিতির মোকাবেলা করে আজকের এই পৃথিবী আমাদের উপহার দিয়েছেন। তাই হতাশ হবার কিছু নেই। আমরাও খুব শীঘ্রই নতুন দিনের সম্ভবনা নিয়ে স্বাভাবিক দিনে ফিরে আসবো। শুধু নিজেদের পাশেরজনের দিকে একটু খেয়াল রাখতে হবে- তাঁরা ভালো আছে তো!

লেখক- যুবরাজ শামীম : চলচ্চিত্রকার ও শিক্ষক।

মানবকণ্ঠ/এইচকে/জেএস




Loading...
ads






Loading...