কানাডার সঙ্গে পাঠাভ্যাসের তুলনাচিত্র ও আমাদের ভবিষ্যৎ

এম এল গনি

মানবকণ্ঠ
লেখক- এম এল গনি - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪:২৯

নিজে লেখালেখির সাথে খানিক হলেও সংশ্লিষ্ট বলে বিভিন্ন লেখকের ফেইসবুক পোস্ট মনোযোগ দিয়ে পড়ি। দুটো বই বিক্রি করার উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত লেখকরা পর্যন্ত কী পরিশ্রম করছেন তা দেখে মনটা কাতর হয়ে গেল। এক ক্রেতার সাথে ছবি দিয়ে প্রখ্যাত এক লেখক লিখেছেন: "গরিবের বন্ধু ...?.. ভাই"। এর মানে, লেখকের বইটির এককপি এই ক্রেতা কিনেছেন বলে তিনি তাঁর হৃদয়ের অন্তঃস্থল হতে এভাবেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তাঁর প্রতি। এক কপি বই বিক্রিতে সফল হয়ে একজন নামীদামী লেখককে যদি এ ভাষায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়, তবে আমাদের দেশের মানুষের পাঠাভ্যাসের দৈন্যদশা দেখে বিচলিত না হওয়াই অস্বাভাবিক মনে করি।

আমি দীর্ঘদিন ধরে কানাডায়। এদেশেই আমাদের তিন সন্তান ক্লাস ওয়ান হতে পড়ালেখা করেছে বা করছে। এদেশে স্কুলছাত্রদের পাঠাভ্যাসের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়। পাঠ্যবইয়ের বাইরে স্কুল লাইব্রেরি হতে বই নিয়ে তা পড়ে রিভিউ লিখতে হয় ছাত্রদের। আমাদের ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া ছেলে আয়মান ইতিমধ্যেই চারশোর অধিক বই পড়েছে। শুধু আয়মান বলে কথা নয়, এদেশের সব স্কুল ছাত্রছাত্রীরাই স্কুল শেষ করতে করতে কয়েকশ, এমনকি হাজার, বই পড়ে ফেলে। এ কারণে, কথাবার্তায় এদের হারানো মুশকিল। ক্লাসের একটা সাধারণ ছাত্রও বক্তৃতায় পটু। এরা যুক্তিতে চলে। এদের চিন্তার ক্ষেত্র অনেক প্রসারিত।

এবার আমাদের বাংলাদেশের কথা বলি। যে বয়সে বাচ্চাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া উচিত, সেখানে তা না করে বরং স্কুলে স্কুলে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে রাজনীতি। কোমলমতি শিশুরা কি রাজনীতি করবে, না লেখাপড়া করবে? বই পড়া তো কোন ছার্। দেশে কি রাজনীতিকের অভাব হয়েছে? যতটা জানি, আমাদের দেশে তো বর্তমানে কর্মীর চেয়েও নেতার সংখ্যা বেশি। এতো নেতা কি আমাদের আসলেই দরকার? বুদ্ধিজীবীদের কেউ সাহস করে নীতিনির্ধারকদের এ প্রশ্ন করবেন, সে পরিবেশও দেশে নেই। এ ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

জাতিকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রাজনীতি নয়, বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলতে হবে। ছোটবেলার আমি কীভাবে বই পড়তাম বলি। আমি চট্টগ্রামের কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিলাম। আমাদের বাসার কাছে ছিল বটতলী রেলস্টেশন। স্টেশন চত্বরে কিছু লোক পত্রিকা, ম্যাগাজিন, বই বিক্রি করত। স্কুল ছুটির পর বাসায় এসে ওখানে চলে যেতাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভালোমন্দ বই পড়তাম। বাবার এত টাকা ছিল না যে কিনে পড়ব। নিয়মিত লিখতামও চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীতে। কিছু টাকা পয়সা হাতে জমলেই বই কিনতাম। আর সেদিন শুনলাম, সেই ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুলে রাজনীতির নামে কিছুদিন আগে নবম শ্রেণির এক ছাত্রের পায়ের রগ কেটে দিয়েছে তারই সহপাঠীরা। বাচ্চাটা মারা গেছে। আপনারা নিশ্চয়ই এসব জানেন, যদিও ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না।

এ ধরণের নৈরাজ্য ও সামাজিক অবক্ষয় হতে বেরিয়ে আসতে হলে শিশুদের রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চুরিচামারিতে দীক্ষা না দিয়ে বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করুন। অন্যথায়, আমাদের জন্য গভীর অন্ধকার ও নৈরাজ্যময় ক্ষয়িষ্ণু এক ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এ অবনতিশীল পরিস্থিতিতে আমি উদ্বিগ্ন, আশাহত ও ক্ষুদ্ধ; যদিও আমার প্রতিক্রিয়ায় কারো কিছু যায় আসে না। তবে, ভুল শুধরে নেবার সুযোগ এখনো আছে।

লেখক- এম এল গনি : কানাডা প্রবাসী লেখক, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট ও প্রকৌশলী।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...