ছাত্ররাজনীতিতে ‘লিডারশীপ’ কার্যক্রমের প্রাসঙ্গিকতা


poisha bazar

  • হায়দার মোহাম্মদ জিতু
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১৫:০৭

অ্যাপ্লাইড ম্যাথম্যাটিকস গেম থিউরি থেকে নেয়া ‘জিরো সাম গেম’ থিউরি বর্তমান রাজনীতি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবহৃত একটি উপাদান। এর মূল কথা হল যেকোনো ক্ষেত্রে একজন গেইনার বা সফল হবেন এবং আরেকজন লুসার বা ব্যর্থ হবেন। অর্থাৎ, দুই পক্ষ কখনই একসাথে বিজয়ী হতে পারবেন না। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাস্তববাদীরা পুরো পৃথিবীর সম্পদকে জিরো সাম মনে করেন। যেখানে এক দেশ যতটুকু অর্জন করবে আরেক দেশকে ততটুকু লোকসান গুণতে হবে। আর এ কারণেই এই তত্ত্বে বিশ্বাসী চিন্তাবিদ, কূটনীতিকগণ এবং রাজনীতিবিদরা যুদ্ধ-আগ্রাসনের পক্ষে মতামত দিয়ে থাকেন।

বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এই ধরণের লুণ্ঠন, হাতিয়ে নেবার পন্থার বিপক্ষে আমৃত্যু লড়াই করেছেন। বিশ্ব মঞ্চের ফোরাম জাতিসংঘে দাঁড়িয়েও অটল কণ্ঠে বলেছেন বিশ্ব আজ দুই খণ্ডে বিভক্ত-শোষক এবং শোষিত। আমি শোষিত মানুষের পক্ষে। অর্থাৎ, ক্ষমতার বাইরে থাকা ক্ষমতাহীন মানুষদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সেটারই ধারাবাহিক ফলাফল আজন্ম বঞ্চিত বাঙ্গালীর পক্ষে প্রথমে রাজনৈতিক ভূখণ্ডগত মুক্তির আন্দোলন, পরে অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন। যদিও দ্বিতীয়টি তিনি করে যেতে পারেনি বিশ্বাসঘাতকদের মিছিল যন্ত্রণায়।

তবে মুক্ত ভূখণ্ডের যে স্বপ্ন বাস্তবতা তিনি দিয়ে গেছেন সেই বাস্তবতাকে লালন এবং ধারণ করে তাঁরই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন অর্থনীতির পাগলা ঘোড়ার লাগাম ধরেছেন। শুধু তাই নয় একে এখন সমৃদ্ধির পথে নিয়ে বিশ্ববাসীকে এই তলাবিহীন ঝুড়িকে প্রাচুর্যের নগর-রাষ্ট্রের দিকে গেছেন। আর এই দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় শেখ হাসিনার ‘আপন সাওয়ারি’ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

যদিও বিভুরঞ্জন সরকার সম্প্রতি তার এক লেখনীতে ছাত্রলীগকে নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হল ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের সংগঠন। আর ইতিহাস সাক্ষী যেকোনো অন্যায় পাপাচারে ছাত্রলীগই আর্টিলারি ইউনিট হিসেবে শোষকদের দুর্গ ভেদ করেছে। কিন্তু বর্তমান সমাজ বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। এখানে চলে ‘মুখোশের’ রমরমা ব্যবসা।

ফলাফল ছোট ছোট বিষয়গুলোতেও ছাত্রলীগকে রক্তাত্ত হৃদয়ে শিরোনাম হতে হয়েছে। কিন্তু এই যে ছোট ছোট বিষয়েও ছাত্রলীগ চলে আসে এর কারণ সমাজ ব্যবস্থার ক্ষমতা কাঠামো। ফুকোডিয়ান ক্ষমতা চিন্তায় যে কেউ যেকোনো সময় ক্ষমতাবান বনে যেতে পারেন। আর এই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতায় ছাত্রলীগকে দায়িত্ব নিতে হয়, হতে হয় রক্তাত্ত।

এ বিষয়কে আরও বিস্তৃতভাবে বোঝা যায় নাটকের প্লট কাঠামো উপাদান দিয়ে। যেখানে বলা হয় যা কিছু দৃশ্যমান থাকে আদতে তা ঘটে সাব প্লট অর্থাৎ পেছনের কার্যকারণকে কেন্দ্র করে। বিভুরঞ্জন সরকার ছাত্রলীগ নিয়ে যা বলেছেন তা সেই ক্ষেত্র বিশেষের কার্যকারণের ফলাফল। কিন্তু এর সাবপ্লট বা পেছনের চিত্রটা বরাবরই ভিন্ন থাকে। ঘটনাচক্রকে তুলে ধরতে একখানা সত্য উপস্থাপন জরুরী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এবং শিক্ষকমহল নম্বরপত্রে নাম্বার টেম্পারিং, শিক্ষক নির্বাচন, নিয়োগ থেকে শুরু করে যেকোনো বিষয়ে সত্যতাকে এড়িয়ে ‘আঞ্চলিকতা এবং যৌন রাজনীতিকে যেভাবে প্রমোট করছেন তাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রফল বদালানোর দায় কার ?

তাছাড়া ছাত্রলীগের বাজারদর বা মার্কেট ভ্যালুকে পুঁজি করে যারা নিজেদের কাটতি টার্গেট করেন এবং ছাত্রলীগকে নিয়ে রসাত্মক গল্প-খবর লেখেন তাদের নিয়েও খুব একটা বিস্মিত হবার কিছু নেই। কারণ এই পৃথিবী আবিষ্কারককে মনে রেখেছে এমন নজির খুব কম। বরং আবিষ্কারের উপভোগে কখনও কখনও আবিষ্কারককেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। প্রমাণ যে অক্ষর-ভাষায় নিজের কাটতি বাড়ানোর জন্য ছাত্রলীগকে ব্যবচ্ছেদ করা হয় সেই ভাষার স্লোগান-মিছিলে ছাত্রলীগের কত রক্ত-ঘাম আছে, সে খবর কে রাখে ?

তবে এক্ষেত্রে বলা যায় সময়ের সাথে ছাত্রলীগকে ভবিষ্যৎ বাস্তবতায় আরও যুগোপযোগী করতে একক ‘শেখ হাসিনা’র নজরদারি যথেষ্ট। যার বর্তমান ক্ষেত্রবিন্দু ‘লিডারশীপ ওরিয়েন্টেশন’। যেখানটায়বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন এবং চিন্তা পাঠের সাথে সাথে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নানান বিষয় যেমন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি, নৃতাত্ত্বিকভাবে বৈশ্বিক নাগরিক পরিচয়করণ, পারিবারিক শিক্ষা, লিঙ্গ বৈষম্য, লৈঙ্গিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি (প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা,আমেরিকা), বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন,বিশ্ব অর্থনীতিসহ সময়ের আবেদন অনুযায়ী একজন নেতা এবং একজন শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবী-মিডিয়া ব্যক্তিত্ব-বিশারদকে নিয়ে সেমিনার করবার পরিকল্পনা।

পরে সেই সেমিনার পরবর্তী ক্লাসে ছাত্র প্রতিনিধিদের মাঝে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং বাছাইকৃত প্রবন্ধ দিয়ে প্রাবন্ধিক ছাত্রনেতাকে আলোচনা করবার সুযোগ করে দেয়া। যা একই সাথে তৈরি করবে লেখা এবং বলবার অভ্যাস। যা নেতৃত্বের জন্য ভীষণ জরুরী। তবে সব ছাপিয়ে ছাত্রলীগের আদর্শিক অক্ষরজ্ঞান ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা’ জ্ঞান আবশ্যক। যাকে অক্ষরজ্ঞান হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ পৃথিবীর তাবৎ ব্যাকরণ প্রয়োজনে আত্মস্থ করবে আবার ছুঁড়ে ফেলবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে চালিয়ে যাবে সকল প্রথাবিরোধী সংলাপ।

আর এক্ষেত্রে প্রত্যেক ছাত্রনেতাদের জন্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংগ্রাম এবং অর্জন জীবন জানাও কাম্য। এত প্রতিকূলতা সংগ্রাম এবং জনযুদ্ধ সব মাড়িয়েও বিশ্ব নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন এবং এখন পর্যন্ত ৪০টির মত বিশ্ব স্বীকৃতি-পুরষ্কার পেয়েছেন। এই বিষয়গুলো নিয়েও শিক্ষার্থী সংলাপ এবং পারস্পারিক বোঝা পরা জরুরী। আর একটা বিষয় জরুরী, নিজেদের শক্তিমত্তা এবং সাধুবাদ জানানোর মানসিকতা।

পাশাপাশি ‘লিডারশীপ ওরিয়েন্টেশন’ এর মাধ্যমে যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছে অদূরে তা ইংরেজি মাধ্যমে রূপ নেবার মাধ্যমে এই তল্লাটের ছাত্র প্রতিনিধিদের তৈরি করবে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে। বৈশ্বিক সেমিনার এবং ফোরামগুলোর মাধ্যমে বিশ্ব জানবে বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, শেখ হাসিনা এবং ছাত্রলীগ সম্পর্কে। এর উপর প্রত্যাশা থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রোগ্রাম চলাকালীন টেলিফোন যোগে প্রোগ্রামের খোঁজ খবর এবং নির্দেশনা দিয়েছেন। বলেছেন নিজেদের আচরণের উপর বিশেষ নজরদারি বাড়াতে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ক্রান্তিলগ্নের বাতিঘর। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধাচরণ, মৌলবাদসহ সকল সামাজিক-রাজনৈতিক সন্ত্রাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মুক্তির বার্তা হাতে হাজির হয়। তবে ট্র্যাজেডি হল সেই বার্তাবহনকালে নানান সময়ে আক্রান্ত হতে হয় এই সংগঠনের কর্মীদেরই। কাজেই ছাত্রলীগ করা ছেলেমেয়েটিও যে কারো ভাই-বন্ধু-স্বজন, ভবিষ্যৎ পরিবার এটা না ভুলে যাওয়াটাই উত্তম। কারণ সময় বড় নির্মম। আর এটি ফিরে আসবেই।

লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।





ads







Loading...